প্রাণ ফিরে পেল ঢাকাই মসলিন

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৬:১৫ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ওসমান গনি: :একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সর্বোচ্চ কদর পেত আমাদের দেশের তাঁতিদের হাতে বোনা এই মসলিন শাড়ী। যা ‘ঢাকাই মসলিন’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিল। ১৮৫০ সালে শেষবারের মতো মসলিনের প্রদর্শনী হয় লন্ডনে। সেই প্রদর্শনের ১৭০ বছর পর ২০২০ সালে আবার ঢাকাই তাঁতিরাই বুনেছেন এই মিহি সুতিবস্ত্র। ফুটি কার্পাস তুলা থেকে উৎপন্ন অতি চিকন সুতা দিয়েই তৈরি হয়েছে এই মসলিন। দীর্ঘ  ছয় বছরের চেষ্টায় আবারও মসলিন বুনতে সফল হয়েছেন বাংলদেশের গবেষকরা। প্রচলিত আছে, কারিগরদের আঙুল কেটে দেয়ার পরে ঢাকাই মসলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভারতেও এক রকম মসলিন তৈরি হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাই মসলিনের বিশেষত্বই আলাদা।নতুন করে বাংলাদেশ প্রবেশ করল ১৭০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মসলিনের নতুন যুগে।  বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক সহযোগিতায় একদল দক্ষ গবেষকরা দিনরাত অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রম করে হারিয়ে যাওয়া মসলিনের প্রাণ ফিরিয়েছেন। ১৭১০ সালে বোনা একটি শাড়ির নক্সা দেখে হুবহু মসলিন শাড়ি বুনেন বাংলাদেশের তাঁতিরা।
ফলে ঢাকাই মসলিন এখন বাংলাদেশেরই। গবেষকদের দীর্ঘ ছয় বছরের প্রচেষ্টায় মিলেছে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতিও। একমাস আগে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকাই মসলিনকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ হয়েছে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং মসলিনকে তুলনা করেছিলেন ভোরের হালকা কুয়াশার সঙ্গে। এ কাপড় নাকি এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে আংটির ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারত। অনায়াসে এঁটে যেতে পারত দেশলাই বাক্সের ভেতর। নারায়ণগঞ্জের দু’জন তাঁতিও যে মসলিন শাড়ি তৈরি করেছেন তাও অনায়াসে আংটির ভেতর দিয়ে পার করা সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও একদল নিষ্ঠাবান গবেষকের হাত ধরে ১৭০ বছর পর ফিরে এসেছে ঢাকাই মসলিন। ২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় মসলিন সুতা তৈরি হতো, তা জেনে সে প্রযুক্তি উদ্ধারের নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ওই বছরই ঢাকায় মসলিন তৈরির প্রযুক্তি ও পুনরুদ্ধার নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। পরে গবেষণা কাজের স্বার্থে আরও সাত সদস্যকে কমিটিতে যুক্ত করা হয়। প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোঃ মনজুর হোসেনকে।

দীর্ঘ ৬ বছরের সফল চেষ্টার পর  প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক মোঃ মনজুর হোসেন তার কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হন। ঢাকাই মসলিন আবিষ্কারের খবর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে ফলাও করে। এর থেকে জানা যায়, এ হারানো মসলিনের ইতিহাস ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে তাদের কত কষ্ট আর পরিশ্রম করতে হয়েছে। বিভিন্ন  বই পুস্তক ঘাটাঘাটি করে মসলিন তৈরির উপাদানের কথা জানতে পারেন যে,  ফুটি কার্পাস’ থেকে মসলিন তৈরির সুতা পাওয়া যায়। যা কোন একসময় পূর্ব ভারত তথা বাংলাদেশে এই গাছের চাষ হতো। তখন গবেষকরা বহু ত্যাগ তিতিক্ষার পর মসলিন তৈরির কার্পাসের সন্ধান পান। এবার তারা মসলিনের নমুনা সংগ্রহের জন্য দেশ বিদেশের বহু মিউজিয়ামে অনুসন্ধান করে কোথাও না পেয়ে পরবর্তিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে যাওয়া হয়। সেখানে মসলিনের কাপড়ের নমুনা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায়।এবার মসলিন বুনার জন্য তাঁতির প্রয়োজন। সেই তাঁতিকে খুঁজতে আবারও সারাদেশে খোঁজ নেয়া হয়। দেশের যে যে অঞ্চলে এখনও তাঁতিরা তাঁতে কাজ করেন এবং চরকায় সুতা কাটেন সেসব এলাকায় খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে নারায়ণগঞ্জে দুজন তাঁতির খোঁজ তারা জানতে পারেন। কিন্তু এত মিহি সুতা দিয়ে কেউ বানাতে রাজি হচ্ছিল না। পরে তাদের কয়েক ধাপে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বহু কষ্টে তারা বুনন পদ্ধতি রপ্ত করে। অবশেষে ১৭১০ সালে বোনা শাড়ির নক্সা দেখে হুবহু একটি শাড়ি বুনে ফেলেন তাঁতিরা। প্রথম অবস্থায় শাড়িটি তৈরি করতে খরচ পড়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মোট ছয়টি শাড়ি তৈরি করা হয়। যার একটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেয়া হয়েছে।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