ইসি গঠনে আইন : ভিন্নভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী নেতারা

প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৮, ২০২২, ০৮:৪২ রাত
আপডেট: জানুয়ারী ১৮, ২০২২, ০৮:৪২ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

রাজকুমার নন্দী : রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সোমবার (১৭ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপতির নির্দেশে অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি গঠনের সুযোগ রেখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে খসড়া আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন আইন করেই এবার গঠন হতে যাচ্ছে নতুন ইসি। তবে এই আইনকে ভিন্নভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা। আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও তারা বলছেন, ইসি গঠনে নতুন আইন মূলত পুরনো মদ নতুন বোতলে দেয়ার নামান্তর। যা অতীতের দুইটি সার্চ কমিটি ও ইসিকে বৈধতা দেয়ার জন্য আইনি কাঠামোয় আনার উদ্যোগ। এই আইন মানুষকে ধোঁকা দেয়ার একটা অভিপ্রায়। এই আইনের দ্বারা বিদ্যমান সঙ্কট সমাধানের পরিবর্তে তা আরো ঘনীভূত হতে পারে। 

বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। আইন না থাকায় গেল এক দশকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ২০১২ সালে এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৭ সালে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে সার্চ কমিটির মাধ্যমে সর্বশেষ দুই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছিলেন। 

নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন তৈরির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, তবে হঠাৎ করেই বর্তমান ইসির মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এসে আইন তৈরির উদ্যোগ প্রশ্ন সৃষ্টি করে। আরও প্রশ্ন সৃষ্টি করে যে, আইনের খসড়ায় জাতীয় সংসদকে পাশ কাটানো হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সার্চ কমিটিতে মূলত সেইসব পুরনো পদাধিকারী ব্যক্তিদেরকেই রাখা হয়েছে। অতীতে দুটো সার্চ কমিটির প্রধান ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি। এবারও সেই ধরনের ব্যক্তিদের দিয়েই সার্চ কমিটি করা হতে পারে। অতীতে এ ধরনের সার্চ কমিটি করে আমরা নূরুল হুদা ও রকিব উদ্দিন কমিশন পেয়েছি। এবারও হয়তো সে ধরণের কমিশনই পাব। 

তিনি আরও বলেন, যে আইন করা হচ্ছে তা মূলত অতীতের দুটি সার্চ কমিটি এবং দুটি ইসিকে বৈধতা দেয়ার জন্য, সেটাকেই আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য। আমাদের আশঙ্কা, সেই পুরনো প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ সম্পর্কিত বিরোধের সমাধানের পরিবর্তে আবারও বিষ ফলেরই পুনরাবৃত্তি হবে। আমরা আবারও একটি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন পেতে যাচ্ছি, যা পূর্বসূরিদেরই অনুসরণ করবে। 

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে সরকার পুরনো পথেই হাঁটছে উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক বলেন, নতুন আইন তাই সমস্যা সমাধানের চেয়ে বরং নতুন সঙ্কট তৈরি করতে পারে। 

ইসি নিয়োগে যে আইন হচ্ছে, তার ফলে ‘যে লাউ সেই কদু’ হবে বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ইসি নিয়োগে মন্ত্রিসভায় যে আইনের খসড়া অনুমোদন হয়েছে, তাতে ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’ বা একটি ‘পচা কদু’ হতে যাচ্ছে। ‘অনুগত ও অপদার্থ’ ইসি গঠনের চলমান প্রক্রিয়াকে দলীয় স্বার্থে আইনি রূপ দেওয়ার সরকারি অপপ্রয়াসের ফলাফল হবে ‘যেই লাউ, সেই কদু’। এবার সম্ভবত হতে যাচ্ছে একটি পচা কদু। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে যে আইন হচ্ছে- তা মূলত পুরনো মদ নতুন বোতলে দেয়ার নামান্তর। কারণ, যে সার্চ কমিটি হবে তা মূলত সরকারের লোকজনের দ্বারাই গঠিত হবে। 

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির সংলাপ তো প্রকৃতপক্ষে সংলাপ ছিল না। কারণ, তিনি সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত শুনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সংলাপে তো উভয়ের মতামত থাকতে হয়। যদিও বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সংলাপে যায়নি। তবে সবাই চাচ্ছে, আইনের মাধ্যমে একটি ইসি গঠন করা হোক। সেজন্যই তারা এখন আইন প্রণয়ন করছে। সেই আলোকে একটা সার্চ কমিটি হবে- যারা ইসি নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবেন। সেই মোতাবেক ইসি নিযুক্ত হবেন। তাহলে ঘটনা তো একই থাকলো। সুতরাং এই আইন কার্যত মানুষকে ধোঁকা দেয়ার একটা অভিপ্রায়, এককথায় মূল্যহীন। 

এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, গণতান্ত্রিক দেশ যেমন শ্রীলঙ্কা ও ভারতে সংসদে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধির মতামত নিয়ে ইসি গঠিত হয় অর্থাৎ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। কিন্তু আমাদের এখানে তো জনগণের সরকারই নেই? 

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ইসি গঠনে আইনের বিষয়টি মূলত সরকারের ফোর-টুয়েন্টি বিজনেস। ওরা আইন ছাড়া যা করতে চাইছে, তাই করবে। এখন আইনের একটা কাভারেজ দিল। এটা কোনো কথা হলো- সেখানে কোনো সিভিল সোসাইটির লোক থাকবে না। তারা সব সরকারি আমলাদের নেবে। 

তিনি আরও বলেন, দেশটাতো গোল্লায় গেছে। এটা করে তারা আরেকটা অপরাধ করলো। এমনিতেই আইন না করে নির্বাচন করা তো একটা অপরাধ আছে। এখন ইসি গঠনে আইনি রূপ দিয়ে তাদের বেআইনি কাজকে জায়েজ করা হচ্ছে, এটা আরেকটা অপরাধ। তারা তো সবকিছুতেই নাটক করে যাচ্ছে। যেই ইসি নিয়ে এতো কথাবার্তা হচ্ছে- সেটা গঠন নিয়ে ফের নাটক শুরু করলো। জনগণকে দেখানো হচ্ছে যে, আমরা আইন তো করেছি। 

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দৈনিক করতোয়াকে বলেন, এই আইন সঙ্কট সমাধান করবে না। কারণ, পুরো সঙ্কটটা হলো রাজনৈতিক। তাই সঙ্কটের সমাধানও রাজনৈতিকভাবে হওয়া উচিত। সরকারের উচিত ছিল- বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক মতৈক্য তৈরি করা যে, নির্বাচন কমিশন ও আইনটা কীভাবে হবে? কিন্তু সরকার তো তার পুরনো পথেই হাঁটছে। 

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও উনার পদের যে সম্মান ও নৈতিক ক্ষমতা আছে- সরকারি দলকে উনি রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলতে পারেন। সরকারি দল সোমবার রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তাদেরকে সঙ্কট সমাধানে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছেন বলে জানা যায়নি, যদিও বড় একটা সুযোগ ছিল রাষ্ট্রপতির পক্ষে। 

সাইফুল হক বলেন, যে আইনের কথা বলা হচ্ছে সেটা বাস্তবে সার্চ কমিটিকে তাদের মতো করে একটা আইনি রূপ দেওয়ার তৎপরতা। বিরোধী দলগুলোর কাছে এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। বাস্তবে সঙ্কট যেখানে ছিল সেখানেই থাকছে; যা সামনে আরো ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়