ঠাকুরগাঁওয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সলেমানের ব্যাটারিবিহীন সোলার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২, ০৮:১৮ রাত
আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২, ০৮:১৮ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার মোলানী গ্রামের সলেমান আলী। ছিলেন একজন সামান্য বাইসাইকেল মেকার। মেধা ও শ্রম দিয়ে তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে তৈরি করেছেন ব্যাটারিবিহীন ভ্রাম্যমাণ সোলার পাওয়ার। তার তৈরিকৃত গাড়ির মতো সোলারের এই প্যানেলগুলো খুব সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় এবং সোলার প্যানেল বোর্ডটি সূর্য যেদিকে থাকে সেই দিকে স্বংয়ক্রিয়ভাবে ঘুরতে থাকে। আর এ ভ্রাম্যমাণ সোলার প্যানেলের মাধ্যমে স্বল্প খরচে ক্ষেতখামারে সেচ দিতে পেরে উপকৃত হচ্ছে এলাকার শত শত কৃষক। সলেমান আলীর এমন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্ভাবন এলাকায় ব্যাপক সুনাম ও সাড়া জাগিয়েছে।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে বাইসাইকেলের মেকারি ছেড়ে এলজিইডির কাছ থেকে সৌর বিদ্যুতের ৭৫ ওয়াটের একটি প্যানেল ও ব্যাটারি কিনে গবেষণা শুরু করেন সলেমান আলী। ২০১৪ সালে ব্যাটারিবিহীন ভ্রাম্যমাণ ৩০০ ওয়াটের সোলার পাওয়ার তৈরি করেন তিনি। বর্তমানে তার নিজস্ব ১৫টি ব্যাটারিবিহীন ভ্রাম্যমাণ সোলার পাওয়ার আছে। ২০১৫ সালে মাছের রেনু উৎপাদনের খামার তৈরি করে এই সোলার পাওয়ারের মধ্যমে পানি দেন। এছাড়া এর মাধ্যমে তার নিজস্ব মাছ চাষের বড় বড় ৯টি পুকুর ও আবাদি জমিতে সেচ দিয়ে থাকেন। তাতে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এলাকার চাষিদেরও উপকার করছেন তিনি। সলেমানের ভ্রাম্যমাণ সোলার পাওয়ার দিয়ে স্বল্প খরচে এলাকার ৩টি ফসলি মাঠের ক্ষেতখামারে সেচ দিতে পেরে প্রায় ৩শ’ কৃষক উপকৃত হচ্ছেন।

মোলানী গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, সলেমানের তৈরী ব্যাটারিবিহীন সোলার গাড়ির মাধ্যমে আমি ক্ষেতে সেচ দেই। এই সোলার গাড়ির মতো হওয়ায় ইচ্ছে মতো যেখানে সেখানে নিয়ে যাওয়া যায়। এতে কোন তেল বা বিদ্যুৎ লাগে না। বিদ্যুৎ বা তেল চালিত পাম্প বা মেশিন দিয়ে ক্ষেতে সেচ দিতে এক বিঘা জমিতে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫শ’ টাকা খরচ হয়। আর সোলার পাম্পের মাধ্যমে সেচ দিতে এর অর্ধেক খরচ হয়। একই গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেশি। বিদ্যুৎ ও ঠিক মতো থাকে না। তাই কৃষকরা চাষাবাদ করতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে এলাকার সলেমান আলীর ভ্রাম্যমাণ সোলার পাম্পের মাধ্যমে এলাকার তিন শতাধিক কৃষক উপকৃত হচ্ছে। সোলারের মাধ্যমে সেচ দিতে আমাদের অনেক সাশ্রয় হচ্ছে।

সলেমান এখন সোলার প্যানেল দিয়ে ডিজিটাল ব্রিজ স্কেল, বাড়িতে লাইট, ফ্যান, টিভি এমনকি দিনের সূর্যের আলোয় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ করে নিজে চলাফেরা করার জন্য মোটরবাইক তৈরি করেছেন। এছাড়া তিনি নিজে সোলার প্যানেল দিয়ে ব্যাটারিবিহীন ভ্রাম্যমাণ সোলার পাওয়ার, আইপিএস ও ব্যাটারি তৈরি করে বিক্রয় করে বেশ আয় করছেন। এলাকায় ব্যাটারিবিহীন ভ্রাম্যমাণ সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে ক্ষেতে সেচ দিয়ে বছরে আয় করেন চার লাখ টাকা ও মাছের রেনু উৎপাদান খামার থেকে ৮-১০ লাখ এবং পুকুরের মাছ বিক্রয় করেন ৭-৮ লাখ টাকার বলে জানান সলেমানের ছেলে সোহেল রানা।

সোহেল রানা বলেন, কৃষকরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চালিত পাম্প বা মেশিনের অর্ধেক খরচে সোলার পাম্পের মাধ্যমে সেচ দিতে পেরে ও উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয়সহ অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে তাদের তৈরী সোলার পাওয়ার, আইপিএস ও ব্যাটারি ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

সলেমান আলী বলেন, স্থানীয় বাজারে বাইসাইকেল মেরামত করার কাজ করতাম। নিজের অর্থ সম্পদ বলতে কিছুই ছিল না। একবেলা খাবার জুটলে আরেক বেলা জুটতো না। কিন্তু বর্তমানে আমি সফল ও অনেক ভালো আছি। সলেমান আলী আরও বলেন, ১৯৯৮ সালের দিকে প্রথমে বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য অনেক পরিশ্রম করি ও তাতে সফলও হই। কিন্তু পরে এইদিকে বাতাস বা হাওয়া তেমন না থাকায় সেরকমভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো না। তাই সেটি বাদ দেই। পরে প্রথমে ৭৫ ওয়াটের সোলার প্যানেল নিয়ে গবেষণা শুরু করি কিভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়। একদিন গাড়িতে রংপুরে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের বই বিক্রি করছিল। ওই বইটি আমি ২ টাকা দিয়ে কিনে নেই। আর সেই বই থেকে জানতে পারি যে, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বোর্ডটি সূর্যের দিকে তাক করে রাখলে অনেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তখন বই থেকে ধারণা নিয়ে আমি সেই ভাবে কাজ শুরু করি ও সূর্যের আলোয় শুধু সোলার প্যানেল বোর্ড থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সফল হই। এভাবে ৭৫ থেকে ১ হাজার, ১ হাজার ওয়াট থেকে ৩ হাজার ৩শ’ ওয়াট সোলার প্যানেলের বোর্ড তৈরি করি ২০১৪ সালে। এই সোলার প্যানেল বোর্ডটি এমনভাবে তৈরি করি যে, সূর্য যেদিকে থাকে সেই দিকে স্বংয়ক্রিয়ভাবে ঘুরতে থাকে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আমি মাছের পোনা উৎপাদনে সেচ, পুকুরে সেচ ও ১৫টি ভ্রাম্যমাণ সোলার পাম্পের মাধ্যমে এলাকার ১০০ একর জমির ক্ষেতখামারে সেচ দিয়ে থাকি। তিনি আরও বলেন, এক একর জমিতে ডিজেল চালিত মেশিন দিয়ে তেল খরচ হয় ৫০ লিটার। এখন বিনা তেলে ১৫টি সোলার পাম্প দিয়ে ১শ’ একর জমিতে সেচ প্রদান করে জ্বালানি সাশ্রয় করছেন সলেমান। এমনকি তার বাড়িতে কোন বিদ্যুতের খরচ নেই ও মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন খুলে রেখে তিনি সোলারের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ করে সেই বাইকটি চালান। আস্তে আস্তে আজ এতো দূর এসেছেন তিনি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়