রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে পাট

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ১১:২১ পিএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আব্দুল হাই রঞ্জু : বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে গোটা বিশ্বই আজ বিপর্যস্ত। করোনা মহামারির প্রথম আঘাতে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি বিপর্যস্তের মুখে পড়লেও অনেকটা সামলে ওঠার মুহূর্তেই দ্বিতীয় আঘাত সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরো ইউরোপজুড়ে এখন করোনা তান্ডব চলছে। বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, এর আঘাতে আমাদের দেশের রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি ভয়ানক উল্লেখ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, মনে হচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ধাপের প্রভাবে ইউরোপের রফতানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মাঝেও ভরসা দেখা দিয়েছে পাট খাতে। মূলত ক্ষমতাসীনদের পাট বিরোধী নানা পদক্ষেপের কারণে স্বাধীনতা উত্তর পাটশিল্পে ধস নামে। একে একে পাটকল বন্ধ হওয়ায় সোনালী আঁশখ্যাত পাটের সুদিন হারিয়ে যায়। আধুনিকতার কবলে পড়ে বিশ্বজুড়েই পাটপণ্যের বদলে পলিথিন, সিনথেটিকের ব্যবহার বেড়ে যায়। যৌবন হারিয়ে ফেলে পাটের ঐতিহ্য। এখন আবার নতুন করে পাটজাত পণ্যের কদর বিশ্ব জুড়েই বাড়তে শুরু করেছে। মূলত পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন, সিনথেটিকের আগ্রাসন বন্ধে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের কদর বুঝতে শুরু করেছে বিশ্ববাসী। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাটজাত পণ্য ও পাট রফতানিও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে, রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে পোশাক খাতের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাটখাত। চলতি ২০২০-২১ অর্থ বছরের (জুলাই আগস্ট) এই দুই মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। অথচ চলতি বছরের একই সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় করেছে ১৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমেছে। দেখা গেছে, করোনা মহামারির কারণে গত অর্থ বছরের পোশাকখাতসহ অন্যান্য খাতে ধস নামলেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি আয় বরাবরই বেড়েছে। আসলে এমন একদিন ছিল, যখন পাটই ছিল রফতানি আয়ের প্রধান খাত। পাট রফতানির আয়ে চলতো দেশের অর্থনীতি। ছিল পাট চাষের কর্মযজ্ঞ, ছিল পাটচাষীদের সুদিন। পাট ব্যবসাকে ঘিরে গোটা দেশেই ছিল ব্যবসায়িক কর্মচাঞ্চলতা। কৃষি ভিত্তিক দেশে পাটই ছিল প্রধান অর্থকরি ফসল। স্বাধীনতাউত্তর বঙ্গবন্ধু পাটশিল্পকে জাতিয়করণ করে পাট শিল্পের উত্থানে কাজ করলেও দুর্নীতি, লুটপাটের কারণে খুব অল্পদিনের মধ্যেই পাটশিল্পে দুর্দিন নেমে আসে। মূলত ১৯৫২ সালে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের যাত্রা শুরু। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে জুট মিলের সংখ্যা ছিল ৭৫টি। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ২৬ মার্চ এক আদেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ইপিআইডিসি এর মোট ৬৭টি পাটকলের তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) গঠিত হয়। ১৯৮১ সালে এর নিয়ন্ত্রণাধীন মিলের সংখ্যা ছিল ৮২টি। ১৯৮২ সালের পর মোট ৮২টি পাটকলের মধ্যে ৩৫টি পাটকল বিরাষ্ট্রীয়করণ, ৮টি মিলের পুঁজি প্রত্যাহার এবং বনানী নামে মিলটি ময়মনসিংহ পাটকলের সাথে একিভুত করার পর বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন মিল সংখ্যা ৮২টি হতে কমে ৩৮টিতে এসে দাঁড়ায়। ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্ব ব্যাংকের পাটখাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সময়ে মোট ১১টি মিল বন্ধ, বিক্রয় কিম্বা একিভুত হয়। এমনকি বিশ্ব ব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ২০০২ সালে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজি বন্ধ করার পর বিজেএমসি চরম আর্থিক দুরাবস্থার সম্মুখীন হয়। যা ২০০৫ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে এসে পাটের রাজধানী খ্যাত নারায়ণগঞ্জ, খুলনার শিল্পনগরি খালিশপুর সহ পাট কেন্দ্রিক সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এলাকা মৃত পুরিতে পরিণত হয়। বকেয়া পড়ে যায় হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ভাতা। অর্থাৎ পাট শিল্পের অপমৃত্যু ঘটে যায়। স্মরণে আছে, ২০০২ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপসনে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকলকে যখন ধ্বংস করা হয়, তখন তৎকালিন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আদমজি বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ করে ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে যেকোন মূল্যেই হোক পাটশিল্পকে পুনর্জীবিত করা হবে। পাট শিল্পের সুদিন ফিরিয়ে আনা হবে। ঠিকই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ জোট ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকলগুলোর বকেয়া মজুরি এবং বেতন পরিশোধ করেন। পূর্বে বন্ধ ঘোষিত খুলনার খালিশ পুর জুট মিলস লিঃ ও জাতীয় জুট মিলস্ লিঃ ২০১১ সালে নতুন নামে আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু করেন এবং ২০১৩ সালে ৩টি জুট মিলের পুনরোৎপাদনও শুরু করেন। একে একে মিলগুলো চালু হওয়ায় কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হওয়ায় এক নবজাগরণের শুরু হয়। এ ভাবে বন্ধ হওয়া মিলগুলো চালু এবং মামলার কারণে কয়েকটি মিল বন্ধ থাকায় এখন সর্বসাকুল্যে হাতে গোনা ২৫টি পাটকল চালু আছে। দুর্ভাগ্য, শেখ হাসিনা এখনও দেশের প্রধানমন্ত্রী, এরপরও এসব পাটকলকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কেন আজ এ অবস্থা?
