বঙ্গবন্ধু বাঙালির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৯:০১ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২১

আব্দুল্লাহ আল রাজী জুয়েল: ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি লাভ করে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে আসেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিত্ব, বন্দিদশা থেকে মুক্তি, মুক্তির পর লন্ডনে গমন, সেখান থেকে দিল্লি হয়ে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একাত্তরের ১ মার্চ থেকে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার প্রতিটিই যথার্থ ছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন এবং অপছন্দ করতেন অনেকের মতো আত্মগোপনে থাকা। তিনি রাজনীতি করতেন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না’(পৃ. ১৩৪)। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণার পরও ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান। যদিও ছাত্র যুবসমাজ স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করতে থাকে।

 বঙ্গবন্ধু যেহেতু নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন, সে জন্য তিনি নানা রকম চাপ থাকা সত্ত্বেও কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি চেয়েছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর কাছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক। শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে না গিয়ে কামান বন্দুক দিয়ে বাঙালিকে দমনের পথ বেছে নেয় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা শুরু করে। ২৫শে মার্চ ১২টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। মুহূর্তের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর এই বার্তা ওয়ারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বত্র পৌছে যায়। সর্বস্তরের জনগণের পাশাপাশি যশোর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে সেনানিবাসের সামরিক বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ওই রাতেই ১.৩০ মিনিটে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ী থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং তিন দিন পর তাকে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের কথা পাকিস্তান সরকার এক সপ্তাহ গোপন রাখে।

 তারপর গ্রেপ্তার করা অবস্থায় করাচিতে তাঁর ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। পাকিস্তান সরকারকে মানুষ ধিক্কার জানায়। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে (যার নামকরণ হয় মুজিবনগর) বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। ওদিকে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে নির্জন কারাগারে বন্দী রাখে। তাঁর নিরাপত্তা ও মুক্তির জন্য জনমত গঠিত হতে থাকে। ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ বন্দিশালায় বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার শুরু হয় এবং সেই প্রহসনমূলক বিচারে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করে মৃত্যুদ  দেয় সামরিক আদালত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী মানুষ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি জানান। তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেয় বহু রাষ্ট্রনেতা। বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারও তাঁর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেয়। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা তাঁর মুক্তির দাবি জানায়। এর মধ্যে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রতি। তাকে বন্দি রাখার অধিকার পাকিস্তানের নেই। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২, পাকিস্তানের নতুন সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেয়। প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজে কারাগারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কথাও তাঁকে জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির কথা রেডিওর সংবাদে শোনার পর বাংলাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে প্রথমে লন্ডন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লন্ডন বিমান বন্দরে  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা দেন। দুই নেতা বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। সেখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, পাকিস্তানের কারাগারের কনডেম সেলে আমি যখন ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন বাংলাদেশের জনগণ আমাকে তাদের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম, যে মানুষ মরতে প্রস্তুত থাকে তাকে কেউ মারতে পারে না”।  

লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধামন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। দিল্লিতে তাঁকে দেওয়া হয় বিপুল সংবর্ধনা। ১০ জানুয়ারি সকালে দিল্লি থেকে বিশেষ বিমানে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল থেকেই তেজগাঁও বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতে থাকে। বিমান বন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ জনতার সামনে অশ্র“সিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। এই দিনের ভাষণও ছিল বাঙালি জাতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। সেদিন বাঙালি জাতি তাঁর সকল অতৃপ্তি ভূলে, পূর্ণতা লাভ করে। বাংলার মানুষ তাঁর প্রিয়নেতাকে কাছে পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সু-সংহত হয়। বঙ্গবন্ধু এদেশের স্থপতি, দেশের স্রষ্টা, এদেশের জাতির পিতা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।  
লেখক ঃ দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৪৫১৭৩৮