জীবনের অনিবার্য পরিণতি বার্ধক্য

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:৩৯ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আব্দুল হাই রঞ্জু : জীবনের অনিবার্য পরিণতি বার্ধক্য। আর জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য, এটাই শ্বাসত সত্য। এরপরও মানুষ ঘর করে, গড়ে তোলে স্বামী-স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে সংসার জীবন। কি এক মায়ার বাঁধন! কেউ কাউকে ছাড়া যেন এক দন্ডও চলতে পারে না। বাবা মায়ের কোলে বড় হয় সন্তান। ধনী, গরিব সব পরিবারেই বাবা-মা সাধ্যমত আদর যতœ করে বড় করে বুকের ধন সন্তানদের। লালন-পালন করে, পড়াশুনা করায়, একটু অসুখ-বিসুখ হলে সন্তানের সুস্থতায় বাবা-মায়ের নির্ঘুম কত রজনী কেটে যায়। সেই সন্তান বড় হয়ে বাবা-মাকে ভুলে যাবে কিম্বা এই প্রচন্ড শীতে খোলা আকাশের নিচে রাস্তায় ফেলে যাবে, কি করে এটা বিশ্বাস করা যায়? অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘বৃদ্ধ পিতাকে রাস্তায় ফেলে গেল ছেলে’ শিরোনামে খবরটি পড়ে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠলো। বাঘেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় হিজলা ইউনিয়নের আমবাড়ি-বাবুগঞ্জ সড়কে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ৯০ বছরের এক বৃদ্ধ পিতাকে রাস্তায় ফেলে যায় সন্তান। বস্ত্রহীন অবস্থায় সকালে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় দায়িত্বরত পুলিশ প্রশাসন। এমনি কত খবরই না কমবেশি পত্রিকার পাতা খুললেই ইদানিং চোখে পড়ে। মনে হয়, অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবুও ভাবলাম এ বিষয়ে দু’চারটি কথা এবার লিখবো। সে সূত্র ধরেই এ লেখার অবতারণা।

আমি আমার মা-বাবাকে হারিয়েছি বছর কয়েক আগে। মা-বাবা হারা দুর্ভাগাদের সারিরও আমি একজন। এখন প্রতি মুহূর্তে মা-বাবার কথা ভাবি, মনের অজান্তেই মাকে বারবার ডাকি। এ ডাকে কি যে মধু আছে, যার উপলব্ধি কম-বেশি সবারই আছে। বাবা-মায়ের কোন তুলনা নাই। এরপরও মানুষ বাবা-মাকে ভুলে যায়, বাড়ি থেকে বের করে দেয়। রাস্তায় ফেলে আসে। এমনকি বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের অনেকের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। কি পাষন্ড সন্তান! কি করে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে নির্বিঘেœ ঘুমাতে পারে সন্তান? সবাইকে তো একদিন বৃদ্ধ হতে হবে, তাহলে সেদিন আমার পরিণতি কি হবে, এটা কেন সন্তানরা ভাবেন না? অথচ গরিব পরিবারে নয়, সামর্থবান পরিবারে এমন ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। অর্থাৎ সন্তানদের শিক্ষিত করেই সেই মা-বাবার স্থান হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। কি এক নিদারুন কষ্টের এ সমাজ ও রাষ্ট্র। যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বাবা-মায়ের ভরণপোষণে বাধ্যবাধকতা রেখে আইন করেছেন। আমরা এই আইনের যথাযথ প্রয়োগের বাস্তবায়ন চাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে অনেক খবরই চোখে পড়ে। ফেসবুকে দেখলাম, এক অসহায় বাবা সন্তানের উদ্দেশ্যে দু’চার লাইন লেখার চেষ্টা করছেন। বাবা হলেন, একজন চাইল্ড সাইক্লোজিস্ট এবং হংকং এর প্রখ্যাত টিভি সম্প্রচারকারী। তার কথাগুলো আমাদের সবার জন্যই প্রযোজ্য। তিনি লিখেছেন, প্রিয় সন্তান, আমি তোকে তিনটি কারণে এই চিঠিটি লিখছি। ১) জীবন, ভাগ্য এবং দুর্ঘটনার কোন নিশ্চয়তা নেই, কেউ জানে না সে কতদিন বাঁচবে। ২) আমি তোমার বাবা, যদি আমি তোমাকে এই কথা না বলি, অন্য কেউ বলবে না। ৩) যা লিখলাম, তা আমার নিজের ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা-এটাই হয়তো তোমাকে অনেক অপ্রয়োজনীয় কষ্ট পাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। জীবনে চলার পথে এগুলো মনে রাখার চেষ্ট করো। আমি চিঠিটা এখানে পুরোপুরি তুলে ধরতে পারছি না। তবে, একান্তেই যে টুকু না লিখলে নয়, তাই লিখছি মাত্র।

