চলনবিলে পাখি নিধন, রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:২১ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০২০

আবু জাফর সিদ্দিকী: অতিথি পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চলনবিল। বছরের এ সময়ে তারা চলনবিলে বিচরণ করে। পাখিদের সেই শব্দ, সেই দৃশ্য ভাললাগার মত। তবে এখনো তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠেনি। প্রতিনিয়ত তাদের নিধন করা হচ্ছে, বিক্রি করা হচ্ছে বাজারে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র, ফাঁদ দিয়ে নিধন করা হয় অতিথি পাখিদের। মাঝে মধ্যে প্রশাসন ও পরিবেশকর্মীদের অভিযানে পাখি শিকারিদের আটক করে জেল-জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অবমুক্ত করা হয় পাখিদের। তবুও থেমে নেই এসব পাখি শিকারিদের দৌঁরাত্ম্য। ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইল। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি থাকে। চলনবিলের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন নামে এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল। প্রধান ৩৯টি বিলসহ ৫০টির বেশি বড় বড় বিলের সমন্বয়ে চলনবিল।
‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ বই থেকে জানা যায়, নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; নওগাঁর রানীনগর, আত্রাই; সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া; পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, বেড়া এবং বগুড়ার শেরপুর মিলে বিশাল আয়তনের চলনবিল। এক সময় এর পুরোটাই ছিল বিস্তীর্ণ। ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ তিন অংশে চলনবিল বিভক্ত হয়। বর্তমানে চলনবিলে নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার ৬২টি ইউনিয়ন, আটটি পৌরসভা ও এক হাজার ৬০০টি গ্রাম রয়েছে। পুরো অঞ্চলের লোকসংখ্যা ২০ লাখের বেশি।
প্রতি বছর শীতের শুরুতে অতিথি পাখির কলতানে মুখর হয় চলনবিল। অতিথি পাখির আগমনে চলনবিলের পরিবেশ হয় দৃষ্টিনন্দন। ভোর থেকে বিলে পাখির কোলাহল, কলরব, ডানা মেলে অবাধ বিচরণ, ঝাঁকে ঝাঁকে তাদের ওড়াউড়ি সবার দৃষ্টি কাড়ে। পুরো চলনবিল এখন অতিথি পাখির কলতানে মুখর। দিনের আলোয় চলনবিল জুড়ে দলবদ্ধ অতিথি পাখির বিচরণ মুগ্ধ করবে যে কাউকে।
চলনবিলে ঝাঁকে ঝাঁকে চখাচখি, পানকৌড়ি, বক, হরিয়াল, হারগিলা, রাতচোরা, বালিহাঁস, ইটালী, শর্লি, পেঁয়াজখেকো, ত্রিশূল, বাটুইলা, নারুলিয়া, লালস্বর, কাদাখোঁচা, ফেফি, ডাহুক, গোয়াল, শামুকখোল, হটটিটি, ঘুঘুসহ নানা প্রজাতির পাখি আসতে শুরু করেছে। এ সুযোগে শৌখিন ও পেশাদার পাখি শিকারিরা বন্দুক ও ফাঁদ পেতে দেশী ও অতিথি পাখি শিকার করছেন। এতে এক দিকে যেমন জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, অন্য দিকে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ বাড়ছে ফসলি জমিতে। পেশাদার শিকারিরা পাখি বিক্রি করছেন বাজারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, গুরুদাসপুর, সিংড়া ও আত্রাই উপজেলা সদর থেকে দূরে প্রত্যন্ত এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাখি কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে এই এলাকায় শিকারিদের আনাগোনাও বেশি। এসব এলাকায় প্রশাসনের লোকজন তেমন আসেন না। বাজারে পাখির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই কোনো মতে ধরতে পারলেই বিক্রি করতে সমস্যা হয় না। প্রতি জোড়া পাখি প্রজাতিভেদে ১৫০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বেশি লাভের আশায় অনেকেই দৈনন্দিন কাজ বাদ দিয়ে পাখি শিকার করছেন। সব কিছুরই একটা সৌন্দর্য রয়েছে। তেমনি চলনবিলের সৌন্দর্য জীববৈচিত্র্য। এ জীববৈচিত্র্য ছাড়া চলনবিলের সৌন্দর্য ম্লান। প্রতি বছর শীতের শুরুতে পাখি নিধনের মধ্য দিয়ে চলনবিলের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। চলনবিলের পাখিরা বাঁচতে চায়। আসুন, আমরা সবাই জনসচেতনতা বাড়িয়ে পাখি নিধন বন্ধ করি। চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করি।
লেখক ঃ শিক্ষার্থী, সিংড়া জি এ সরকারি কলেজ, নাটোর
[email protected]
০১৭৬৪-৯৯৩০৯৬