করোনা চিকিৎসার অগ্রগতি

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৩:৪৭ পিএম, ১৬ মে ২০২০

মো. ইমরান হোসেন :করোনা ভাইরাসের মহামারি বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি করেছে ভয়াবহ এক মানবিক বিপর্যয়। চীনের উহান শহরে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরে মানবদেহে সর্বপ্রথম নতুন এক ভাইরাসের বিস্তার নজরে আসে চিকিৎসকদের। পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, এই ভাইরাসটি একটি নতুন করোনা ভাইরাস যার নাম দেয়া হয়েছে সার্স-কোভ-২। এই ভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট রোগের নাম কোভিড-১৯। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৪ মাসেই ভাইরাসটি বিশ্বের ৪৪ লক্ষাধিক মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে। এই সময়ে প্রাণ কেড়েছে ৩ লক্ষাধিক মানুষের! ভাইরাসটিকে থামাতে কার্যকরী ওষুধ অথবা ভ্যাকসিনের বিকল্প নেই। চলমান করোনাবিরোধী যুদ্ধের কার্যকরী সেই অস্ত্রের সন্ধানেই দিনরাত খেটে চলেছেন অসংখ্য জীবাণুবিজ্ঞানী।
ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে তিনধরনের চিকিৎসা রয়েছে। লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা, নিরাময়মূলক চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। এর মধ্যে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা হলো খুবই সাধারণ মানের চিকিৎসা। এতে রোগ নিরাময়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেবল ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলোকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এই চিকিৎসায় দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই যুদ্ধ করতে হয় ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে ওষুধগুলোর কাজ হলো কেবল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ‘সাপোর্ট’ দেয়া। করোনার চিকিৎসায় বর্তমানে এই ব্যবস্থাই অনুসরণ করা হচ্ছে।  যেমন- করোনা সংক্রমণের ফলে জ্বর হলে প্যারাসিটামল দেয়া হচ্ছে, সর্দি-কাশির জন্য ফেক্সোফেনাডিন বা ক্লোরফেনিরামিন জাতীয় ওষুধ দেয়া হচ্ছে। শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে, ফুসফুসের চরম সংকটে ব্যবহার করা হচ্ছে ভেন্টিলেটর। এগুলো পুরাতন চিকিৎসা পদ্ধতি।  এটি নিয়ে নতুন করে সেরকম কোনো গবেষণা হচ্ছে না। তবে ভেন্টিলেটর এবং আইসিইউ সুবিধা বিভিন্ন দেশেই পর্যাপ্ত নয়। তাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এগুলোর সংখ্যা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সংকট কাটিয়ে ওঠবার চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি হলো কিউরেটিভ ট্রিটমেন্ট বা নিরাময়মূলক চিকিৎসা। মানুষের দেহে রোগ সংক্রমণের পর এই চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকরী। এই চিকিৎসার জন্য নতুন ওষুধ আবিষ্কার ও ব্যবহার উপযোগী করতে ৮ থেকে ১০ বছরের গবেষণার প্রয়োজন হয়। কিন্তু করোনা মহামারির এই দুঃসময়ে এতো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। সেজন্যই বেছে নেয়া হয়েছে ওষুধ গবেষণার বিশেষ পদ্ধতি ‘ড্রাগ রিপারপাজিং’ বা ‘ড্রাগ রিপজিশনিং’। এই গবেষণায় পুরাতন ভাইরাসের ওষুধগুলোকে কাজে লাগিয়েই  নতুন রোগ দমনের চেষ্টা করা হয়। করোনা নিয়ে গবেষণায়ও চেষ্টা চলছে পুরাতন ওষুধ দিয়ে কি করে নতুন ভাইরাসটিকে দমন করা যায়।