 তিনি লিখেছেন, জীবনে কিছুই কিম্বা কেউই অপরিহার্য নয়, যা তোমার পেতেই হবে। একবার যখন তুমি এ কথাটির গভীরতা অনুধাবন করবে, তখন জীবনের পথচলা সহজ হবে। বিশেষ করে যখন জীবনে বহুল প্রত্যাশিত কিছু হারাবে তখন তুমি তোমার তথাকথিত আত্মীয়স্বজনকে তোমার পাশে পাবে না। অথবা যারা তোমার প্রতি সদয় ছিল না, তাঁদের ওপর অসন্তোষ পুষে রেখো না। কারণ তোমার মা এবং আমি ছাড়া তোমার প্রতি সুবিচার করা কারো দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তিনি আরো লিখেছেন, জীবন সংক্ষিপ্ত। আজ তুমি তোমার জীবনকে অবহেলা করবে, কাল জীবন তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কাজেই জীবনকে মূল্যায়ন করতে শেখ। আর ভালোবাসা একটি ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি ছাড়া কিছুই নয়। মানুষের মেজাজ আর সময়ের সাথে সাথে এই অনুভূতি বিবর্ণ হবে। যদি তোমার তথাকথিত কাছের মানুষ তোমাকে ছেড়ে চলে যায়, ধৈর্য্য ধরো, সময় তোমার সব ব্যথা-বিষন্নতাকে ধুয়ে-মুছে দেবে। কখনও প্রেম ভালোবাসা মিষ্টতা এবং সৌন্দর্য্যকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না, আবার ভালোবাসা হারিয়ে বিষন্নতায়ও অতিরঞ্জিত হবে না। আমিও আশা করি না, বার্ধক্যে তুমি আমাকে অর্থ সহায়তা দিবে। এমনি অনেক উপদেশমূলক কথাগুলো তিনি তার প্রিয় সন্তানকে হয়ত অনেক কষ্ট নিয়েই লিখেছেন। কিন্তু কেন তিনি সন্তানকে ডেকে নিয়ে বলতে পারলেন না? তাহলে কি সন্তানের সঙ্গে এমন দূরত্ব ছিল, চিঠি লেখা ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর ছিল না তাঁর? বাস্তবে বৃদ্ধাশ্রমে থাকলে তো না লিখে উপায় কি? যাক পার্থিব জীবনে আমরা সবাই ভুলে যাই, বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের কথা, সম্মানের কথা। ফলে অধিকাংশ বাবা মায়েই শেষ জীবনে এসে মনের কষ্টকে লালন করেই শেষ জীবনের ইতি টানেন। না, এটা সভ্য সমাজে আশা করা যায় না। আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, দায়িত্বশীল হতে হবে, কেউ যেন বৃদ্ধ মা বাবার প্রতি অবিচার টুকু না করি।

গোটা বিশ্বজুড়েই চলছে কোভিড-১৯ এর এক অভিশপ্ত মহামারির কাল। কি এক ভয়ংকর ভাইরাস, ছোঁয়া যাবে না, ছুঁলেই আক্রান্ত হবে, মৃত্যু অনিবার্য হতেও পারে। যে কারণে করোনা আক্রান্ত সন্তান, বাবা, মা, ভাই-বোন কেউ কাউকে ছুঁয়েও দেখে না, উল্টো আক্রান্ত হলে রাস্তায় ফেলে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। দেখা গেছে, অতি আপনজন মৃত্যুবরণ করলেও কেউ তার সৎকারে এগিয়ে আসেননি। একমাত্র স্বেচ্ছাসেবির দল কিম্বা দায়িত্বরত পুলিশ বাহিনীকেই দায়িত্ব নিয়ে মৃত ব্যক্তির সৎকার করতে হয়েছে। মৃত্যু ভয়ে ছোট্ট হৃদয়ে মা-বাবার প্রতিও কি ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা লুকিয়ে থাকতে পারে, যা করোনা মহামারি না হলে হয়ত সহজে প্রকাশও হতো না। ঘটনাটি সুনামগঞ্জের। আমৃত্যু বালা দাস। বয়স ৯০ বছর। দুই ছেলের জন্মের পর স্বামীকে হারান। অনেক কষ্ট করে ছেলেদের বড় করেছেন। দুই ছেলে অবস্থাপন্ন। তাদের দাবি, করোনার মহামারিতে অন্য জেলা থেকে আসা মানুষকে দেখতে তাদের বাড়িতে যাওয়ার অপরাধে বৃদ্ধা মাকে সন্তানরা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আর এক ঘটনা, টাঙ্গাইলের সখীপুরে করোনা সন্দেহে এক নারীকে জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে তার স্বামী, সন্তানেরা। এমনও ঘটনা ঘটেছে, বাবা-মা করোনায় মারা যাওয়ার পর শ্মশানে নেয়ার মতো আপনজনও ছিল না। প্রতিবেশি মুসলমানদেরকে শ্মশানে নিয়ে সৎকার করতে হয়েছে। এমনি হাজারো ঘটনা ঘটেছে গোটা দুনিয়াজুড়ে। আবেগ, ভালোবাসা, প্রেম, মানবিকতা, মনুষ্যত্ব, নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, অমানবিকতা, মনুষ্যত্বহীনতার নজির ভুড়ি ভুড়ি ঘটেছে। জীবনের কি মায়া! আবার করোনা আক্রান্ত ছোট শিশুকে বাবা কাঁধে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরলেও চিকিৎসাটুকু করাতে পারেননি। কাঁধেই মৃত্যুবরণ করেছে আদরের বুকের ধন প্রিয় সন্তান। মানবতার প্রতীক চিকিৎসকও অনেক সময়ই রোগীকে হাতে ধরে দেখেননি। ভিডিও কলে চিকিৎসা দিয়েছেন। কত মানুষ করোনা আক্রান্ত না হয়েও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন। সে এক ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার করুণ চিত্র বিশ্ববাসীকে দেখতে হয়েছে। যা লিখে প্রকাশ করাও যাবে না। শুধু করোনারকাল নয়, এছাড়াও অমানবিক হাজার ঘটনা ঘটে আমাদের সমাজে।

