বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৬:১৮ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মামুন রশীদ: প্রতিদিনই বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। বাঙালির বড় অংশের নিত্যপণ্যের তালিকায় থাকে চাল, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেল। অথচ এই তিনটি পণ্যের দাম চার মাস ধরেই বাড়তি। সয়াবিন তেলের দাম তো রেকর্ড স্পর্শ করেছে। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে একজন ক্রেতা প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ফেব্রুয়ারিতেও ৮০ টাকা কেজি দরে কাঁচামরিচ খেতে হবে, ভাবা যায়?’ সত্যিই ভাবা যায় না। আর না ভাবা কা-কীর্তিই এখন সবখানে। কৃষকের হাতে যখন পণ্য থাকে, তখন পণ্যের দাম মেলে না। কিন্তু কৃষকের হাত থেকে পণ্য যেই হাতছাড়া হয়ে যায়, তখনই তার দাম বাড়ে। সেই বাড়তি দামেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। করোনাকালীন সময়ে যখন মানুষ ঘরে বন্দি, তখন বাজার থেকে মানুষকে যে দামে আলু কিনে খেতে হয়েছে, তা কি কেউ কখনো কল্পনা করেছে? আলুর দাম বাড়তে বাড়তে কোথায় ঠেকবে, তা যখন অনিশ্চিত তখন বাধ্য হয়ে সরকারকে দাম নির্ধারণ করে দিতে হয়। করোনামহামারীর সময়ে যখন টোটকা হিসেবে গরম পানিতে আদার রস খাবার পরামর্শ দিচ্ছিলেন অনেকে। তখন আদার দাম বাড়াতে বাড়াতে যেখানে ঠেকানো হয়, তাতে করে নি¤œবিত্ত তো দূরের মধ্যবিত্তের পক্ষেও আদার নাগাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পেঁয়াজের দামের কথাও আমরা ভুলে যাইনি। আমরা ভুলে না গেলেও প্রতিবছর কোনো না কোনো পণ্যে কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় বিপুল অর্থ। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি। নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতির প্রমাণ মেলে সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির তথ্যেও। বিবিএস বলছে, ২০২০ সালে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। গত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণ, বাজার মনিটরিংয়ের কথা বরাবরই আলোচনায় থাকে। সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করেন। তারপরও কেনো যেনো বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সরকারের দৃঢ়তায়, প্রণোদনায় আমরা করোনামহামারী সামাল দিয়েছি। কিন্তু বাজার সামাল দেওয়া কেন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, তার তত্ত্ব তালাশ করা প্রয়োজন।
মধ্যবিত্তের পরিবারেই সবসময় থাকে লড়াই-সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা, পথ হারিয়ে ফেলার শঙ্কা। করোনাকালীন বৈশ্বিক মহামারীর চরম দুর্দিনের নৃশংস শিকার মধ্যবিত্ত। সীমিত আয়, ছোট চাকরি, ছোট ব্যবসা, মাস শেষে বাড়িভাড়া, বাজার খরচ, সন্তানের স্কুলের বেতন, আনুষঙ্গিক আরো অনেক খাতে খরচের মাঝেও হাজারো স্বপ্ন, সাধ কিন্তু সাধ্য থাকে না। টানাটানির জীবনে নতুন সংকট তৈরি হয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘিরে। গত প্রায় এক বছরের শূন্যতা পূরণ মধ্যবিত্তের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। করোনাকালীন সময়ে অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়েছে। রাজধানীতে তারা কোনরকমে দিনাতিপাত করেছে, তাদের অনেকেই রাজধানী ছেড়েছে। মহামারীকালে দলে দলে মানুষের রাজধানী ছাড়ার দৃশ্য সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে কারো অজানা নয়। মহামারীকালে যখন জীবন বাঁচানোই ছিল সংশয়ের, তখন অনেকেরই বেতন কমেছে। সরকার ঘোষিত ছুটির সময়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের দিয়েছে অর্ধেক বেতন। যা দিয়ে রাজধানীতে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই রাজধানী ছাড়ে অনেক পরিবার। বেসরকারি সংগঠন পিপিআরসি ও বিআইজিডির গত আগস্টের গবেষণায় বলা হয়, করোনাকালে রাজধানী ঢাকা ছেড়েছে অন্তত ১৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ, যোগাযোগের ব্যয় এবং অন্য নানামুখী ব্যয় মেটাতে না পেরেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থাটির আশঙ্কা, নতুন জরিপে এই হার আরও বাড়বে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ পূরো বিশ্বই আজ করোনার বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে ক্রমশ সচল হচ্ছে জীবন ও জীবিকা। এ বড় আশার খবর, আনন্দের খবর। কিন্তু তারমাঝেও বেদনা ভরা কণ্ঠে বলতে হয়, আমাদের মধ্যবিত্তের জীবনযাপন মসৃণ হয়নি। এখনও এই জীবন অনিশ্চিত। এখানো প্রতি মুহূর্তে চাকরি হারানোর আশঙ্কা। কাজ করেও বেতন না পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। করোনার সংক্রমণের ভয়ে যখন সবাই ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, তখনো পাওনা বেতনের দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। সেই অমানবিক ও বিভৎস দৃশ্য তাড়া করে ফিরবে সভ্যতাকে। আগামীর লড়াইয়ে টিকে থাকার প্রবল প্রতিযোগিতায় আমাদের বিকাশমান মধ্যবিত্ত পরিবারের নিরাপত্তায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। মধ্যবিত্তদের জীবনে যে সংকট শুরু হয়েছে, তা যদি সামলানো না যায়, তাদের সংকট যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে তাদের অনেকেই নি¤œ মধ্যবিত্তের আওতায় চলে আসবে। যা আমাদের অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই ভালো খবর নয়। আমরা নি¤œ আয়ের দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় প্রবেশ করেছি, সেখানে আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে এ সময়ে, এই সংকটে তাই মধ্যবিত্তের দিকে সরকারকে আলাদা দৃষ্টি দিতে হবে।
লেখক ঃ কবি, সাংবাদিক
০১৯১২-৩০৬৩৫৬