করোনায় বদলে যাচ্ছে চিরচেনা পৃথিবী

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৫:১২ পিএম, ১৭ মে ২০২০

রায়হান আহমেদ তপাদার : করোনার আকস্মিক আক্রমণে একবিংশ শতকের অতি-উন্নত, অতি-অগ্রসর, অতি-প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্ব থমকে দাঁড়িয়েছে। অচেনা এই মরণ ভাইরাসকে চেনা ও বোঝার আগেই অকাতরে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এক জায়গায় রোগের প্রতিরোধের আগেই ছড়িয়ে যাচ্ছে আরও অনেক জায়গায়। এমন আঘাতকে প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত ছিল না পৃথিবীর মানুষ। পৃথিবী স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্থবির হয়ে গেছে। অনেক দেশে নির্বাচন বন্ধ করা হয়েছে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। শেয়ার বাজার ও বাণিজ্যে ধস নেমেছে। সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্তব্ধ। এভিয়েশন ও বিমান চলাচল ব্যবস্থা সংকুচিত। বেকার হচ্ছে বহু মানুষ। যুদ্ধ, মহামারী, দুর্যোগের কারণে অতীতের পৃথিবী বার বার এমন মন্দা, অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। সংকট পেরিয়েই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ বেঁচে আছে। বিপদ ও সংকটে নানা প্রতিষেধক, টিকা, ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। সভ্যতার ইতিহাসে এভাবেই মানুষ এগিয়ে এসেছে নানা বিপদ ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে। করোনার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই এর ভ্যাকসিন, টিকা ও প্রতিষেধকের বিষয়েও বিজ্ঞানিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কোথাও কোথাও কিছু অগ্রগতির তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই ভয়ংকর প্রকোপের কবল থেকে বাঁচার জন্য পালন করা হচ্ছে নানা বিধি-বিধান। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিয়মেও এসেছে বিরাট পালাবদল। মানুষে মানুষে মেলামেশা ও সংযোগের ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষের প্রচলতি ধারণা ভেঙে যাচ্ছে। একবিংশ শতকের পৃথিবীর এমন প্রলয়ংকরী বিপদের মুখে বদলে যাচ্ছে যাবতীয় সম্পর্ক ও সংযোগের কাঠামো।
করোনা মানব সভ্যতার জন্য এক/এগারো-এর চেয়েও বড় পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে আর্থিক সংকট হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। এটি একটি বিস্ময়কর ধাক্কা যা বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। জৈবিক ও সভ্যতা উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক বিবর্তন আসবে। সরকারী- বেসরকারী খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং স্বল্পমেয়াদি ত্যাগের লক্ষ্যে যোগাযোগ অর্জনের মতো দীর্ঘমেয়াদী অগ্রাধিকার- গুলি থমকে যাবে। অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংকটের কারণে যুদ্ধ-বিগ্রহ বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি পাবে। এমতাবস্থায় করোনার বৈশ্বিক মহামারির পটভূমিতে বিভিন্ন সংস্থা ও রাষ্ট্র বিরাট অঙ্কের ফান্ড গঠন করেছে প্রতিরোধ ও প্রতিবিধানের জন্য। পৃথিবীকে যে সবাই মিলে রক্ষা করতে হবে এবং সকলের সম্মিলিত প্রতিরোধে বিপদ উত্তরণ করতে হবে, এই চেতনা যত বেশি বিকশিত হবে, ততই মানব সভ্যতার জন্য কল্যাণ আসবে। বিভিন্ন ধরনের বিপদ, মহামারি, যুদ্ধ ও সংকটে যে মানব জাতি একাকার হয়ে এই সবুজ পৃথিবীকে রক্ষা করেছে, অতীতের সেই স্বর্ণালি অর্জনগুলোকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে সবাইকে মিলেমিশে। করোনার কারণে বদলে যাওয়া বিশ্বকে আতঙ্ক, মৃত্যু, বিপদের কবল থেকে উদ্ধার করে শান্তি ও নিরাপত্তার আবাসে পরিণত করতে হবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই। প্রযুক্তির অতিবিকাশের জন্য পৃথিবী যেভাবে বদলে গেছে, করোনাসহ নানা রোগ ও আর্থ-সামাজিক-পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণেও দ্রুত বদলে যাচ্ছে চিরচেনা পৃথিবীর চেহারা। এই নতুন চেহারা ও অবয়বের পৃথিবীকে নিরাপত্তা- হীনতা, ভীতি ও আতঙ্কের বদলে মানবিকতা, শান্তি, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার দ্বারা বাসযোগ্য রাখাই মানব সভ্যতার জন্য মিলিত চ্যালেঞ্জ।
