ই’তিকাফ ও লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য এবং ফজিলত

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৫:১২ পিএম, ১৫ মে ২০২০

আলহাজ¦ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক :রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার বনী ইসরাঈলের জনৈক আবেদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। সেই ব্যক্তি সমস্ত রাত্রি ইবাদতে মশগুল থাকত এবং সকাল হতেই জিহাদের জন্য বের হয়ে যেত ও সারাদিন জিহাদে লিপ্ত থাকত। সে এক হাজার মাস এভাবে কাটিয়ে দিয়েছে। মুসলমানগণ এ কথা শুনে বিসি¥ত হলে আল্লাহ তায়ালা সূরা কদর নাজিল করে এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। এ থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে, শবে কদর উম্মতে মুহাম¥াদীরই বৈশিষ্ট্য। (মাযহারী) শবে কদর এমন এক রজনী যাতে মানব জাতীর হেদায়েতের আলোকবর্তিকা মহাগ্রন্থ কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছে। এ রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ ৮৩ বছরের চেয়েও এর মূল্য অনেক বেশি। এ রজনীতে ফেরেশতাগণ রহমত, বরকত ও কল্যাণ নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। আল্লাহর বান্দারা এ রাতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তি অর্জন করে থাকে।

 সূরা কদরে সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে অল্প সময়ে অধিক কাজ করার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে ব্যাপকহারে ক্ষমা করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে নামাজ আদায় ও ইবাদত বন্দেগী করবে তার অতীতের পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে (বুখারী, মুসলিম)। হযরত আনাস রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, শবে কদরে জিবরাইল (আঃ) একদল ফেরেশতাদের নিয়ে দুনিয়াতে আগমন করেন এবং যে ব্যক্তিকে নামাজ ও যিকিরে মশগুল দেখেন তার জন্য রহমতের দু’আ করেন। যে এই পূণ্যময়ী রাত্রিতে বঞ্চিত রইল, সে সমস্ত মঙ্গল হইতে বঞ্চিত রইল। আর যে অতি হতভাগা সেই কেবল এই রাত্রের ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকে (ইবনে মাজাহ)। হযরত আয়শা সূত্রে বর্ণিত, রমজানের শেষ দশকে বেÑজোড় তারিখে তোমরা শবে কদরকে তালাশ কর। (বুখারী) শবে কদর সম্পর্কে বিভিন্ন মত পাওয়া যায় তবে ২৭ শে রমজান শবে কদর হওয়ার মতটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং অধিকতর সম্ভাবনার। হযরত আয়শা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, লাইলাতুল কদরে আমি কি দুআ করব? তখন নবী (সঃ) বললেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি”। অর্থঃ হে আল্লাহ —- আপনি ক্ষমাশীল।

ক্ষমাকে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (ইবনে মাজাহ) এ রাত্রে দুআয় লিপ্ত হওয়াও বিশেষ ইবাদত। ই’তিকাফ অর্থঃ অবস্থান করা। শরীয়তের পরিভাষায় ই’তিকাফের নিয়তে ২০শে রমজান সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পূর্ব হতে যে দিন ঈদের চাঁদ দেখা যাবে সেই দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লহ তায়ালার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলে। রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া অর্থাৎ পুরো মহল্লার মধ্যে একজন ই’তিকাফ করলেই সকলেই দায়িত্ব মুক্ত হয়ে যাবে। আর কেউই না করলে সকলেই সুন্নাত তরকের জন্য দায়ী হবে। আল্লাহতায়ালা ইবাদতের জন্য মানুষকে বিভিন্ন পন্থা দান করেছেন। নামাজ, রোযা, হজ প্রত্যেকটি ইবাদতের ধরণ আলাদা আলাদা। তেমনি ই’তিকাফও একটি ভিন্নরূপের অসাধারণ ইবাদত। ই’তিকাফের দিনগুলোতে মানুষ জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সাথে আল্লাহর যিকির, তেলাওয়াত, দু’আ ও ইবাদতে মশগুল থেকে আল্লাহর সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং নৈকট্য লাভ করে।  যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ই’তিকাফে থাকে , তার পানাহার , ওঠা-বসা, ঘুম-জাগরণ বরং প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয়।

শবে কদরকে পাওয়া এবং এই মহিমান্বিত রজনীর ফজীলত থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য ই’তিকাফ থেকে উত্তম আর কোনো পন্থা নেই। কারণ আল্লাহতায়ালা কদরের রাতকে নির্দিষ্ট করে দেননি। তাই স্বাভাবিকভাবে মানুষের পক্ষে রাত্রের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে নিয়োজিত থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু মানুষ ই’তিকাফ অবস্থায় যদি রাতে ঘুমিয়েও থাকেন তথাপি তাকে ইবাদতকারীদের মধ্যে শামিল করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে খাঁটি দিলে একদিন ই’তিকাফ করবে, আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামকে তার থেকে  তিন খন্দক দূরে সরিয়ে দিবেন। এক খন্দকের পরিমাণ হলো আসমান জমিনের যে দূরত্ব তার চেয়েও বেশি। (বায়হাকী) হয়রত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ই’তিকাফকারী গোনাহ থেকে মুক্ত থাকে এবং তার জন্য এত বেশি নেকী লেখা হয় যেন সে সব প্রকার নেক কাজ করছে (ইবনে মাজাহ)। ই’তিকাফ করা মানে আল্লাহর কাছে এই আবেদন করা যে, আমি এসে গেছি , আমায় ক্ষমা করে দিন, যতক্ষণ আপনি আমাকে ক্ষমা করছেন না , আমি আপনার দরবার ছাড়ছি না ।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০