নিরাপদ খাদ্য এখন সময়ের দাবি

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:১৭ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

অলোক আচার্য : কয়েকটি মৌলিক এবং প্রতিদিনের অতি জরুরি পণ্যের মধ্যে প্রধান হলো খাদ্য। আমরা প্রতি বেলায় যে খাদ্য গ্রহণ করছি তা কতটা নিরাপদ বা ভেজালমুক্ত তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। কারণ প্রতিনিয়তই ভেজাল খাদ্যের ফিরিস্তি দেখলে বা শুনলে কোনো খাদ্যই আর নিরাপদ বলে মনে হয় না। অথচ জেনেশুনেই এবং স্বজ্ঞানে আমরা এই ভেজাল খাচ্ছি। আর সেই বাধ্যবাধকতার সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যে ভেজাল দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। খাদ্যে ভেজাল আমাদের এই দুর্ভোগ বছরের পর বছর জুড়ে চলে আসছে। একজন ব্যবসায়ী আমাদের কাছে নিরাপদ খাদ্যপণ্য সরবরাহ করবেন এটাই ছিল স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয় এতটা অস্বাভাবিক হয়েছে যে আজকাল খাদ্য কিনে বিশ^াসই হয় না যে এতে কোনো ভেজাল নেই। আমাদের চোখের অলক্ষ্যে যে খাদ্য তৈরি হচ্ছে সেগুলোতে মাঝে মধ্যেই লোভী মানুষের যে ভয়ংকর কারসাজি দেখতে পাই তাতে বিশ^াস করাও যায় না। এমন কোনো খাদ্য হয়তো আজ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে সেখানে কিছু লোভী মানুষ তাদের কারসাজি করছে না। নিরাপদ খাদ্য পাওয়াটা আজ আমাদের জন্য সত্যি খুব দরকার হলেও তা চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র বাড়িতে যখন কোনো কিছু তৈরি করে খাওয়া হচ্ছে অথবা ছাদে নিজের উৎপাদিত সবজি খেতে পারছি সেটাই যা একটু নিশ্চয়তা দেয়। বাকি সব খাদ্যেই সন্দেহ থাকছে। কোন খাদ্য নিরাপদ আর কোন খাদ্য ভেজাল দেওয়া তা চেনার উপায় নেই। আমরা তা পারিও না। আবার অনেকটা মেনেও নিয়েছি। আমরা জানি আমার সন্তান কি খাচ্ছে কিন্তু আমরা এতটাই অসহায় যে জানার পরেও কিছু বলার থাকছে না। কারণ সবাই তো তাই খাচ্ছে। তাহলে আমারই বা অসুবিধা কেন?
সারাবছরই অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হন। নামী দামী ব্র্যান্ডের নকল করে বাজারে আসছে পণ্য। সেটা আমরা কিনছি না জেনে। একসময় তা প্রকাশ হয়। কিন্তু ততদিনে তো তা আমাদের শরীরে পৌঁছে দিয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে অসাধু মানুষগুলো মুনাফার জন্য এসব করছে তাদের সন্তানও কিন্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভেজাল পণ্যই পাচ্ছে।  তারাও জনগণের সাথে প্রতারণা করছে। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে এখন কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। এরা নিজেদের এত নিচে নামিয়ে এনেছে যে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। একই আইনে ১৪ বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয় ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’। নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ২০১৮ সাল থেকে ফেব্রুয়ারির দুই তারিখকে নিরাপদ খাদ্য দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে আসছে। একজন ভোক্তা হিসেবেও আমাদের নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর চতুর্থ অধ্যায়ে (ক্রম-৪১) এ উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করিলে বা করিতে প্রস্তাব করিলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদন্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। আমরা কতজন এটা জানছি। একজন ভোক্তা হিসেবে আমাদের আরও বেশি সচেতন এবং অধিকার সচেতন হতে হবে।  খাদ্যে ভেজাল দিয়ে তিলে তিলে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে যারা তারা কেন সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করবে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও কোন না কোন খাদ্যপণ্য ভেজাল বলে সনাক্ত হচ্ছে। পবিত্র এই মাসেও এসব অসাধু মানুষগুলো তাদের কাজ দেদার চালিয়ে নিচ্ছে। বাজার থেকে যে ম্যাঙ্গো জুস কিনে খাচ্ছি দেখা গেল সেসব জুসে আমের চিহ্নমাত্র নেই। আবার পত্রিকায় দেখলাম রাজবাড়ির পাংশায় আখের গুড় বলে যে জিনিসটা বিক্রি হচ্ছে তাতে আদৌ আখের রসই নেই। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। খাদ্যপণ্যে কেন ভেজাল দেয়? কেবল লাভ আর লোভের বশবর্তী হয়েই তারা এই কাজটি করছে সন্দেহ নেই। যারা খাদ্যপণ্যে ভেজাল দিয়ে বিক্রি করে বড়লোক বনে যাচ্ছেন ভেজাল আসলে তাদের নিজেদের মধ্যে। মানুষ হিসেবে তারা সঠিক নয় বলেই তাদের কর্মেও তারা সঠিক নন। পৃথিবীর অনেক দেশে রমজান মাসে খাদ্য পণ্যের দাম কমানো হয়। আর আমাদের দেশে হয় ঠিক উল্টো। দাম যেন এ সময় না বৃদ্ধি পায় তার জন্য সরকারকে নানা পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু কেন? কেন আমরা নিজেরাই একটু সৎ হই না।  