আম ও লিচু ফল রক্ষায় করণীয়

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:৫৯ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২১

মোঃ ফরিদুর রহমান : বাংলাদেশের গ্রীষ্ম ও অব-গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়া ফল ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশে ফলের ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে এবং এখানে প্রায় ৭০ রকমের ফলের প্রজাতি জন্মে যার ক্ষুদ্র একটি অংশ বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ হয়। বাংলাদেশ আয়তনে বিশ্বে ৯৪তম হলেও জনসংখ্যায় অষ্টম। সবচেয়ে কম জমি, আর বেশি মানুষের এই দেশ ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে নিত্য নতুন ফল চাষের দিক থেকে ও বাংলাদেশ সফলতা পেয়েছে। বছরে ১০ শতাংশ হারে ফল চাষের জমি বাড়ছে। শুধু ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির দিক থেকে নয়, বাংলাদেশের মানুষের মাথা পিছু ফল খাওয়ার পরিমাণও গত এক যুগে দ্বিগুণ হয়েছে। দৈনিক গড়ে ফল খাওয়া ৫৫ গ্রাম থেকে ৮৫ গ্রামে এসেছে। বর্ষার আগে ও পরে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ ফলগাছের জন্য অপরিহার্য তবে মুকুল আসার অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে লিচু বা আম বাগানে সার প্রয়োগ, চাষ দেওয়া, পানি সেচ দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে।নতুবা গাছে নতুন শাখা-প্রশাখা তৈরি হলে মুকুল আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এই গাছ গুলিতে পুরনো শাখায় ফুল আসে। যেসব শাখা বসন্ত বা গ্রীষ্মে জন্মায়, তাতে পরের বছর মাঘ-ফাল্গুন মাসে ফুল আসে। তবে, ফুল আসার আগে কিছু রোগ পোকার আক্রমণ হলে মুকুল প্রস্ফুটিত হতে পারেনা। এই সময় রোগ পোকার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আমের কীট গুলোর মধ্যে অন্যতম হল শোষক পোকা/হপার, দয়ে পোকা, কা  ছিদ্রকারী পোকা এবং পাতা মোড়ানো পোকা। রোগ গুলির মধ্যে অন্যতম হল অ্যানথ্রাকনোজ, সাদা গুঁড়ো।

 রো গ ধরলে মুকুল বা গুটি ঝরে পড়ে। এর প্রতিকারে মার্বেল অবস্থায় বা মুকুলে থায়োফ্যানেট মিথাইল ৭০% ডব্লুপি ২.৫ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়। কচিপাতা, ফুলের থোকা ও ডালের ডগায় সাদা গুঁড়ো দেখতে পেলে মুকুল আসার আগে ট্রাইডিমর্ফ ৮০% ইসি ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে  ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে স্প্রে করতে হবে। আম গাছে শোষক পোকার সমস্যা সবচেয়ে ব্যাপক। সাদা, সবুজাভ হলুদ বা হাল্কা হলুদ রঙের পোকা গুলি আমের মুকুল আসার পর ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণ করে। শোষক পোকার শুষে নেওয়া রসের (যা পোকার দেহের বাইরে নিষ্ক্রমণ হয়) উপরে ছত্রাকের আক্রমণ হয়। প্রতিকার হিসেব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষ সবচেয়ে জরুরি। মুকুল আসার আগে আশ্বিন-কার্তিক মাসে থায়োক্লোরপ্রিড ২৫% এসসি ১ মিলি বা ইমিডাক্লোপ্রিড ০.৩ মিলি প্রতি লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করতে হবে। মুকুল আসার পর ক্লোথায়ানিডিন ৫০% ডব্লুডিজি ১ গ্রাম প্রতি ১০ লিটার পানিতে বা অ্যাসিফেট ৭৫.৫ ডব্লুপি ০.৭৫ গ্রাম বা থায়োক্লোরপ্রিড ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করতে হবে। সাদা তুলোর মতো দয়ে পোকা মুকুলে ধরতে পারে। এরা থাকলে পিঁপড়ে আসবে। প্রতিকার হিসেবে গাছের চারপাশ পরিষ্কার করতে হবে। বিঘা প্রতি ক্লোরোপাইরিফস পাউডার ৩ সাড়ে ৩ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। পলিথিনের ব্যান্ড গাছের গোড়ায় বেঁধে রাখলে পোকা উপরে উঠতে পারবেনা।

 পোকার আক্রমণ বেশি হলে ডাইক্লোরোভস ৭৬% ইসি ০.৭৫ মিলি বা ডাইমিথোয়েট৩০% ইসি ২ মিলি প্রতি লিটার পানি গুলে স্প্রে করতে হবে। লিচু গাছে যে নতুন শাখা আছে, তাতে মাকড়ের আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। পরিচর্যা না করলে মুকুলের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। আক্রান্ত ডাল-পাতা তুলে পুঁতে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে দিতে হবে। আক্রমণ না হলে ও গরম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিম জাত কৃষি বিষ ১০,০০০ পিপিএম ২-৩ মিলি প্রতি লিটার পানিতে গুলে দু’সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েক বার স্প্রে করতে হবে। আক্রমণ দেখা গেলেই পানিতে গোলা সালফার ডিএফ- ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে ও তার ৫-৭ দিন পর প্রোপারজাইট ২ মিলি বা অ্যাবামেকটিন ২ মিলি প্রতি লিটার পানিতে আঠা মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। অনেক সময় কুয়াশার জন্য আম-লিচুর মুকুলে কালো ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এর জন্য ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি ৫ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করতে হবে,এর সঙ্গে কোনও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়াও ম্যানকোজেব ৭৫.৫ ডব্লুপি, ২-২.৫ গ্রাম পানিতে গুলে স্প্রে করতে হবে। ফুল ভাল আসা বা ফুল, ফল যাতে না ঝরে, সেজন্য আম-লিচু গাছে নাইট্রোবেন্জিন গ্রুপের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে আঠা মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। অনেক সময় গাছের অণু খাদ্যের অভাবে মুকুল ফোটায় অসুবিধা হয়, মুকুল ঝরে পড়ে। এই জন্য অণু খাদ্যের মিশ্রণ গ্রেড ২ থেকে গ্রেড ৫ (২ মিলি) প্রতি লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি সমৃদ্ধ জাতী গঠন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির ম্ধ্যামে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় তাই ফল রক্ষায় যতœবান হওয়া উচিৎ।  
লেখক : উপ-সহকারি কৃষি অফিসার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বগুড়া
০১৭১৭-২১১৭৫৪