কোভিড-১৯ রোগদমনে রিপজিশনিং হচ্ছে এমন একটি ড্রাগ হলো ক্লোরোকুইন বা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ব্যাপক আলোচিত হলেও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এর কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া যায় নি। উল্টো এর ব্যবহারে মৃত্যুর হার বাড়ার ঘটনা লক্ষ্য করেছেন গবেষকদল। সিএনএনের সংবাদে জানা যায়, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রথম ধাপে ৩৬৮ জন রোগী নিয়ে কাজ করেছেন গবেষকগণ। ইউএস ভেটেরানস হেলথ এডমিনিস্ট্রেশন মেডিকেল সেন্টার এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি সম্পন্ন করেছে। এতে সহযোগিতা করেছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পরীক্ষামূলক ট্রায়ালে ৯৭ জন রোগীর দেহে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন দেয়া হয়। দেখা যায়, ক্লোরোকুইন ব্যবহারকারী রোগীরাই বেশি মৃত্যুবরণ করেছেন! এই হার ২৭.৮%। অথচ যারা ওষুধটি ব্যবহার করেন নি, তাদের মৃত্যুর হার ১১.৪%। গবেষকগণ ক্লোরোকুইনের সাথে এ্যাজিথ্রোমাইসিনের “কম্বিনেশন” করেও করোনা রোগীর রোগের মাত্রা কমাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে এই ওষুধটি নিয়ে আপাতত আশা ছেড়ে দিতে হচ্ছে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনই শেষ হয়ে যায়নি। ড্রাগটির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফল পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
এরকম আরেকটি ওষুধ হলো অ্যাভিগান, যার জেনেরিক নাম ফ্যাভিপিরাভির। জাপানের ফুজিফিল্ম গ্রুপের এই ওষুধটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। করোনা চিকিৎসায়ও এই ওষুধটি নিয়ে চীনের একদল গবেষক বেশ ইতিবাচক ফলের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ডাটা ছাড়া কোনো কথা চিকিৎসা বিজ্ঞান বিশ্বাস করে না! তাই অ্যাভিগানের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলমান আছে। জুনের শেষের দিকে এই ট্রায়াল সম্পন্ন হবে বলে ফুজিফিল্মের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কিউরেটিভ ট্রিটমেন্ট গবেষণায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে ইবোলার একটি ওষুধ। সেটি হলো আমেরিকান কোম্পানি গিলিয়াড সায়েন্সের ‘রেমডেসিভির’। করোনা চিকিৎসায় ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আংশিক শেষ হওয়ার পর খানিকটা ইতিবাচক ফলের প্রমাণ পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ। ১০৬৩ জন রোগীর উপর ট্রায়ালের পর তারা জানিয়েছেন যে, ওষুধটি কোভিড-১৯ রোগীর সুস্থ হওয়াকে দ্রুততর করে। ফলে আমেরিকার এফডিএ ওষুধটি কেবল ‘ইমার্জেন্সি’ রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল থেকে জানা যায় যে, ওষুধটি ব্যবহার করে যারা সুস্থ হয়েছেন, তাদের সুস্থ হতে গড়ে ১১ দিন সময় লেগেছে।  আর যাদের রেমডেসিভির দেয়া হয় নি, তাদের সুস্থ হবার গড় সময় ১৫ দিন। অর্থাৎ রেমডেসিভির ব্যবহারকারীরা অন্য করোনা রোগীদের চেয়ে গড়ে ৪ দিন আগে সুস্থ হয়েছেন।  তবে রেমডেসিভির ব্যবহারকারী কিছু রোগী অন্য রোগীদের মতো মারাও গিয়েছেন। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্তদের তথ্যানুসারে, সাধারণ করোনা রোগীদের মৃত্যুর হার ছিল ১১.৬% এবং রেমডেসিভির ব্যবহারকারীদের মৃত্যুর হার ৮%। তাই করোনা রোগীর মৃত্যু কমাতে রেমডেসিভির খুব বেশি কার্যকরী প্রমাণ হয় নি। তবে এখনো ওষুধটির ট্রায়াল শেষ হয় নি। শেষ হলেই কেবল সঠিক তথ্যগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আবার রেমডেসিভির ব্যবহারকারীদের মধ্যে কিছু রোগীর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হওয়ায় ওষুধটির প্রয়োগও বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো। তাই এই ওষুধটি স্বল্প পরিসরে অনুমোদন পেলেও এর ব্যবহার হতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং কেবল মাত্র ‘হসপিটালাইজড’ ও ‘ইমার্জেন্সি’ রোগীদের ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করতে হবে। রেমডেসিভির এখনো ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল হিসেবে ফর্মুলেশন করা হয় নি। আপাতত এটি শিরার ইনজেকশন হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এখানে মনে রাখতে হবে, রেমডেসিভির মোটেই সকল করোনা রোগীর জন্য নয়, শুধুমাত্র মারাত্মকভাবে সংক্রমিত রোগীর জন্য। কারণ এখনো রেমডেসিভিরের কার্যকারিতা সন্তোষজনক নয়। তাই বাংলাদেশে কোনো কোম্পানি এর উৎপাদনে গেলে তার নজরদারি করতে হবে কঠোর হস্তে, যাতে মানুষের কাছে এটি পৌঁছে না যায়। এর ব্যবহার হতে হবে কেবলমাত্র বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে এবং করোনার ফলে প্রবল শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীর ক্ষেত্রে।  
