ইসলামী শরীয়তে নফল রোজার ফজিলত ও তাৎপর্য

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০২:২১ এএম, ০৩ এপ্রিল ২০২১

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন: আল্লাহ তায়ালা সুরা জারিয়ার ৫৬নং আয়াতে বলেন ‘‘আমি মানুষ এবং জ্বীনকে আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” মানুষ শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে, সেটা হতে পারে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত অথবা নফল মোস্তাহাব। ইবাদতে আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদানে নফল ইবাদতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরীসিম। এর মাধ্যমে ফরজ ইবাদতের ঘাটতি পূরণ হয়। প্রায় প্রত্যেক ফরজ ইবাদতের নফল ইবাদত রয়েছে। হাদিসে ভিন্ন ভিন্নভাবে সেসবের ফজিলত ও গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে নফল রোজা রেখেছেন এবং উম্মতকেও তা পালনে যথাযথ উৎসাহ প্রদান করেছেন। এখানে নফল রোজার ফজিলত ও তাৎপর্য অতিসংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করছি। নফল রোজার  ফজিলত সম্পর্কে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন প্রত্যেক বস্তুর যাকাত আছে, শরীরের যাকাত হচ্ছে রোজা (ইবনে মাজা)।  অন্যত্র মুআজ (রা.) বলেন রাসুল (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি রমজান মাস ছাড়া অন্য কোন সময় রোজা রাখবে, দ্রুতগামী ঘোড়া ১০০ বছর যতদুর রাস্তা অতিক্রম করবে দোযখ তার থেকে তত দূরে অবস্থান করবে। (তিরমিযী)। 
আশুরার রোজা : মহররম মাস হচ্ছে হিজরী সনের প্রথম মাস। বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর উত্তম রোজা হচ্ছে, আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর উত্তম নামাজ হচ্ছে রাতের নামাজ।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬৩) আশুরার রোজা প্রসঙ্গে আয়েশা (রা.) বলেন, ‘কোরাইশের লোকেরা জাহেলি যুগেও আশুরার রোজা রাখত। রাসুল (সা.) ও রাখতেন। এরপর যখন হিজরত করে মদিনায় এলেন, তখন নিজেও এই রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরও রাখার আদেশ দিলেন। এরপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন বলেন, ‘যার ইচ্ছা সে তা (আশুরার রোজা) রাখতে পারে যার ইচ্ছা না-ও রাখতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ২০০২) রজব মাসে রোজা : রজব হচ্ছে আরবি সপ্তম মাস। এই রজব মাস থেকেই রাসুল (সা.) রমজানেরর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন এবং বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। উম্মে সালমা (রা.) বলেন নবী (সা.) রমজানের পরে বেশি রোজা রাখতেন শাবান মাসে তারপরেই রজব মাস। কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় রাসুল (সা.) রজব মাসে দশটি রোজা রাখতেন। নবী (সা.) বলেন রজব হচ্ছে আল্লাহর মাস। (তিরমিযি)। 
শাবান মাসের রোজা : শাবান হচ্ছে হিজরী সনের অষ্টম মাস। প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘শাবান মাস এলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) লাগাতার রোজা রাখতেন। ফলে আমরা বলতাম, তিনি আর রোজা বাদ দিবেন না আবার যখন রোজা বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম তিনি আর রাখবেন না। আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে রমজান ছাড়া। অন্য কোনো মাসে পুরো মাস রোজা রাখতে দেখিনি শাবানের চেয়ে বেশি অন্য কোনো মাসে রোজা রাখাতে। (বুখারী) প্রতি সপ্তাহে রোজা : সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা নবীজির গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। এই দুই দিন রোজা রাখার প্রতি নবীজি গুরুত্ব দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেছেন, রাসুল (সা.) সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজার প্রতি বেশি খেয়াল রাখতেন। (তিরমিযি, ৭৪৫)। 
মাসে তিন রোজা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ধৈর্য্যের মাস হলো রমজান, আর প্রত্যেক মাসে তিন দিন সাওম (রোজা) পালন করা সারা বছর সাত্তম পালন করার সমতুল্য।’ (নাসায়ি, ২৪০৮) আইয়্যামে বিজের তথা প্রতি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ রোজা রাখা অত্যন্ত পূণ্যের কাজ। 
শাওয়ালের ছয় রোজা : রমজান-পরবর্তী  শাওয়াল মাসে ছয় রোজা রাখা নবীজি (সা.) এর গুরুত্ব¡পূর্ণ একটি সুন্নত । এই মর্মে  আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল। এটি তার জন্য সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য হবে।’ (মুসলিম, ২৬৪৮) 
জিলহজ মাসের প্রথম দশদিন : জিলহজ হচ্ছে হিজরী সালের শেষ মাস। এই মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন। একবার নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, শোনো, এই ১০ দিনের সমতুল্য বছরের আর কোনো দিন নেই।(দশম দিন কুরবানির পূর্ব পর্যন্ত ) এই কথা শুনে সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করাও কি এর সমকক্ষ হবে না, রাসুল (সা.) বলেন না তাও হবে না। তবে যে ব্যক্তি জিহাদে গেছে, এ কাজে অর্থ ব্যয় করেছে, জীবনও বিলিয়ে দিয়েছে; আর ফিরে আসতে পারেনি, অবশ্য তার পুরস্কার ভিন্ন।’ (মুসনাদে আহমাদ, ১৯৬৯)।
বিশেষভাবে আরাফার দিন বা জিলহজ মাসের ৯ তারিখ রোজা পালনকারীদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আশা করি যে তা বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের পাপের কাফফারা হিসেবে গ্রহণ করা হবে।’ (মুসলিম, ১১৬২) মহান আল্লাহ আমাদের ফরজ রোজার  পাশাপাশি বেশি বেশি নফল রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। (আমিন)। 
লেখক ঃ প্রভাষক-কলামিস্ট 
০১৭১২-৭৭৭০৫৮