গৃহকর্মিদের সুরক্ষা ও মর্যাদা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:৫১ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২১

অলোক আচার্য :করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সারা বিশে^র ছোট বড় সব শ্রেণিপেশার মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সবাই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গৃহকর্মি বা গৃহশ্রমের সাথে জড়িত মানুষ। জীবিকা নির্বাহের কারণে বা টিকে থাকার জন্য অন্যে বাড়িতে গৃহকর্মির কাজ বেছে নেয় এমন গৃহশ্রমিকের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। পুরুষের মধ্যে শিশু বেশি। তারা কাজ হারিয়েছে এবং দরিদ্র থেকে অতি দরিদ্র হয়েছে। গৃহকর্মিদের অধিকাংশই গ্রাম থেকে শহরে আসে নিজের পরিবারকে একটু ভালো রাখার আশায় বা একটু স্বচ্ছন্দে থাকার আশায়। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সীরা গৃহকর্মি হিসেবে কাজ করে। শত কষ্ট সহ্য করেও তারা টিকে থাকার চেষ্টা করে। তারপরেও প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় গৃহকর্মি নির্যাতনের ভয়ংকর সব খবর প্রকাশিত হয়।

 তাদের সভ্য শিক্ষিত পরিবারে তাদের নির্যাতন সহ্য করতে হয়। তাদের ওপর যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটছে। পত্রিকায় এসব খবর পড়ে ওদের জন্য কষ্ট হয়। কোনো কারণেই গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন করা যেখানে মানবতার চরম বিরোধী কাজ সেখানে অতি তুচ্ছ কারণেও ভয়ংকর নির্যাতন করে। সময়টা সভ্য হলেও আমরা সভ্য হতে পারিনি। যারা অন্যের বাড়িতে স্থায়ীভাবে কাজ করেন তারা অন্যের সংসার সামাল দিয়ে খুব কম সময়ই নিজের সংসারে দিতে পারেন। আবার যারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট কাজ করেন তারাও নিজের জন্য সময় পান সামান্যই। এত পরিশ্রমের পরেও তাদের শ্রমের জন্য কোনো মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কঠোর পরিশ্রম করলেও গৃহকর্মিদের শ্রমের মূল্যায়ন আমরা কোনোদিন করিনি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৫-১৯ সালে মোট ১৯৩ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়। এ সময় ২৩ জন গৃহশ্রমিককে হত্যা, ৩২ জনকে ধর্ষণ, ৮৪ জনকে গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, ৫৪ জন আত্মহত্যা ও রহস্যজনক হত্যার চিত্র পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের এক গবেষণায় বলা হয়েছে দেশে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪৯ জন গৃহশ্রমিক নিহত হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৮ সালে নিহত হয়েছে ১৮ জন, ২০১৭ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ২৭ জন এবং তার আগের বছর নির্যাতনে নিহত হয়েছে ৩৮ জন।

 গৃহশ্রমিকদের এই নির্যাতন বন্ধ করতে হলে তাদের আইনের সুরক্ষায় আনতে হবে। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে গৃহস্থালি কাজের সাথে জড়িত মোট শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ যার মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ নারী। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দেশে দরিদ্র,অশিক্ষিত নারীর একটি অংশ যাদের জন্ম গ্রামে অথবা শহরের দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা কোনো পরিবারে সেসব পরিবার থেকে গৃহকর্মী কাজ বেছে নেয়। তাদের গৃহশ্রমিক হয়ে ওঠার প্রধান কারণই থাকে অর্থ উপার্জন করা। নিজের জীবন টিকিয়ে রাখার সাথে সাথে পরিবারকেও সাহায্য করা। তাদের কাজ পরিবারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা সেই পরিবারই বুঝতে পারে। অথচ তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। গৃহশ্রমিক নির্যাতন বন্ধে ২০১৫ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে আছে কোনো গৃহকর্মিকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে এক মাস আগে তা জানাতে হবে। গৃহকর্মিও যদি চাকরি ছাড়তে চায় তবে নিয়োগকারীকে তা এক মাস আগে জানাতে হবে।

 তাৎক্ষণিকভাবে গৃহকর্মিকে চাকরি থেকে বাদ দিলে এক মাসের মজুরি দেওয়ার বিধান করা রয়েছে। গৃহকর্মি অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে, তবে নিয়োগকারী নিজে তাকে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিতে পারবেন না। এছাড়া কোনো গৃহকর্মি যৌন হয়রানি ও নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করলে সরকারি তা পরিচালনা করবে। গৃহকর্মির কাজের মূল্যায়ন তখন সম্ভব হবে যখন পরিবারে তার অবদানের মূল্যায়ন করা হবে।
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি করলে তার কাজের স্বীকৃতি মেলে না। অথচ সে পরিবারের একজন সহায়তাকারী। পরিবারের সুখে দুঃখে সেও ওতপ্রতোভাবে জড়িত থাকে। অনেক তথাকথিত হাইসোসাইটি, শিক্ষিত পরিবারেই গৃহকর্মির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। যার কোনোটা প্রকাশিত হচ্ছে আবার কিছু অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে। এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হবে। গৃহকর্মিদের শ্রমের মর্যাদা দিতে তাদের নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ, উৎসব ভাতার ব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা ইত্যাদির সঠিক বিধি প্রণয়ন করতে হবে। তাদের শ্রমের স্বীকৃতি দিয়ে এটিকে একটি পেশা হিসেবে গণ্য করতে হবে। গৃহকর্মিদের সামাজিক মর্যাদা বজায় এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।  
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