অপরাধ প্রবণতার কারণ ও প্রতিকার

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৩:৫৯ পিএম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান: অপরাধ: মানবতা বিরোধী বিবেক বর্জিত আইনবিরোধী স্বার্থপরতা কর্মকান্ডকে অপরাধ প্রবণতা বলা যেতে পারে। এটি যখন ব্যক্তি পরিবারে সমাজে রাষ্ট্রে এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অতিমাত্রায় সংগঠিত হতে থাকে, তখন অপরাধ প্রবণতার দৌরাত্ম বলা যেতে পারে। এটি একক কিংবা বিশেষ গোষ্ঠী বা বাহিনী কর্তৃক হতে পারে।অপরাধের কারণ: অপরাধ অনেক ধরনের। তবে সমাজে প্রচলিত অপরাধ সমূহ নি¤œরূপ: লোভ, হিংসা, অহংকার, স্বার্থপরতা তথা অর্থ যৌনাচার, অমিতাচার, অনাচার, ক্ষমতালিপ্সা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ইত্যাদি কারণে অপরাধ সংগঠিত হতে থাকে। এটিও একশ্রেণির মানুষের কারণে সংগঠিত হয়ে থাকে। অপরাধ প্রবণতার আরো বেশকিছু কারণ আছে যেমন: আইনের প্রতি আনুগত্য শ্রদ্ধার অভাব, প্রয়োগে দুর্বলতা এবং সাধারণ জনগণের নিরবতা। অপরাধ মূলত অগণিত। কোনটি ব্যক্তি কেন্দ্রিক, কোনটি সমাজ কেন্দ্রিক, কোনটি রাষ্ট্র কেন্দ্রিক এবং আন্তর্জাতিক কেন্দ্রিক।
চুরি, ডাকাতি, মদ, জুয়া, আত্মহত্যা, খুন-গুম, ধর্ষণ, প্রতারণা, সুদ-ঘুষ, কালোবাজারি অপ্রয়োজনে অস্ত্রোপচার ও ওষুধ প্রয়োগ, ওজনে কম দেয়া, ওষুধে, খাদ্যে-পানীয়সহ মানুষের প্রয়োজনে নিত্য ব্যবহার্য্য উপাদান ও বস্তু সমূহে ভেজাল ও নানা ধরনের ক্যামিক্যাল মিশ্রণ, মিথ্যা কথা বলা ও সাক্ষি দেওয়া, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা, আইন প্রয়োগের শিথিলতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহার, সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অভাব, সামাজিক অবক্ষয়, প্রতিহিংসা, আদর্শগত দ্বন্দ্ব, আস্থাহীনতা, প্রহসন, শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা, প্রতারণা, নৈরাজ্য, অপহরণ, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুক, মাদক, হামলা, মামলা, অবৈধ উপার্জন, যাদুবিদ্যা, বৈষম্য, অপকর্ম, যৌনাচার, ইভটিজিং, বেহায়াপনা, বারবনিতা, চাতুরতা, বাল্যবিবাহ, চাঁদাবাজী, বোমাবাজী, প্রবৃত্তির অনুসরন, নদী দখল, আইনের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ অস্ত্র সংরক্ষণ ও ব্যবহার, ওজনে কম দেওয়া। অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো, উপনামে ডাকা, নশ^রকে অবিনশ^রের দৃষ্টিভঙ্গি, অবৈধ ভূমিদখল, রাজস্বখাতের অর্থ তসরুপ, মানবাধিকার খর্ব করা, পরিবেশ দূষণ, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, কু-শিক্ষা, কুমন্ত্রণা, দুর্নাম ছড়ানো, মিথ্যা কথা বলা, বেআদবি, পরকীয়া, বর্বরতা, মেধার অবমূ-ূল্যায়ন, জ্ঞানীদের কদরহীনতা, বিধ্যাশ্রম, অপচিকিৎসা, এক কথায়  মানব জাতির যাবতীয় অনিষ্টকর ক্ষতিকারক এবং সর্বোপরি মানবতা ও মানবধিকার লঙ্ঘণমূলক কর্মকান্ডকে অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। অপরাধের দৌরাত্মের কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে মানচিত্রের বিভাজন ঘটতে পারে।
