বৃহত্তর রাজনৈতিক মোর্চা গঠনে ব্যস্ত বিএনপি

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২২, ০৫:০০ বিকাল
আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২২, ০৫:০০ বিকাল
আমাদেরকে ফলো করুন

# নেওয়া হচ্ছে মতামত ও প্রস্তাবনা
# আগামী মাসে চূড়ান্ত হতে পারে

রাজকুমার নন্দী : দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের একদফা দাবিতে আন্দোলন ইস্যুতে বৃহত্তর রাজনৈতিক মোর্চা গঠনে কাজ করছে বিএনপি। বাম-ডান-ইসলামীসহ সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে এই মোর্চা গঠনেই এখন মনোযোগ দলটির। এজন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরেও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পৃথকভাবে বৈঠক শুরু করেছে তারা। এসব বৈঠকে ওইসব দলগুলো বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরছেন। প্রত্যেক দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির হাইকমান্ড এসব প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে জোট গঠনের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করবেন। আগামী মাসে এ ব্যাপারটি চূড়ান্ত হতে পারে। 

জানা গেছে, আলোচনায় বেশিরভাগ দলই দাবি আদায়ে জোটের পরিবর্তে যুগপৎ আন্দোলনের পক্ষে মতামত দিয়েছে। কয়েকটি দল জামায়াতের ব্যাপারে আপত্তি জানালেও বিষয়টি চূড়ান্তভাবে বিএনপির ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংকের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দলটিকে আপাতত ছাড়বে না বিএনপি। তবে জামায়াতকে জোটগত নয়, যুগপৎ আন্দোলনে পাশে রাখতে চায় বিএনপি। আর যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াত থাকলে বেশিরভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দলের কোনো আপত্তি থাকবে না বলে তারা মতামত দিয়েছে। এদিকে দাবি আদায়ে ইতোমধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন এখন সবার দাবি। এ ইস্যুতে আমরা বৃহত্তর ঐক্য গড়তে চাই। ইতোমধ্যে অনেক দলের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আনুষ্ঠানিভাবে আমরা শিগগিরই সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করব। সবাইকে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে একটা জায়গায় আসতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার সাথে বৈঠক করেছেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। এর মধ্যে গত রোববার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এলডিপি সভাপতির বাসায় যান। বৈঠকে দুই দলের মধ্যে অতীতের কিছু ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্বের অবসান ঘটে। একইসঙ্গে আগামী দিনে একসঙ্গে পথ চলার বিষয়ে দু’দলের নেতারাই অঙ্গীকার করেন। এর আগে গত শুক্রবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। ড. মোশাররফ হোসেনের বাসায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে আগামী আন্দোলন, নির্বাচন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, সারাদেশে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, প্রশাসনের দলীয়করণসহ বিভিন্ন বিষয়ে এই দুই নেতা আলোচনা করেন। 

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সকল সংগঠন ও ব্যক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ন্যায়ের পক্ষে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এজন্য বড় দল হিসেবে বিএনপিকে ভূমিকা পালন করতে হবে। 

এর আগে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়। দলটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে তারা তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলেছেন। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। গণসংহতি আন্দোলন ছাড়া বাম জোটের অন্যান্য দলগুলোর সাথেও বিএনপির বৈঠক হয়নি। এসব দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তারা তাদের জোটের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিবেন। 

বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, আন্দোলন ও বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে কথা হয়েছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। বিএনপির যেকোনো প্রস্তাবের বিষয়ে আমরা পজিটিভ। সরকারকে বিদায় করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের একদফা দাবিতে আন্দোলনের বিষয়ে আমরাও একমত। 

এছাড়া জেএসডির সাথে বিএনপির নেতাদের যোগাযোগ হলেও বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়নি। একইভাবে গণফোরামের সঙ্গেও বিএনপির যোগাযোগ হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির একাংশের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এসব দলের সাথে বৈঠক করবেন। এসব দলের বাইরে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ ডান-বাম-ইসলামীসহ ২০ দলীয় অন্য শরিক দলগুলোর সাথেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করছে বিএনপি। 

জানা গেছে, বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ দল বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে দাবি আদায়ে যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে বলছেন। বিশেষত বাম ঘরানার দলগুলো এই প্রস্তাবনা তুলে ধরছে। এ দলগুলোর শীর্ষ নেতারা জানান, তাদের বৈঠকগুলো হƒদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈঠকে বিএনপি নেতারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানান। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করাই হচ্ছে এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। 

তারা জানান, তারা কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানোর  জন্য জোট গঠন করতে ইচ্ছুক নয়। ভবিষ্যতে যারাই ক্ষমতায় আসবে তাদেরকে দেশ-জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে। এজন্য বিএনপিকে সুষ্পষ্টভাবে কিছু বিষয়ে ঘোষণা দিতে হবে। এরমধ্যে সংবিধানের কিছু ধারা পরিবর্তন করতে হবে, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, দুদক-নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো বেশি শক্তিশালী করতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয়করণ করা যাবে না। এ রকম আরো বেশকিছু বিষয়ে শর্তারোপ করা হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এসব প্রস্তাবনার সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতারা একমত পোষণ করছেন। এসব বিষয় নিয়ে বিএনপি দলীয় ফোরামে আলোচনার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ দলীয় জোটের বাইরের সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বসবেন বলেও তাদেরকে জানানো হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ওই ফ্রন্টের অধীনেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। এ নিয়ে বিএনপিতে নানা সমালোচনা রয়েছে। এ ঘটনায় ২০ দলীয় জোটও ক্ষুব্ধ। জোট শরিকরা চান, সরকারবিরোধী যে বৃহত্তর রাজনৈতিক মোর্চা গঠনের প্রক্রিয়া চলছে তার নেতৃত্ব এবার বিএনপির হাতেই থাকতে হবে। 

২০ দলীয় জোট শরিক এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের একদফা দাবিতে আন্দোলন ইস্যুতে ডান-বাম-ইসলামীসহ সরকারবিরোধী সব দলকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তবে বিএনপির নেতৃত্বেই এবার সবকিছু হতে হবে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, বিএনপি আর আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না। বিএনপির নেতৃত্বেই এবার সবকিছু হবে।


 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়