বখাটেদের দৌরাত্ম্য মূলোৎপাটন করতে হবে

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ১১:০০ এএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২১

আব্দুল হাই রঞ্জু : ভয়াবহ এক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে সমাজ। যখন সমাজ এগিয়ে যাবে, তখন দেশও সমৃদ্ধ হবে, তখন বখাটেদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে। মহল্লা-পাড়া, বস্তির ছিঁচকে বখাটের সংস্পর্শে ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে, এমনকি স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরাও বখাটেপনায় জড়িয়ে পড়ছে। অবশ্য এসব বখাটেদের বেশির ভাগই মাদকসেবি। আর একজন মাদকাসক্ত সমাজে এমন কোন অপরাধ নেই, যা করতে ন্যুনতম দ্বিধা করে! ফলে তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজী, মাদক বিক্রি, ইভটিজিং, অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এখন মুঠোফোনের সহজলভ্যতা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা সহসাই যোগাযোগ করছে। নানা ধরণের তথ্য ও ছবি আদান প্রদান করছে তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে। ফলে অপরিণত বয়সে ওরা বখে গেছে। ফলে সামান্য ঘটনায় পাড়ায় পাড়ায় মারামারি, এমনকি খুন খারাপি পর্যন্ত ঘটে। এই বয়সের তরুণ, কিশোরদের দ্বারা এমন ভয়ানক ঘটনা ঘটতে পারে, যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর দৈনিক সমকালে প্রকাশিত, গোপীবাগে প্রকাশ্য দিবালোকে বখাটের দায়ের কোপে গোপীবাগ কাজী আরিফ স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী শারমিন প্রাণ হারায়। স্থানীয় জনগণ রক্তমাখা দাসহ বখাটে সোহেলকে আটক করে পুলিশে দেয়। শারমিন স্কুলে যাওয়া আসার পথে বখাটে সোহেলের উত্যক্তের শিকার হয়ে আসছিল। এর কয়েকদিন আগে আর এক ঘটনা ঘটে রাজধানীর শ্যামপুরে উত্ত্যক্তের শিকার এক বোনকে রক্ষা করতে গিয়ে বখাটেদের হাতে প্রাণ হারান ভাই।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বখাটেপনা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। বিশেষ করে এ সমস্যা দূর করতে প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে, পারিবারিক কাউন্সিলিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কেননা পরিবার মানুষের আদি সংগঠন এবং সমাজ জীবনের মূলভিত্তি। ফলে পরিবারকে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। বখাটেদের এ ধরনের দৌরাত্ম্যকে নিছক ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে চান না অপরাধ বিশ্লেষক ড. জিয়া রহমান। তিনি বলেন, স্মরণে রাখতে হবে, এই বয়সী ছেলেমেয়েরা প্রভাবিত হয় সহজে। জীবনের এই সময়টাতে যে ভাবে আপনি ওদের গড়ে তুলবেন, সেভাবেই ওরা গড়ে ওঠবে। আমাদের সমাজের দুর্নীতিপরায়ণতা, লুটপাট, ব্যাভিচারের কারণেও ইতিবাচক নৈতিক শিক্ষা দেয়ার অধিকারও সমাজ হারিয়ে ফেলছে। এসব দেখে সে যা শেখে, তা দেখে সে সেই শিক্ষায় বেড়ে ওঠে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেন, দেশে বখাটেপনার উপদ্রুব বাড়ছেই। তিনি বলেন, যখন দেশে নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা ও সামাজিক ঐতিহ্যের নিয়মকানুন চর্চা না করে বিদেশি উগ্র সংস্কৃতি সমর্থন ও চর্চা করা হয়, তখনই বয়সগত কারণে নিজ দেশের সুস্থ সংস্কৃতির বদলে উগ্র সংস্কৃতির চর্চা করতে গিয়ে বখাটেপনা বাড়ে। বিশেষ করে পরিবারের অভিভাবক বাবা মায়ের ঔদাসিনতা, অতি আদর ও সন্তানদের ওপর উপযুক্ত নজর না রাখার কারণে নিজের আদরের সন্তানটি কখন উবে যায়, তা তারা বলতেই পারে না। এ ঘটনা কম-বেশি অনেক পরিবারেই এখন বিদ্যমান। ফলে স্বপ্নবোনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রিয় মুখটিকে আগলে রাখতে না পারলে, সমাজ যে তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই পাড়ায়, মহল্লায় বখাটেদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বখাটেপনা বন্ধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।
