এবারের পোড়াদহ মেলায় বাঘাইর না থাকলেও ছিল বিশাল বিশাল অন্যান্য মাছ আর মিষ্টি

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২২, ০৫:০৫ বিকাল
আপডেট: ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২২, ০৫:০৫ বিকাল
আমাদেরকে ফলো করুন

হাফিজা বিনা ও এনামুল হক: বাঘাইর মাছ ছাড়াই এবার বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা অনুষ্ঠিত হলো। নদীর ১শ’ কেজি, ৭০ কেজির বাঘাইর মাছসহ বড় বড় মাছের জন্যই সারাদেশে বিখ্যাত এই মেলা। বনবিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পক্ষ থেকে বিলুপ্তপ্রায় বাঘাইর মাছ বেচা কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর গতকাল পোড়াদহ পমলায় বাঘাইর মাছ আমদানী, প্রদর্শণ ও বিক্রি করতে দেখা যায়নি। তবে মেলায় আগত দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের হতাশ করেননি মাছ ব্যবসায়ীরা। এনেছেন বিশাল বিশাল আকৃতির কাতলা, রুই,  বোয়াল, চিতল, আইড়। এছাড়াও বরাবরের মত দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বড় বড় মাছ আকৃতির মিষ্টি।


বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়িতে প্রতিবছর মাঘমাসের  শেষ বুধবার এ মেলা বসে। প্রায় ৪শ’ বছরের  পুরনো এ মেলা  ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা  ঐ এলাকার কেউই সঠিকভাবে বলতে পারেন না।  প্রতিবছর বড় বড় মাছের জন্য পোড়াদহ মেলা সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মেলা উপলক্ষে মেলার আশেপাশের গ্রামের প্রতিটি বাড়ির জামাই-মেয়ে ও অতিথিদের আপ্যায়নে বড় মাছ কেনার রীতিও বহু পুরনো। রীতি অনুযায়ী  জামাইকে মেলা করার জন্য  শ্বশুরবাড়ির লোকেরা টাকা দেয়। আর জামাইও সেই টাকা  রেখে শ্বশুরবাড়ির জন্য তার সাধ্য অনুযায়ী মেলা থেকে বড় মাছটি  কিনে বাড়ি ফেরেন। মাছ ছাড়াও পোড়াদহ মেলায় প্রচুর আসবাবপত্র, বিভিন্ন সাইজের  বড় মিষ্টি, পোশাক, বাঁশবেতের সামগ্রী, লোহার জিনিসপত্র, মেয়েদের প্রসাধনী সামগ্রী ছাড়াও ব্যাপক পরিমানে পান খাওযার চুন পাওয়া যায়। মেলাকে কেন্দ্র করে  একদিন আগে থেকেই বগুড়াসহ আশেপাশের উপজেলাগুলোতে  সাড়া পড়ে যায়। এদিন মেলা উপলক্ষে  বগুড়ার চাষীবাজারসহ বগুড়ার চেলোপাড়া, বৌবাজার, পাঁচমাইলবাজার, অদ্দিরগোলা বাজার এলাকায় মাছের বিপুল সমাহার দেখা যায় এবং মেলা এলাকার আশেপাশের সাবগ্রামেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। মেলার উৎসব এমনভাবে এলাকাতে প্রভাব ফেলেছে যে ঈদের দাওয়াত না দিলেও মেলাতে আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেয়া একটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে।


এই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দেশের এবং বিদেশের নদী, পুকুর বিলের বিভিন্ন প্রজাতির বাঘাইর, বোয়াল, আইড়, রুই, কাতলা, সিলভারকার্প, পাঙ্গাস মাছ। মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকার মাছ ব্যবসায়ীরা বেশকিছুদিন আগে নদী ও পুকুরের বড় বড় মাছ হেপা করে বেঁধে রাখে।
নওগাঁ জেলার আত্রাই  থেকে মাছ ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম এসেছেন ২৫ লাখ টাকার মাছ নিয়ে। জানালেন প্রতিবছর  বড় বড় বাঘাইর মাছ বিক্রি করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও এবার নিষেধাজ্ঞার জন্য বাঘাইর মাছ আনেননি। তিনি এনেছেন ৭ থেকে ১৬ কেজির কাতলা ৮ থেকে ১২ কেজির রুই, ব্লাক কার্প এনেছেন ২০ কেজির ওজনের। তিনি বললেন এবারের মেলায় ১৫ থেকে ১৬ কেজির এই কাতলা মাছগুলোই সবচেয়ে বড় মাছ। মাছগুরো ৬শ’ থেকে ৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।


