শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বপ্নের মর্যাদা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:৫৯ এএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২১

আলহাজ্ব হাফেজ মাওঃ মুহাম্মদ আজিজুল হক : কাজি সানাউল্লাহ পানিপথী (রহঃ) বলেন, নিদ্রা কিংবা সংজ্ঞাহীনতার কারণে মানুষের মন যখন দেহের বাহ্যিক ক্রিয়াকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন সে কল্পনাশক্তির পথে কিছু কিছু আকার আকৃতি দেখতে পায়,এরই নাম স্বপ্ন। স্বপ্ন মানব জীবনের খুবই সাধারণ আর অসাধারণ একটি বিষয়। প্রতিটি মানুষই ঘুম-জাগরণে স্বপ্ন দেখে। সবই অমূলক বা ফলহীন নয়। অনেক স্বপ্নই মানুষের জীবন চলাকে কেন্দ্র করে। যেগুলোর ফলাফলও স্বপ্নের মতো করে হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন,নবুওয়াতের ধারা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ‘মুবাশশিরাত’ ছাড়া নবুওয়াতের কোন অংশ বাকি নেই। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন,ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুবাশশিরাত কি? তিনি বললেন, সত্যস্বপ্ন (সহীহ বুখারী)।‘মুবাশশিরাত’ অর্থ সুসংবাদদানকারী জিনিস। সত্যস্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদদাতা হয়ে থাকে,আর এটা নবুওয়াতের একটা অংশ। অপর একটি হাদিস হযরত আনাছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, সত্যস্বপ্ন হলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ (বুখারী,মুসলিম)। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে,মহানবী (সাঃ) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় ঘনিয়ে আসলে প্রথমেই ওহী নাযিল না করে ছয়মাস পর্যন্ত তাঁকে সত্যস্বপ্ন দেখানো হতে থাকে। তারপর তিনি ওহী প্রাপ্ত হন। নবী করীম (সাঃ) নবুওয়াত পাওয়ার পর তেইশ বছর ইহজগতে ছিলেন। আর তেইশ বছরের মধ্যে ছয়মাস সর্বমোট ছেচল্লিশবার হয়ে থাকে। এ দৃষ্টিতে সত্যস্বপ্নকে নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ বলা হয়েছে।  হাদিসে আছে ,তিনি যখনই কোন স্বপ্ন দেখতেন,জাগ্রত হওয়ার পর স্বপ্নে দেখা সেই ঘটনা সত্যিই ঘটে যেত,আর এভাবে তাঁর প্রতিটি স্বপ্ন সত্য হয়ে দেখা দিত। ঠিক ভোরের আলোর মত সত্য। টানা ছয়মাস তাঁকে সত্যস্বপ্ন দেখানো হয়। অবশেষে ওহী নাযিলের ধারা সূচিত হয় (সহীহ বুখারী)।

স্বপ্নের গুরুত্ব এবং ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,অবশ্যই মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সাঃ) কে সত্য এবং বাস্তব স্বপ্ন দেখিয়েছেন (সূরা-ফাতাহ,আয়াত-২৭)। স্বপ্ন তিন প্রকার। যথা- (১) খেয়ালিঃ- মানুষ সারাদিন জাগ্রত অবস্থায় যেসব বিষয় ও ঘটনা প্রত্যক্ষ ও কল্পনা করে,সেগুলোই ঘুমের ঘোরে নানা আকার-আকৃতি নিয়ে দৃষ্টিগোচর হয়। এই স্বপ্নকে খেয়ালি বা মনের সংলাপ বলা হয়। (২) শয়তানিঃ- কোন কোন সময় শয়তান আনন্দদায়ক বা ভয়াবহ উভয় প্রকার দৃশ্য ও ঘটনাবলী মানুষের স্মৃতিতে জাগিয়ে দেয়। এটাকে ‘তাসবীলুশ শয়তান’ তথা শয়তানের বিভ্রান্তিও বলে। বলাবাহুল্য,এ উভয় প্রকার স্বপ্নই ভিত্তিহীন ও অবান্তর। এ গুলোর কোন বাস্তব ব্যাখ্যা হতে পারে না। হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,কেউ যদি অপ্রীতিকর কোন স্বপ্ন দেখে, সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম তিনবার পড়ে। সেই সঙ্গে পার্শ্বও পরিবর্তন করবে। অর্থাৎ যে কাতে ঘুমে স্বপ্ন দেখেছে,জাগার পর তা পরিবর্তন করে অন্য কাতে শোবে (মুসলিম)। অন্যত্র আছে,এ স্বপ্নের কথা অন্য কাউকে বলবে না এবং দু’আ পড়বে (তিরমিজি)। সারকথা,কোন দুঃস্বপ্ন দেখলে ৫টা আমল করতে হবে। তাহলে কোন ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ। (ক) স্বপ্ন দেখে চোখ খোলার সাথে সাথে তিনবার বাম দিকে থুথু ফেলতে হবে। (খ) তিনবার আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম পড়তে হবে। (গ) পার্শ্ব পরিবর্তন করতে হবে। (ঘ) এরূপ দুঃস্বপ্ন কারও নিকট বর্ণনা করা যাবে না। (ঙ) এই দু’আ পড়া,‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরা হাযিহির রু‘ইয়া ওয়া খাইরা মা ফীহা-ওয়া আউযুবিকা মিন শাররি হাযিহির রু’ইয়া,ওয়া শাররি মা ফীহা’। অর্থঃ হে আল্লাহ,আমি তোমার কাছে এই স্বপ্ন এবং এর অন্তর্নিহিত যা কিছু রয়েছে তার মঙ্গল কামনা করছি। আর এই স্বপ্ন ও তার মধ্যকার অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। (৩) রহমানিঃ- এই স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। তা দিয়ে মানুষকে সুসংবাদ অথবা কোন বিষয়ে উৎসাহ বা সতর্ক করা হয়,এটাকে ‘ইলহামি’ স্বপ্নও বলে।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,মুমিন ব্যক্তির স্বপ্ন একটি বিশেষ সংযোগ। এর মাধ্যমে সে তার পালনকর্তার সাথে বাক্যালাপ করার গৌরব অর্জন করে (তাফসীরে মাযহারী)। ভালো স্বপ্ন দেখলে আপনজন এবং হক্কানী আলেম ছাড়া অন্য কাউকে না বলা এবং আল্লাহর শোকর আদায় করা কর্তব্য। নবীজি (সাঃ) বলেন,শেষ রাতের স্বপ্ন হলো সবার সেরা স্বপ্ন (তিরমিজি)। বিখ্যাত স্বপ্নব্যাখ্যাতা মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহ) বলেন,স্বপ্ন যেন আনন্দই দেয়,ধোঁকায় না ফেলে। অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন দেখে শরীয়তের অনুকরণ থেকে গাফেল না হওয়া চাই। পছন্দমত স্বপ্ন দেখলে এবং তা বর্ণনা করতে চাইলে নিকটতম প্রিয়জন অথবা কোন আলেমের নিকট বর্ণনা করা সুন্নাত।   
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০