প্রতিদিন খাদ্যপণ্যে ভেজাল মিশিয়ে মোটা টাকা লাভ করে একদিকে এসব ব্যবসায়ীরা বাড়ি গাড়ির মালিক ও সমাজের হর্তা কর্তা বনে যাচ্ছেন অন্যদিকে যারা এসব পণ্য খাচ্ছে তারা নিত্য অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়ে মরছেন। এর থেকে মুক্তির উপায় কিন্তু কঠিন নয়। বরং সহজ। নিজেদের প্রতি একটু সততা। আমরা জানি কোনটি আমাদের করা উচিত আর কোনটি করা উচিত নয় । দেশপ্রেম অন্তরের বিষয়। ভেতরে দেশপ্রেম না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব।  আজ যারা মাছে, ফলমূলে ফরমালিন মেশাচ্ছেন, যারা মুড়ি ভাজার সময় ইউরিয়া সার ব্যবহার করছেন, যারা চালে মোম ব্যবহার করে পালিশ করছেন বা মোটা চাল ছেটে চিকন করে মোটা টাকা কামাচ্ছেন, যারা অখাদ্য-কুখাদ্য বাহারি মোড়কে মুড়িয়ে আমাদের খাওয়াচ্ছেন তারাও কিন্তু বাজার থেকে ভেজাল পণ্য কিনেই বাড়ি ফিরছেন। তিনি নিজেও এই চক্রের প্রভাবের বাইরে নন। তিনি তার পরিবারের কাছে কি জবাব দেবেন। তার সন্তান এবং পরিবারের সদস্যরা সেই ভেজাল পণ্যই খাচ্ছেন। তাহলে তার কি লাভ হলো। তিনিও তো ঠকছেন। নিজে মানুষকে ঠকাচ্ছেন সেই সাথে নিজেই ঠকছেন। যে দোকানদার মিষ্টির প্যাকেটে কারসাজি করে ওজন বাড়িয়ে মিষ্টি কম বিক্রি করেন সেই দোকানদার কি বাজার থেকে ঠকছেন না। তাকেও তো বাজার থেকে সেই দুধ কিনতে হচ্ছে যে দুধে আদৌ দুধই নেই। কেবল জল, পাউডার আর কেমিক্যাল মেশানো রয়েছে। যে বেকারী পঁচা ডিম দিয়ে বিস্কুট বা পাউরুটি তৈরি করছেন তাকেও তো বাজার থেকে চাল, ডাল কিনতে হচ্ছে। তাকেও ভেজাল খাদ্যই কিনতে হচ্ছে। একজন আরেকজনকে ঠকিয়ে পকেট ভারী করে ভাবছি লাভটা অনেক হয়েছে। কিন্তু শেষমেশ সবই লোকসানের খাতায়। তার পরিবারও সেই ভেজাল খেয়েই অসুস্থ হচ্ছে। তখন তিনি কাকে দোষ দেবেন? তবুও তিনি তার জায়গা থেকে সরছেন না। তিনি রীতিমত তার ভেজাল কারবার ফেঁদে পয়সা কামাচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে জনগণ এক্ষেত্রে অসহায়। কারণ বাইরে থেকে কারও বোঝার উপায় নেই যে কোন পণ্যটি ভেজাল আর কোনটি আসল বা খাঁটি। এখানে কেবলই বিশ^াস কাজ করে। আর এই বিশ^াসকে পুঁজি করেই এসব ভেজাল কারবারীরা মোটা টাকার মালিক হয়ে যান। এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি- কতবছর আগে কবি এ কথাটি বলেছিলেন আর আজও সে কথার প্রয়োগ আমাদের সমাজের সর্বত্র ঘটে চলেছে। এত এত টাকার মালিক হওয়া সত্বেও তিনি কিন্তু তার ভেজাল কারবার বন্ধ করছেন না।
দেশকে ভালবাসি এটা প্রমাণ করার জন্য কোন প্রচারের দরকার হয় না। দরকার হয় কাজের। দেশ এমনি এমনি উন্নত দেশে পরিণত হয় না। দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হয়। ব্যবসায়ীরা এর বড় অংশীদার। কারণ তারা ব্যবসায়ের মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। আমি দেশের জন্য কতটুকু কাজ করছি কি কাজ করছি সেটাই মূখ্য বিষয়। যারা ভেজাল ব্যবসায়ী তাদের ভেতর দেশপ্রেম থাকতেই পারে না। তারা কোনভাবেই দেশের মানুষকে ভালোবাসতে পারে না। যে যার যার জায়গা থেকে দুর্নীতি করলে দেশটা চলবে কিভাবে? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কোন খাদ্যপণ্য কেনার আগেই মনে সন্দেহ জাগে। এই সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আবার না কিনেও কোন উপায় নেই। আমাদের খেতে হবে, বাঁচতে হবে তো। ভেজাল খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন এবং সচেতনতা দুটোই একসাথে প্রয়োজন। আইনের কাজ হলো খুব দ্রুততার সাথে এসব ভেজাল পণ্য চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের শাস্তি এমন হতে হবে যাতে অন্য ব্যবসায়ীরা এই কাজ করতে সাহস না পায়। অন্যকে যারা বিষ খাইয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা কেন কঠিনতম শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকার আরো কঠোর হচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রিতে জারি হচ্ছে কঠোর বিধিনিষেধ। এজন্য ২০১৩ সালে প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইনের কঠোর বাস্তবায়নে প্রণয়ন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য প্রবিধিমালা। নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস এখন সময়ের দাবি। উন্নত দেশগুলিতে নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করতে কঠোর আইনের পাশাপাশি তা বাস্তবায়ন করা হয়। খাদ্যে ভেজাল দেয়াকে মানুষ হত্যার কাছাকাছি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এসব দেশে। আর ভেজাল খাদ্য দিয়ে মানুষকে ক্রমেই মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সচেতনতার সাথে সাথে আইনের প্রয়োগ করতে হবে।
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