শুকুর সাকিদারের মতই উপজেলার মহিষাবান এলাকার আরও একজন মাছ ব্যবসায়ী সাহেব আলী এবং বগুড়ার কলোনী এলাকার মাছ ব্যবসায়ী  লোবানুর। তারা জানান, এবার মেলা উপলক্ষে মাছ উঠিয়েছেন ৫ থেকে ১৬ কেজির কাতলা, ২০ কেজির ব্লাককার্প, ১০ কেজির রুই। তিনি  ছাড়াও প্রায় শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী মাছ বিক্রি করছেন মেলায় আগত দর্শনার্থীদের কাছে। বোয়াল মাছের কেজি ৮শ’, আইড় মাছ ৭শ থেকে ৯শ’, রুই মাছ ৩শ’ থেকে ৮শ’, চিতলমাছ ৮শ, পাঙ্গাস মাছ ২শ’ থেকে ৪শ, ব্লাক কার্প ২শ’ থেকে ৫শ’, সিলভারকার্প ২শ’ থেকে ৩শ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।
এদিকে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের সংক্রমণকে উপেক্ষা করে এবারও মেলায় বিশাল বিশাল মাছ ও মিষ্টির স্টলে মানুষের ভিড় ছিল স্বাভাবিক সময়ের মত।  মহিষাবান এলাকার  মিষ্টি ব্যবসায়ী ও ভাইভাই  মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক আব্দুল লতিফ ও সাজাহানপুরের খোট্টাপাড়া এলাকার মীম মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্তাধিকারী বলেন, তারা প্রতিবছর ১০ তেকে ১৫ কেজি ওজনের  রুই ও কাতলা মাছের আকিৃতি দিয়ে মাছ মিষ্টি বানান। আরও আছে বালিশ, কদম, লাভ মিষ্টি। মেলায় আগত ক্রেতাদের কাছে এসব মিষ্টির ব্যপক চাহিদা। অনেকসময় মেলা শুরুর আগের দিনই বিক্রি হয়ে যায় বেশিরভাগ। দাম ৪শ’।


মেলা উপলক্ষে নন্দীগ্রাম থেকে বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছেন শাশুড়ি, দেবরকে নিয়ে নিপা আক্তার। বললেন মেলা উপলক্ষে  প্রতিটি আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা হয়। এটা এ এলাকার  জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে।
নিরাপত্তার ব্যাপারে  গাবতলী  উপজেলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, মেরা শুরুর আগের দিন থেকেই মেলাটি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী দ্বারা কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল মেলাটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাহী অফিসার রওনাক জাহান বলেন, মেলা এই এলাকার ঐতিহ্য। এলাকার প্রতিটি মানুষ এই একটি দিনের জন্য মুখিয়ে থাকেন। এখানে যেন কোন অনভিপ্রেত ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতকর্তা অবলম্বন করা হয়েছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে।


এবারের পোড়াদহ মেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নব-নির্বাচিত মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, মেলা পরিচালনার জন্য অনুমতি না পাওয়ায় এবারের মেলায় পর্যাপ্ত পরিমান মাছ আসেনি তাই মাছের দাম বেশি ছিল এবং ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরাও প্রতিবছরের চেয়ে কম ছিল। তবে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পোড়াদহ মেলা সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে গতকাল বুধবার বেলা ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত প্রায় ২ঘন্টা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ সালাউদ্দিন আহম্মেদ, গাবতলীর ইউএনও মোছা: রওনক জাহান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমানসহ বিজিবির সদস্যরা পোড়াদহ মেলায় উপস্থিত হয়ে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতাদেরকে দোকান-পাট বন্ধ করে চলে যাওয়ার তাগিদ দেন এবং দর্শনার্থীদেরকেও মেলা ত্যাগ করার ঘোষনা দেন। এ সময় অনেকের মধ্যে আতংকের সৃষ্টি হয়।
এ প্রসঙ্গে ইউএনও মোছা: রওনক জাহান ও মডেল থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, জেলা প্রশাসক মেলা পরিচারনার জন্য কোন অনুমতি দেননি। তাই মেলার দোকান-পাট বন্ধ করে চলে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেনি কেউ। তবে কোথাও কোন অপ্রতিকর ঘটনা ঘটেনি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়