নিরাময়মূলক চিকিৎসার জন্য এগুলোর বাইরেও এইডসের ওষুধ লোপিনাভির-রিটোনাভির, বাতের ওষুধ সারিলিমাবসহ অনেকগুলো ওষুধ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। ‘ড্রাগ রিপজিশনিং’ এর মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা অন্তত দু-একটি কার্যকরী ওষুধ পাবো বলে আশা করা যায়।
ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি হলো প্রিভেন্টিভ ট্রিটমেন্ট বা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। এর জন্য দরকার টিকা বা প্রতিষেধকের ব্যবহার। ইংরেজিতে এর নাম ভ্যাকসিন। তবে দুঃখের বিষয় হলো একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কার থেকে শুরু করে মানুষের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসতে বহু সময় লাগে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সময় ৮ থেকে ১৫ বছর। কিন্তু নোভেল করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে আশার বিষয় হলো, ভাইরাস আবিষ্কারের মাত্র ১০ দিনের মাথায় ৯ জানুয়ারিতেই এর জিনোম সিকুয়েন্স বা জিনগত গঠন জানতে পারে চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা। আর বিশ্বের সকল ভ্যাকসিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো একসাথে গবেষণায় নেমেছে সার্স-কোভ-২ এর ভ্যাকসিন তৈরিতে। চরম এই দুর্যোগ মোকাবিলায় গবেষণাক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে বরাদ্দ দিচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও দাতা প্রতিষ্ঠান।  এর ফলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশা করছে যে, মাত্র ১৮ মাসেই করোনার ভ্যাকসিন বাজারে আনা সম্ভব হবে।
কিন্তু ১৮ মাস করোনা ভাইরাসের জন্য পৃথিবীকে অনেকটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করার জন্য কম সময় নয়! ততদিনে মৃত্যুর সংখ্যা কোটির অঙ্কে চলে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আশার আলো দেখাচ্ছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারাহ গিলবার্টের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল। তারা ইতোমধ্যে তাদের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছেন। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তারা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতে পারবেন বলে আশাবাদী।  সেই সাথে সারাহ গিলবার্ট জানিয়েছেন যে,  প্রতিষেধকের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি নিশ্চিত! তারা এই প্রতিষেধকের আপাতত নাম দিয়েছেন “চ্যাডক্স-১”।
এছাড়া মার্কিন দুইটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে। কোম্পানি দুটি হলো মর্ডানা এবং ইনভিও। চীনের ক্যানসিনো বায়োলোজিক্স এবং জার্মানির বায়োএনটেক ইতোমধ্যে মানবদেহে তাদের প্রতিষেধকের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে। অন্তত ৭০টি ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলমান রয়েছে।  তবে যতটা দ্রুত কোভিড-১৯ রোগের কার্যকরী ভ্যাকসিন পাবো, তত দ্রুত আমরা আবার পৃথিবীতে মুক্তভাবে বিচরণ করতে পারবো, ততদ্রুত শঙ্কামুক্ত হবো।
করোনা ভাইরাসের কার্যকরী ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং মানবদেহে নিরাপদ ব্যবহার উপযোগী করতে যেসকল বিজ্ঞানী দিনরাত খেটে চলেছেন,  তাদের স্যালুট জানাই। এই বিজ্ঞানীদের দিকে প্রবল আশায় তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষ। সবশেষে করোনা চিকিৎসা নিয়ে গবেষণার সাথে যেসকল গবেষক, চিকিৎসক,  ফার্মাসিস্ট ও স্বেচ্ছাসেবকগণ যুক্ত রয়েছেন, তাদের সকলের জন্য থাকলো নিরন্তর শুভকামনা।
লেখক ঃ মাস্টার্স (অধ্যয়নরত), ফার্মেসি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।