করোনার প্রভাবে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে চিরচেনা পৃথিবীর চেহারা। বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর পুরনো নিয়ম-কানুন। দেশে-দেশে মানুষের জীবন-যাপনের প্রণালীও বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে জীবন ও জীবিকাকে নতুন করে বিন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ যাবত গৃহীত অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপের মূল্যায়নে তা থেকে সরে আসার তাগিদও অনুভূত হচ্ছে করোনার মারাত্মক পরিস্থিতিতে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে জীবন প্রণালির গুণগত পরিবর্তনের বাস্তব প্রয়োজনীয়তাকে- ও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অফিসের বদলে বাসায় কাজ করা, নানাবিধ কাজ ও প্রয়োজনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার বদলে ই-যোগাযোগের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করছে। পৃথিবীর প্রচলিত কাঠামো ও বিধি-ব্যবস্থার মধ্যেই একটি আমূল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে করোনাভাইরাসের আঘাতের প্রতিক্রিয়ায়। আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশ্ব বাণিজ্য ও অবাধ মুনাফার সুতীব্র প্রতিযোগিতাতেও লাগাম টানার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে করোনা। বিশ্বের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যক্তিগত শুদ্ধাচার ও পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সরকারসমূহের ভূমিকাকেও তীব্রতর করেছে করোনা। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ধর্মকর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে অন্য সবকিছুর চেয়ে বিশ্ববাসী যে বিষয়টি নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা করছে তা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা, সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাঁর উপাসনা ও ক্ষমা লাভ। করোনা মোকাবেলায় উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর অসহায়ত্ব প্রমাণ করে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে কথিত আধুনিকতার কোমর ভেঙে পড়বে।
করোনার আগে ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু, এইডস ইত্যাদি বিপদ পৃথিবীকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছিল। মানুষের আচরণ ও সম্পর্কের নেতিবাচক কারণেও বহু রোগ-ব্যাধি ছড়াতে পেরেছিল। এইডস’র ক্ষেত্রে অবাধ যৌনাচার, মেলামেলাকে দায়ী করা হয়েছিল। করোনা ছড়ানোর পেছনেও মানুষের খাদ্যাভাস, আচার-আচরণ, মেলামেশার ক্ষেত্রে নানা রকম ভুল পদক্ষেপের প্রভাব রয়েছে। পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট করার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও কাজ করেছে এই চরম পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে। মানুষ যে নিজের ভুল কাজ ও পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত বিপদ ডেকে আনছে, তা করোনার সময়ও প্রমাণিত হয়েছে। সাধারণ স্বাস্থ্য বিধি, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশের সুরক্ষা ইত্যাদি মৌলিক কাজে পৃথিবীর
মানুষ সাম্প্রতিক বছর গুলোতে বিরাট ক্ষতিকর অবস্থায় আছে। নদী, পাহাড়, বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। নিজের বর্জ্য ও ব্যবহার্য দিয়ে চারপাশের পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। নানা রকমের জৈব বর্জ্যের পাশাপাশি রাসায়নিক ও অন্যবিধ বর্জ্য দিয়ে দূষিত করছে পৃথিবীর পরিবেশ। কোনও কোনও দেশ কেমিকেল, বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের পাশাপাশি জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরিক্ষা-প্রয়োগের মাধ্যমে বিশেষ কোনও শত্রু দেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্যই বিপদ ডেকে আনছে। এতো আঘাত, রক্তপাত, বোমাবাজি সর্বংসহা বসুন্ধরা আর কত সহ্য করবে! করোনার আগের এবং পরের পৃথিবী এক থাকবে না। মানুষ বদলে যাবে, পাল্টে যাবে সামাজিক রীতি-নীতি, অভ্যাস-বদঅভ্যাস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস বিদায় নেওয়ার পর সম্পূর্ণ অন্য এক পৃথিবীতে পদার্পণ করতে যাচ্ছি আমরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা বিজ্ঞানী অ্যান্থনি ফাউসি তো এমনও বলেছেন, পৃথিবী হয়তো আর কখনো স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাবে না।