অপরাধের প্রতিক্রিয়া : সব ধরনের অপরাধই মানুষের মানসিক শারীরিক জগতে এক বিরাট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে করে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। অপরাধের প্রবণতা ও দৌরাত্মের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেলে অনাকাঙ্খিতভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এতে অর্থ সময় ও মেধার অপচয় ঘটে। হাসপাতালে, কোর্টকাচারিতে, এমনকি জেল খানাতে লোকের সমাগম অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। অপরাধ প্রবণতার বৃদ্ধির ফলে এক শ্রেণীর মানুষ মনুষ্যত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে বিবেক বর্জিত কর্মকান্ড করতে থাকে। আইন শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে নীতি আদর্শ ও ধর্মের বুনিয়াদি শিক্ষাকে উপেক্ষা করে পার্থিব তথা জাগতিক সফলতাকে একমাত্র মিশন হিসেবে বেছে নেয়। এর ফলে সর্বস্তরে অশান্তির আগুনের উত্তাপ বেড়ে গিয়ে নীতি আদর্শ ও মানব সভ্যতার মৃত্যু ঘটায়।
অপরাধ প্রবণতা প্রতিকারের উপায় : অপরাধ এবং অপরাধের কারণগুলো চিহ্নিত করে এগুলো ব্যক্তি পরিবার সমাজ রাষ্ট্র এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে মূলোৎপাটন করতে পারলেই অপরাধ প্রবণতা থেকে উত্তরণ সম্ভব। এছাড়া প্রবণতা দমনে আরো কিছু উপায় রয়েছে যেমন: ১। নিজেকে চেনা ও জানা ও মূল্যায়ন করা। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি মানুষের মূল্য সাড়ে ৪’শ কোটি ডলার। এটির গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝা। ২। মহান সৃষ্টিকর্তাকে চেনা ও জানা। ৩। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ঐশিবাণীর সর্বশেষ কিতাব অধ্যায়ন ও অনুশীলন করা। ৮। তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করা। ৫। ভোগের নয় ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করা। ৬। মানবতা, সৌজন্যবোধ, মমত্ববোধ, আন্তরিকতার গুণাবলি অর্জন করা।
৭। লোভ, হিংসা, অহংকার পরিত্যাগ করা। ৮। অসভ্যতা, কুসঙ্গ, অশ্লীলতা ও নেশা পরিত্যাগ করা। ৯। খওফে ইলাহিয়াত তথা তাক্ওয়ার ভিত্তিতে জীবন-যাপন করা। ১০। আনুষ্ঠানিক উপাসনার সকল শিক্ষাকে বাস্তবতায় রূপান্তর করা। ১১। প্রবীণদের নিকট থেকে জীবন, ইতিহাস থেকে দর্শন বিজ্ঞান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। ১২। পার্থিব সফলতার চেয়ে আখিরাতের সফলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ১৩। বিবেক বর্জিত কর্মকান্ডকে পরিত্যাগ করে মনুষ্যত্ব অর্জন করা। ১৪। কামিলে ইনসানের বুনিয়াদি ইনসানিয়াত বজায় রাখা। ১৫। যাবতীয় শিরক ও বিদায়াতমুক্ত জীবন-যাপন করা। ১৬। ক্ষমতা ও মমতার মহামিলনের মাধ্যমে শাসকদের রাজ্য শাসন করা এবং প্রজাদের মতামতের বিপরীত কাজে জড়িত না হওয়া। ১৭। জাতির দুর্যোগ, দুর্ভোগে অমানবিক পন্থায় মুনাফাখোর না হয়ে সেবার কাজে নিয়োজিত হওয়া। ১৮। চরিত্রের হেফাজত, আমানতদার হওয়া। ১৯। সাহিত্য, দর্শন ও সুস্থ সাংস্কৃতিক সম্প্রসারণ করে অশ্লীল অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ করা। ২০। বিশে^র সর্বস্তরে মানবতা প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওহির বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে নিবেদিত করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৭১৬-২০০৪৭০