বাস্তবে যে বয়সে পাঠ্যবই হাতে শিক্ষা জীবনে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে যদি তরুণ, কিশোররা বিপথগামী হয়, তাহলে তারা যে বখে যাবে, যা নিয়ে কেউই দ্বিমত করবে না। কারণ কাদাকে যেমন যেভাবে ব্যবহার করে মূর্তি তৈরি করা সম্ভব, তেমনি একজন কোমলমতি তরুণ-তরুণীকে সে ভাবেই শিক্ষা দেয়া সম্ভব। আর যদি এর ব্যত্যয় হয় তাহলে ওরা বখাটে হবেই। আর এরা বিপথগামী হলে ভয়ানকই হবে। কারণ এদের হিতাহিত জ্ঞান কম, ভাল মন্দ বোঝার ক্ষমতাও কম। ফলে এরা এতবেশি খারাপ হবে যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে কোন খারাপ কাজ করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। যে কারণে গোটা দেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলিং যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি প্রতিটি পরিবারকে সর্বাগ্রে বিশেষ দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। পারিবারিক শাসনই প্রকৃত শাসন, যা আমরা পারিবারিক জীবনে দেখে আসছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোন কারণে যদি পরিবারের সন্তানটি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তাহলেই সর্বনাশ! সবকিছুই ওই পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাবে। এ জন্য ছেলে মেয়ে কোথায় যায়, কি করে, স্কুল কলেজ ঠিক মতো যায় কিনা, কোন ছেলে মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করে, সে দিকে তীক্ষ্ম খেয়াল রাখতে হবে। যেহেতু আমরা সমাজের বখাটেদের অপতৎপরতা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছি, সেহেতু ভাবতে হবে, আমার ছেলে মেয়েটিও বিপথগামী হতে পারে। এ জন্য এখন প্রতিটি পরিবারকেই বেশি বেশি করে সন্তানদের প্রতি নজর রাখতে হবে। ওদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে, কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে, বাসায় ফিরতে দেরির কারণ কি? স্মরণে রাখতে হবে, কোমলমতি সন্তান ভুল পথে পা বাড়াতেও পারে! যদি পারিবারিকভাবে প্রথমে তাদেরকে শাসনের মধ্যে রাখা যায়, তাহলে বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। অধিকাংশ সময়ে পরিবারের ঔদাসিনতা, অতি আদরের কারণেও সন্তানরা পথভ্রষ্ট হতে পারে।
সমাজে বখাটেপনা এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে, যা কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করেছে। ওদের অধিকাংশই মাদক গ্রহণ করে। আর এক সঙ্গে ওঠাবসা করলে সঙ্গদোষে মাদকাসক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেক সময়েই নেশার টাকার জন্য ছিনতাই, রাহাজানি কিম্বা খুন পর্যন্ত করে থাকে। অতিসম্প্রতি চাঞ্চল্যকর এক খুনের ঘটনা উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মধ্যেরচর গ্রামের অটোরিক্সা চালক সুজন মিয়াকে হত্যা করে ওবায়দুল, মাসুম, ইসমাইল, শাকিলসহ কয়েকজন বখাটে। এই বখাটেরা চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত করে থাকে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাতে তারা মধ্যচরে একটি মাছের ট্রাকে ডাকাতি করার পরিকল্পনা করে ওঁৎপেতে থাকে। পরিকল্পনা মত মাছের ট্রাকটি ডাকাতি করতে না পেয়ে, তারা ভোরের দিকে একটি অটোরিক্সায় যাত্রি বেশে ওঠে। মধ্যচরের শিমুলকান্দি রাস্তায় পৌঁছিলে তারা অটোরিক্সা চালককে গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ফেলে পালিয়ে যায়। পরে