চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী বাউত উৎসব

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:৫৬ এএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২১

এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল: জাগো - জাগো - জাগো রে, মাছ ধরতে চলোরে ’’- এ রকম সমস্বরে ধ্বনি তুলে মাছ শিকার করা চলনবিলের অপেশাদার ও সৌখিন মাছ শিকারীদের এক সময়ে রেওয়াজ ছিল। মূলতঃ চলনবিলের দেশীয় মাছের প্রাচুর্য্যরে কারণেই বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ শিকার করতে আসা লোকজন জমিয়ে তুলতো মাছ শিকারের সেই সব এলাকা। আর তৎকালীন মাছ শিকারের এই উৎসবই স্থানীয়ভাবে চলনবিলের লোকজনের কাছে পলো বা বাউত উৎসব নামে পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী বাউত বা পলো উৎসব নিয়ে কথা হয়  চলনবিলের লালুয়ামাঝিড়া গ্রামের অবসর প্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক খন্দকার আব্দুল জাব্বার সাহেবের সাথে । তিনি জানান, সুদূর অতীতে চলনবিলে বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পরেই বিশেষ করে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে বা শীতের কোন এক সকালে বিভিন্ন জলাশয়ে দলবদ্ধ হয়ে গ্রাম বা এলাকাবাসী তাদের ছেলে, মেয়েদের নিয়ে মাছ শিকার করতে যেতেন। সেখানে পলো, বেড় জাল, হেসি জাল, তৈর‌্যা জাল, মই জাল সহ বিভিন্ন ধরনের মাছ শিকারের উপকরণ ব্যবহার করা হতো সে সময়ে।

মূলতঃ একটি জলাশয়ে যখন গ্রামের কিংবা এলাকার শত শত লোকজন একই সাথে একই স্থানে মাছ শিকারে নেমে পড়েন তখন জলাশয়ের জল ঘোলা হয়ে যেত। আর এতে করে ওই জলাশয়ে থাকা মাছগুলো জেগে উঠতো। আর তখনই মাছ শিকারীরা মনের আনন্দে মাছ শিকার করে খালৈই বা পাতিল বোঝাই করে বাড়িতে ফিরতো। যা ছিল বাউত বা পলো উৎসবের অন্যতম আনন্দ। এ দিকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনবিল। এ বিলের আয়তন সুদূর অতীতে প্রায় ১ হাজার বর্গ কিলো মিটারের উর্ধ্বে ছিল। সেই সাথে ছিল চলনবিলের দেশীয় মাছের প্রাচুর্য্যরে কারণে নাম ডাক যেমন চলনবিলের কৈ, বোয়াল, সোল, গুজা, চিতল, রুই, কাতলা মাছ সহ অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় চলনবিলে অপরিকল্পিত রাস্তা ঘাট, বিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদীর নাব্যতা হারানোর পাশাপাশি, অপরিকল্পিত বঁাঁধ নির্মাণ, স্লুইচ গেট চালু করা সহ নানা কারণে চলনবিলের আয়তন ক্রমশই কমে আসছে। যা গ্রীষ্মকালে আরো ছোট হয়ে ২০-২৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ৮০’র দশকের পর থেকে চলনবিলের মাছ শিকারের সেই বাউত বা পলো উৎসবের ভাটা পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তাড়াশ উপজেলার হেমনগর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল হামিদ।

 বাউত উৎসবের স্মৃতি মন্থর করে তিনি জানান, তারপরও একুশ শতকের চলনবিলে এ বছর দীর্ঘস্থায়ী ও মাঝারী বন্যার কারণে  সিরাজ-গঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, নাটো-রের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয়গুলোতে স্বল্প পরিসরে এ সময়টাতে বাউত বা পলো উৎসব হয়ে আসছে যা চলনবিলের একটি অন্যতম ঐতিহ্য। তবে বিলকুশা বাড়ী গ্রামের  আফসার আলী এ প্রসঙ্গে আক্ষেপ করে জানান  আগে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় যে রকম শত শত বাউত বা পলো উৎসব হতো তা এখন নেই বললেই চলে। তবু কালেভদ্রে যখন চলনবিলের কোথায় বাউত বা পলো উৎসবে মাছ শিকার হয় তখন প্রযুক্তির কারণে তার দুই একটি ছবি  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। আর তাই তিনি আক্ষেপ করে বলেন, চলনবিলের সেই ঐতিহ্যবাহী বাউত বা পলো উৎসবের জৌলুস আর আগের মত নেই বললেই চলে। অথচ যা আজ থেকে ৪-৫ দশক পূর্বে জৌলসপূর্ণ ছিল যা এখন অতীত।

চলনবিলে বাউত বা পলো উৎসব নিয়ে কথা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞান অনুষদ বিভাগের ডিন ও প্রাণী বিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. নজরুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, মাছ পাওয়া যাক আর না যাক বাউত বা পলো উৎসব চলনবিলের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। তবে বাউত উৎসব বর্তমান সময়ে আগের মত সংখ্যায় বেশী না হলেও তবুও বাউত বা পলো উৎসব চলনবিলের অতীত ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। আর মধ্য চলনবিলে শীত মৌসুমে পানি তেমনটি না থাকলেও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও নাটোরের সিংড়া এলাকায় এখনো বাউত বা পলো উৎসব চোখে পড়ে। তবে চলনবিলের বাউত উৎসবে এখনো অতীত রেওয়াজ মনে করিয়ে দেয়। আর এখন বাউত উৎসবে চলনবিলে মাছ শিকার করা হয়। তখন প্রবীণদের অতীতের স্মৃতির সাথে বাস্তবতায় একত্রিত হয়ে তারা যেন কান পেতে শুনতে পান সেই ধ্বনি - “জাগো - জাগো - জাগো রে, মাছ ধরতে চলোরে ’’।
লেখক ঃ প্রভাষক-কলামিস্ট
০১৭১২-২৩৭৯৩৩