সচেতনতার বিকল্প নেই

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৪৯ এএম, ০৫ এপ্রিল ২০২১

মামুন রশীদ: করোনা সংক্রমণ আবার বাড়ছে। সেই বাড়ার চিত্রও ভয়াবহ। প্রতিদিনই আতঙ্ক বাড়ছে। কিন্তু যে হারে করোনা সংক্রমণ ও আতঙ্ক বাড়ছে সে হারে আমাদের সচেতনতা যে বাড়ছে না তা লেখাই বাহুল্য। অথচ চলতি বছরের প্রথম দুই মাস আমরা বেশ স্বস্তিতেই ছিলাম। সংক্রমণের নি¤œমুখী প্রবণতাই আমাদেরকে স্বস্তি দিয়েছে, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা দেখিয়েছে। কিন্তু মার্চ মাস থেকেই স্বস্তি কমতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ফলতে শুরু করে। বাড়তে শুরু করে করোনা সংক্রমণ। পরিসংখ্যান বলছে, মার্চের ১৩ তারিখ দেশে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল মাত্র ছয়টি জেলায়। কিন্তু এক সপ্তাহ পরেই অর্থাৎ ২০ মার্চ সর্বোচ্চ সংক্রমিত জেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২০টিতে। আর এর মাত্র চার দিন পর অর্থাৎ ২৪ মার্চ সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২৯-এ। যা, এই এপ্রিলের শুরুতে ৩১টি জেলায় ঠেকেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে সংক্রমণের গতি ও বর্তমান অবস্থা।  
গতবছর, যখন দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে, তখনই সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এরপর গত এক বছরে বিশ্ব করোনা সংক্রমণে হারিয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। ইতোমধ্যে করোনার প্রতিষেধক এসেছে, আমাদের দেশে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। তবে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সময়। কারণ ভ্যাকসিনের সফলতা এখনো শতভাগ নয়। তাই করোনা নিয়ন্ত্রণে এখনো শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণকেই গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ব। করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে এটিই এখনও অধিক কার্যকর। গত বছর, বিশ্বে করোনাভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তখন থেকেই এই দুটি হাতিয়ার সম্বল করে বিশ্ব করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। মানুষ যেনো শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে পারে, এজন্য দেওয়া হয় লকডাউন, কারফিউ এবং ছুটির মতো কর্মসূচি। বাংলাদেশেও গতবছর সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। সে বছর মার্চের শেষে ঘোষিত ছুটি পরবর্তীতে দফায় দফায় বাড়ানো হয়। ছুটির মেয়াদ বাড়নোর উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেনো নিরাপদ থাকে, সুস্থ থাকে। করোনার সংক্রমণ যেনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে।

 কিন্তু সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিল, তা বিভিন্ন কারণে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এর পেছনে প্রধান ছিল আমাদের অসচেতনতা। আমরা সাধারণ ছুটির মধ্যেও নিজেদের খেয়াল খুশি মতো অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া বন্ধ করতে পারিনি। সাধারণ ছুটির মধ্যেও তখন বারে বারে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের কর্মস্থলে ডেকে আনা হয়েছে, তাদের প্রাপ্য মজুরি দিতে টালবাহানা করা হয়েছে, তাদেরকে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ করোনায় সংক্রমিত হবার পর, ভয়ে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে থেকেছেন, এতেও বেড়েছিল সংক্রমণ হার। তবে সরকারের ছুটি ঘোষণার প্রাথমিক সুফলও আমরা পেয়েছিলাম। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু জীবন ও জীবিকাকে স্বাভাবিক করার তাগিদ আসছিল বিভিন্ন মহল থেকে। দীর্ঘদিন অর্থনীতির চাকা বন্ধ, তা সচল করার তাগিদও ছিল। অন্যথায় যে নতুন সংকট তৈরি হবে, তা সামলানোর ঝুঁকিও কম নয়। তাই সরকার গত বছর মে মাসের পরে সাধারণ ছুটি আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সীমিত পরিসরে গণপরিবহনসহ লোক চলাচলের অনুমতি দেয়। আশা করা গিয়েছিল, আমরা দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থেকে করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে যেসব স্বাস্থ্যবিধি রপ্ত করেছি, তা যথাযথভাবে অনুসরণের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও তখন তুলে দেওয়া হচ্ছে লকডাউন। স্বাভাবিক হচ্ছে জীবন ও জীবিকা। মানুষ কর্মস্থলে যাচ্ছে। আমরাও সেদিকেই এগিয়ে যাবো, এই প্রত্যাশাতেই সে সময় সাধারণ ছুটি আর বাড়েনি। ধীরে ধীরে অন্যান্য বিধিনিষেধও শিথিল হয়। যদিও মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা শিথিল হয়নি। কিন্তু তারপরও আমরা যেমন মাস্ক পরতে অস্বস্তি বোধ করেছি, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে অনীহা দেখিয়েছি, হোম কোয়ারেন্টাইনে আপত্তি করেছি, পালিয়েছিÑ তারই কুফল আজ ইঙ্গিত দিচ্ছে আমাদের চূড়ান্ত অসচেতনতা সম্পর্কে। 

করোনার প্রতিষেধক এসেছে, কিন্তু শতভাগ সফলতা আসেনি, কবে আসবে তাও অনিশ্চিত। এ অবস্থায় করোনাকে সঙ্গী করেই আমাদের এগুতে হবে। সেই এগুনোর পথে আমাদেরকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। আমরা নিজেরা যদি সচেতন না হই, তাহলে সরকারের পক্ষে কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য সরকার বারবার আহ্বান জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে আঠারো দফা নির্দেশনাও জারি করেছে। কিন্তু এর কোনকিছুই সুফল বয়ে আনবে না, যদি না আমরা সচেতন হই। স্বপ্রণোদিত ভাবে আমাদেরই সচেতন হয়ে শারীরিক সংস্পর্শ ও মানুষের নৈকট্য এড়াতে হবে। এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সংক্রমণ ও মৃত্যু দুইই বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আমাদের সচেতনতার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সরকারকেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর কর্মসূচি নিতে হবে। 
লেখক ঃ কবি ও সাংবাদিক
০১৯১২-৩০৬৩৫৬