বাস্তবতা হচ্ছে, লোকসান। লোকসান দিয়েই কেউই কোন প্রতিষ্ঠান চালাতে চান না। সরকারের ক্ষেত্রেও তাই! সরকারও চায় না বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুণে মিল চালু রাখবে। আমরাও মনে করি, লোকসান দিয়ে মিল চালাতে হবে কেন? কিন্তু বাস্তবে সদিচ্ছা আছে, কিন্তু যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেই, তাহলে লোকসান ঠেকাবেন কি করে? মাথা ব্যথা হলে যেমন ওষুধ সেবন না করে কেউ মাথা কেটে ফেলেন না, তেমনি দুর্নীতি, লুটপাটের কারণে পাটকল বন্ধ না করে বরং এসব বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি মান্ধাত্বা আমলের মিল মেশিনারিজ পরিবর্তন করে আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির মিল মেশিনারিজ সংযোজন করে শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিত করতে পারলে পাটকলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপ দেয়া কঠিন কোন কাজ হবে না। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে কোন ব্যয় বরাদ্দ না দিয়ে আধুনিক যুগের প্রতিযোগী দেশগুলোর উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার অলিক স্বপ্ন থেকে কেন বের হতে পারেন না! সহজ সরল এই সমীকরণটি সরকারে থাকা নেত্রা নেত্রীরা বোঝেন না, এটা কি বিশ্বাস করা যায়? বাস্তব রোগটা হলো, শ্রেণী স্বার্থ। একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর এটাই চরিত্র। যে রাষ্ট্রে গুটিকতক মানুষের স্বার্থে সরকারি প্রতিষ্ঠান নামমাত্র মূল্যে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়। পাটকল, চিনিকলের ক্ষেত্রে এমনটিই হচ্ছে। অথচ স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সরকার আজ ক্ষমতায়। অথচ গোটা বিশ্বেই আজ পাটের সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। পাটের অতিত যৌবন ফিরে আসলে পাট হতে পারে আমাদের সমৃদ্ধির প্রতিক। এ জন্য পাটকলগুলোকে বিরাষ্ট্রীয়করণ না করে চালু করা একান্তভাবে জরুরি। সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
যদিও দুর্নীতি নামক ঘাতক ব্যধির কষাঘাতে দেশের প্রতিটি খাতই কম বেশি আজ আক্রান্ত। মানুষের নৈতিক মুল্যবোধ, চরিত্র, দেশপ্রেম না থাকলে এ রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যে কঠিন, যা স্বীকার করতেই হবে। সুতরাং ভাল সমাজ, দেশ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য সৎ নেতৃত্বের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশে যারা সারা জীবন সৎভাবে রাজনীতি করে নিজের ব্যক্তিত্ব, দেশাত্মবোধকে সমুন্নত রেখেছেন, তারা এ দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে সেভাবে সমাদর কিম্বা মূল্যায়িত হন না। কারণ আমাদের দেশে টাকার মাপকাটিতে নেতৃত্ব বিবেচিত করা হয়। অর্থাৎ এখন রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন, মনোনয়ন পেয়ে আইন প্রণয়নকারী সাংসদ হন, এমন রাজনীতিকের ৬৫ ভাগই ব্যবসায়ী। যারা ব্যবসা করে অঢেল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন এবং যারা জীবনে রাজনীতির চর্চাও করেননি। জনগণের সঙ্গে যাদের কোন আত্মার সম্পর্ক নেই, যাদের জীবনে ত্যাগ বলতে কিছুই নেই। তারা যদি নেতৃত্বে আসেন, তাহলে তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা কতটুকুই বা থাকতে পারে? এমনকি সারাজীবন সরকারি চাকুরি করেছেন। অবসরে গেছেন, ওঁনারা রাতারাতি নেতৃত্বের শীর্ষে চলে আসছেন। ফলে আম গাছে চাইলেই কাঁঠাল পাওয়া যাবে না। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ঠিকই। কিন্তু সৎ নেতৃত্বের প্রতি ক্ষমতাসীনদের আগ্রহ না থাকায়, সত্যিকারের জনকল্যাণে কাজ করা সরকার প্রধানের জন্যও কঠিন হয়ে পড়েছে। সবকিছু মিলেই আমরা মনে করি, সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোন ভাবেই সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে না।
অমিত সম্ভাবনার পাটকলকে পুনর্জীবিত করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে উন্নত প্রযুক্তির আধুনিক মিলে রূপান্তর করে দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ করে পাটশিল্পের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে আমাদের বিশ্বাস। যেহেতু গোটা বিশ্বে পরিবেশ বান্ধব পাটপণ্যের কদর উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেহেতু আমরা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারবো। পাশাপাশি পাটশিল্প বেকারত্ব দুরিকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় অবদান রাখতেও সক্ষম হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