অটোরিক্সাটা বখাটেরা অন্যত্র ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। গত ২ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘটেছে অবিশ্বাস্য এক নির্মম ঘটনা! পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ১২ বছরের শিশুকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গ্রেফতার করে। জানা গেছে, ৩ বছরের শিশু রোহান গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর নিখোঁজ হয়। শিশু রোহানের লাশ পুলিশ উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর হাসপাতালের সেপটিক ট্যাংক থেকে। হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ১২ বছরের এক বখাটে রোহানকে কোলে নিয়ে যাচ্ছে। পরে ওই সিসি ফুটেজের সূত্র ধরে সেপটিক ট্যাংক থেকে শিশু রোহানের লাশ উদ্ধার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, মূলত ভিক্ষাবৃত্তির জন্য শিশু রোহানকে অপহরণ করা হয়েছিল। পুলিশ বলছে, অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে আরো কিছু জানানো যাবে। এটাও ঠিক, তদন্ত ছাড়াতো কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে, দেশে প্রতিদিনই অপহরণ, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী ধর্ষণ থেকে শুরু করে নানা অপকর্ম ঘটেই চলছে। হয়ত আর কোন নতুন ঘটনায় ঢাকা পড়বে শিশু রোহানের খুনের অজানা তথ্য। কিম্বা ততদিনে হয়ত অন্য কোন ঘটনার গর্ভে হারিয়ে যাবে এ ঘটনা। এমনি এক ঘটনা ঘটে, গত ১৪/০১/২১ রাত আড়াইটার দিকে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের সন্নিকটে ছিনতাই করে পালাচ্ছিল কয়েকজন ছিনতাইকারী। সামনে থাকা পিকআপ চালক সাঈদ খোকন মীর তাদের পথ রোধ করে প্রতিবাদ করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় পাশে থাকা অন্যান্য চালকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের ভগ্নিপতি ফারুক হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাগমারা গ্রামের শামসুল হক মীরের ছেলে নিহত সাঈদ। এক মেয়ে ও স্ত্রীসহ যাত্রাবাড়ীর কাজলার নয়ানগরে তিনি থাকতেন। এ প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাযহারুল ইসলাম বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ইতিমধ্যেই জড়িত অপু, মুন্না, জাহিদ, রাসেলসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। আসলে তাৎক্ষণিকভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রস্তুতি ছাড়া প্রতিবাদ করলে মৃত্যু ঝুঁকি থাকাটায় স্বাভাবিক। নিহত সাঈদের আশেপাশে অন্যান্য চালকরা থাকলেও বলতে গেলে তারা সাঈদের মত প্রতিবাদে শরিক হয়নি। ফলে জীবন দিতে হলো প্রতিবাদী পিকআপ চালক সাঈদ খোকন মীরকে (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন তাং ১৪/০১/২০২১ইং)।
বাস্তবে, দেশে বখাটেদের দৌরাত্ম্য ঠেকানোর কোন বিকল্প নেই। কারণ সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের জন্য দেশের সম্ভাবনাময় শিশুদের মেধা, মননকে ভাল কাজে লাগাতে হবে। আর এরা যদি পথ হারিয়ে যায়, তাহলে মেধাভিত্তিক সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ করা আদৌ সম্ভবও হবে না। এ জন্য প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকদেরকে ন্যায় নীতিবোধের চর্চা করতে হবে। কারণ বাবা মায়ের মধ্যে নীতি নৈতিকতা না থাকলে সন্তানদেরকে আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলাও সম্ভব হয় না। এজন্য ভোগবাদি এই সমাজ ব্যবস্থায় ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট মূলত দায়ী। এ দায় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চার  কোন বিকল্প নেই, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