ভাষার বিকৃতি রোধে প্রয়োজন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:২৮ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ইসলাম রফিক  : ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সংগঠিত একটি গণ-আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে, প্রশ্নœ দেখা দেয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রিয় নেতৃবৃন্দ এবং উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু’র কথা বললেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে দাবি ওঠে বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। ১৯৫২ সালের ২৩ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন এবং পলটন ময়দানে জনসভায় ঘোষণা করেন পাকিস্তানের  রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সংগে সংগে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয় এবং ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে  এবং আন্দোলনে শহীদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জববার, আবুল বরকত। যেভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে। সে সময় সেক্রেটারী জেনারেলের প্রধান তথ্য কর্মচারী হিসেবে কর্মরত হাসান ফেরদৌসের নজরে এ চিঠিটি আসে। তিনি ১৯৯৮ সালের ২০শে জানুয়ারী রফিককে অনুরোধ করেন তিনি যেন জাতিসংঘের অন্য কোন সদস্য রাষ্ট্রের কারো কাছ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন। পরে রফিক, আব্দুস সালামকে সাথে নিয়ে “মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড” নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। এতে একজন ইংরেজিভাষী, একজন জার্মানভাষী, একজন ক্যান্টোনিজভাষী, একজন কাচ্চিভাষী সদস্য ছিলেন। তারা আবারো কফি আনানকে “এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড”-এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লেখেন এবং চিঠির একটি কপি ইউএনওর কানাডীয় দূত ডেভিড ফাওলারের কাছেও প্রেরণ করা হয়। ১৯৯৯ সালে তারা জোশেফের সাথে ও পরে ইউনেস্কোর আনা মারিয়ার সাথে দেখা করেন, আনা মারিয়া পরামর্শ দেন তাদের প্রস্তাব ৫টি সদস্য দেশ ক্যানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশ দ্বারা আনীত হতে হবে। তারপর বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তা প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দানে ২৯টি দেশ অনুরোধ জানাতে কাজ করেন।
১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ও এতে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ- এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। মে মাসে ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। যত্রতত্র ভাষার বিকৃতি: রাস্তা দিয়ে চলতে ফিরতে সব জায়গায় দেখা যায় বাংলা ভাষার দুরবস্থার চিত্র। অফিস আদালত কিংবা সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম হলো সাইনবোর্ড। সাইন বোর্ডের লেখা দেখে আমরা প্রতিষ্ঠান চিনে নেই। সেই সাইন বোর্ডের কি ভয়াবহ অবস্থা? ভুল বানান, বিরাম চিহ্নের অপব্যবহারে ভরপুর সাইনবোর্ডগুলো। ইচ্ছেমতো সবাই সাইন বোর্ড বানাচ্ছে, দেয়াল লিখন করছে। রিক্সা, ভ্যানে, বাসে, ট্রাকে অর্থাৎ পরিবহনে যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে ভুল বানান কিংবা ভাষার বিকৃতি। ফলে সঠিক বানানে যখন পড়তে যাচ্ছে ছেলে মেয়েরা তখন রাস্তার সাইনবোর্ডে কিংবা দেয়াল লিখনে পড়া ভুল বানান তাকে দ্বিধান্বিত করছে। আবার অনেকে বেশি স্মার্ট দেখানোর জন্য সাইনবোর্ডে ইংরেজি ব্যবহার করছে। অনেকে নিজেকে স্মার্ট এবং শিক্ষিত প্রমাণের জন্য প্রচলিত বাংলা শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি শব্দ বেশি ব্যবহার করছেন। আদালতসহ অনেক জায়গায় এখনো ইংরেজি ব্যবহার চলছে দেদারছে। যদিও আদালতে বাংলা ব্যবহারের কথাবার্তা চলছে। সেটা কবে নাগাদ হবে, কে জানে।
ইদানিংকালে বাংলা নাটকে বাংলাভাষা বিকৃতির ফ্যাশন চালু হয়েছে। কে কতটা বিকৃত করে বাংলাভাষাকে উপস্থাপন করতে পারে সে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে নাটকে। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো তা প্রচার করছে যাচাই বাছাই না করেই। ফলে কোমলমতি শিশুরা বাংলা ভাষার বিকৃতিতে প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলা ভাষার যেমন বিকৃত ব্যবহার, তেমনি উপস্থাপনার ঢং গায়ে জ¦ালা ধরিয়ে দেয়। এইসব নাটক, এইসব সিরিয়াল যাচাই বাছাই না করে টিভিচ্যানেলগুলোতে যায় কি করে? ভারতীয় চ্যানেলগুলো দেখতে দেখতে ছেলে মেয়েরা হিন্দি ভাষা শিখছে এবং তা পরস্পরের মধ্যে ব্যবহার করছে। এভাবে ধীরে ধীরে তারা বাংলা ভাষা থেকে সরে যাচ্ছে। ইদানিং ফেসবুকে চালু হয়েছে ইংরেজি দিয়ে বাংলা লেখা। মেসেজে, চ্যাটিংয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে এই বাংলারেজি ভাষা। অর্থাৎ সঠিকভাবে বাংলাও হচ্ছে না, সঠিকভাবে ইংরেজীও হচ্ছে না।  এগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে না এলে ভাষার দুর্দিন অনাগত। ভাষার বিস্তার ও বিকৃতি রোধে প্রয়োজন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ : বর্তমানে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি, ৮ ফাল্গুন দিনটি যথাযথ মর্যাদায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে পালন করা হয়। তারপর সারা বছর আর মাতৃভাষা নিয়ে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোন উদ্যোগেই আর কাজ থাকে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু ধরা বসাধা কাজ থাকলেও ভাষার বিকৃতি রোধে বড় ধরনের কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউট কিংবা বাংলা একাডেমি নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে কতটুকুই বা যেতে পারছে ?  
প্রতি জেলায় জেলায় কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। যে কর্তৃপক্ষ ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে। সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, রিস্কা, ভ্যান, অফিস আদালত যেখানেই বানান সংক্রান্ত কাজ থাকবে, সেজন্য নিতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। ইচ্ছে করলেই যেনো সাইন বোর্ড না বানানো যায়, ইচ্ছে করলেই যেন, ব্যানার না লেখা যায়। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ থাকলে ভাষার বিকৃতি যেমন কমবে তেমনি সঠিক চর্চার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখাও সম্ভব হবে। ইচ্ছে করলেই যেন বিকৃত ভাষার সিনেমা, নাটক প্রচার না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে, নজর দিতে হবে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালতগুলোতেও। কাজটি কঠিন, কিন্তু এখনি পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা দায়বদ্ধ থাকবো। ইতোমধ্যে বিশ্ব থেকে হারিয়ে গেছে অনেক ভাষা। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই বাংলা ভাষাকে সংরক্ষণ করতে হবে। কেননা নদীর যেমন দূষণ, তেমনি আছে ভাষারও দূষণ। আর এই দূষণ রোধে প্রয়োজন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।
লেখক ঃ কবি, সভাপতি, বগুড়া লেখক চক্র
[email protected]
০১৭১২-৬২৬৪২৬