২০১৯ সালের জুন মাস। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় রাস্তায় ফেলে যায় ৭৫ বছরের খোদেজা বেগমকে। ঘটনার ১৫ দিন আগে দুই ছেলে হাছেন আলী ও জামাল নানার বাড়ির ২০ শতাংশ জমি মায়ের কাছ থেকে লিখে নিয়ে মাকে রাস্তায় ফেলে যান। খবর পেয়ে আড়াই হাজার থানার পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে নিজের মা মনে করে বুকে টেনে নেন। এ ঘটনায় বৃদ্ধার ২ ছেলেকে পুলিশ আটক করে। পরে ওসির উদ্যোগে দুই সন্তানের কাছ থেকে বৃদ্ধার নামে দুই শতাংশ জমি লিখে নেয়া হয়। বৃদ্ধা বলেন, পুত্রবধূরা আমাকে বিভিন্ন সময়ে মারধর পর্যন্ত করতো। আমাকে রাস্তায় ফেলে দিলে ওসি নজরুল ইসলাম আমাকে বুকে তুলে নেন। আমি ওই ওসির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। তা না হলে মাথাগুঁজে থাকার ঠাঁইটুকু আমার হতো না। এমনি কত বৃদ্ধা মা বাবার করুণ কাহিনী আমাদের সমাজে ভুরিভুরি আছে। সংগত কারণে সরকার বৃদ্ধা মা-বাবার ভরণপোষণের বিষয়টি আইনে রূপান্তর করে এক যুগান্তকারী ঘটনার জন্ম দিয়েছে। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ মহতি উদ্যোগ সফল হোক। এখন থেকে বাবা-মাকে ভরণপোষণ কিম্বা দেখা শোনা না করলে আইনগত ব্যবস্থা শক্তভাবে কার্যকর করতে হবে। যেন কোন সন্তানই বৃদ্ধা মা-বাবার প্রতি ন্যুনতম অবিচার করতে না পারে। মায়ার বাঁধনে আবদ্ধ পারিবারিক মূল্যবোধ, দায়িত্ব সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে। তাহলেই কেবল মনুষ্যত্ব বিকশিত করা সম্ভব। কারণ মানুষের বিবেক, বিবেচনা, মনুষ্যত্বের বিকাশ না ঘটলে শুধু আইন করেই পারিবারিক বন্ধন ও দায়িত্ব, কর্তব্যের প্রতিপালন নিশ্চিত করা কশ্মিনকালেও সম্ভব হবে না। এ জন্য সমাজ, সভ্যতা ও মানবিকতার চর্চা করতে হবে। তাহলেই কেবল পারিবারিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সদয় আচরণ বোধকে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সংগত কারণে সমাজ, সভ্যতার বিকাশে সন্তানদের সৎ ও ন্যায়বোধের শিক্ষা দিয়েই মানুষ করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটলে অমানুষদের কাছে মনুষ্যত্বের আশা করা হবে ‘সোনার তৈরি পাথর বাটির’ মতো অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসুত।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