প্রযুক্তিভিত্তিক যোগাযোগ বেড়ে যাবে। তবে দরিদ্র এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলি বিশেষত অপ্রস্তুত এবং দুর্বল থাকবে। ঝড় একদিন থেমে যাবে। মানব সভ্যতা এখন এক বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করছে। সম্ভবত আমাদের এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। এই বদলে যাওয়াটা যে শুধু আমাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা পদ্ধতিতে হবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। বদলে যাবে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির গতিপথ। সরকার ও কর্পোরেট ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খাবে। অনেক বড় বড় সংস্থাগুলি ধসে পড়বে। বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে বিমান শিল্প,অফিস ভবন, শপিংমল, এয়ারলাইনস এবং বিমানবন্দরগুলি প্রচুর ঝুঁকিতে পড়ব। অর্থনৈতিক পতনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের সরকার পড়ে যেতে পারে। ইকুয়েডর থেকে ইরান পর্যন্ত পেট্রো-রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতন কোনও অবাস্তব দৃশ্য নয়। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অতি মুদ্রাস্ফীতি এবং অনাহারে আরও বেড়ে যাবে। এছাড়া তেলের দাম পড়ে যাওয়া ও হজ বাতিলের ফলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। দেশটির বৃহত্তম আয়ের উৎস এই দুটি খাত। ভাইরাসের সংক্রমণ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় এমনিতেই ইরানের অবস্থা খারাপ। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ইরানের সরকারকে ফেলে দেবে এমন সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ায় ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলো থেকে নিশ্চিত জীবনের আশায় লোকেরা ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশে পাড়ি জমাতে মরিয়া চেষ্টা করবে। আন্তর্জাতিক বাঁধা-নিষেধ উপেক্ষা করে তারা শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করবে।
এরই মধ্যে তুরস্ক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা চিরকালীনভাবে ৪ কোটি সিরিয়ান শরণার্থীর চাপ সহ্য করতে পারবে না। প্রয়োজনে তারা ইউরোপীয় সীমান্ত খুলে দেবে। মিশর, সুদানের, মেক্সিকোর মতো দেশগুলো থেকে লোকেরা দলে দলে ইউরোপে ঢুকবে। ফলে অভিবাসী সংকট বাড়বে। অনেক দেশ অভিবাসীদের ঢল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটবে। খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ, শস্য রফতানি ইত্যাদি কারণে জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দেবে। অভিবাসীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে স্থানীয়রা। ইউরোপের অসংখ্য দেশে রক্তক্ষয়ী সংঘাতও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব কমাতে এবং আরও স্থিতিশীল ও টেকসই দিকনির্দেশে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা আজ কোন বড় বিনিয়োগের কথা চিন্তা করতে পারি না। বর্তমানে জৈব প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৃহত্তম বিনিয়োগ শুরু করার সুস্পষ্ট জায়গা। তবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রযুক্তিগত দিকে বড় বিনিয়োগ কমে যাবে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে কথিত সভ্যতার আমূল পরিবর্তন হবে। বিশ্বের অনেকগুলো দেশে ধর্মকর্মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের মাধ্যমে কথিত আধুনিক সভ্যতা গড়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ওই সভ্যতায় মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতা ভোগ করতে দেয়া হয়েছিল যেখানে মানুষ নিজের চারিত্রিক গুণাবলী সম্পূর্ণ হারাতে বসেছিল। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে কথিত এই সভ্যতার আমূল পরিবর্তন হতে পারে। সব মিলিয়ে এক ক্রান্তিকাল পার করছি আমরা। করোনার সংক্রমণ এড়াতে আমরা বর্তমানে হোম কোয়েরেন্টাইনে পালন করছি, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছি। করোনা ঝড় থামলেও এই অভ্যাস থেকে যাবে।
লেখক ঃ গবেষক ও কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com