নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে দ্বিমত বিএনপি জোটে

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ১০:২১ পিএম, ১২ জানুয়ারি ২০২২

রাজকুমার নন্দী : নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে বিএনপি। এই ইস্যুতে চলমান আন্দোলনে সমমনা সব রাজনৈতিক দলকেই পাশে চায় তারা। এ লক্ষ্যে দলগুলোর সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনাও চালাচ্ছেন তারা। জানা গেছে, এই ইস্যুতে ঐকমত্য সৃষ্টিতে আগামী মাসে দলগুলোর সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। তবে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে খোদ বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যেই রয়েছে দ্বিমত। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকটি দল কিছুদিন ধরে জাতীয় সরকারের দাবিতে সোচ্চার। এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নাগরিক সমাজের কেউ কেউও ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছেন। 

তবে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না বিএনপি। দলটির শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলছেন, জনদৃষ্টি ভিন্নদিকে ঘোরাতে হয়তো সরকারের মধ্যে কোনও মেশিনারিজ এটা করাচ্ছে, এর সঙ্গে বিএনপি নেই। যারা এটা চাচ্ছেন, তারা মূলত জাতীয় সরকারের অংশীদার হতে চান বলে মনে করেন তারা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানই জাতীয় সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়ায় বিএনপিও একটা পর্যায়ে গিয়ে এই দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে পারে।

বিগত এক-এগার সরকারের আমলে মূলত জাতীয় সরকারের ইস্যুটি আলোচনায় আসে। তবে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় তখন এ আলোচনা অনেকটা চাপা পড়ে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও গত এক বছর ধরে ড. কামাল হোসেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আসম আব্দুর রব, কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, জোনায়েদ সাকি, নূরুল হক নূরসহ তরুণ রাজনীতিকরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ‘জাতীয় সরকার’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছেন। গত ২৭ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করেন জেএসডির সভাপতি আসম আব্দুর রব। 

জাতীয় সরকারের পক্ষের নেতারা বলছেন, দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতিতে ভরে গেছে। তাই শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল বা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি প্রবর্তন হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার বিষয় রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সরকারও সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় না। তাই সার্বিক পরিস্থিতিতে সংকট সমাধানে প্রয়োজন ঐকমত্যের মাধ্যমে সমঝোতাভিত্তিক সরকার। যেটাকে তারা ‘জাতীয় সরকার’ হিসেবে অভিহিত করছেন। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় সরকার গঠিত হলে সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের পাশাপাশি পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বও থাকবে। সেই সরকারে আওয়ামী লীগও থাকতে পারবে, তবে শেখ হাসিনা ওই সরকারের প্রধান হতে পারবেন না। সেই সরকারের মূল কাজ হবে একটি অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। 

‘জাতীয় সরকার’ নিয়ে সক্রিয়দের মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অন্যতম। সম্ভাব্য ঐকমত্যের সরকারে তিনি আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ রাজনৈতিক সমঝোতা চান। দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব রেখে ডা. জাফরুল্লাহ সম্প্রতি বলেছেন, জাতীয় সরকার ছাড়া এখানে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হবে না। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচনকালীন সরকার একটা অনিবার্য বিষয়। কেউ বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কেউ বলছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আবার কেউ বলছে জাতীয় সরকার। আমার মনে হয়, এগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাতীয় সরকার অধিকতর গ্রহণযোগ্য, অধিকতর সহজ হবে প্রতিষ্ঠার জন্য। শাসকগোষ্ঠীর জন্যও এটা কোনো রকম বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করবে না। কারণ তারাও এই জাতীয় সরকারের অংশ হতে পারবেন। তাছাড়া ক্ষমতাসীনরা অনেক কিছু গুলিয়ে ফেলেছেন। সে কারণে জাতীয় সরকার তাদের নিরাপদ প্রস্থানের জন্যও একটা রাস্তা হতে পারে। পাশাপাশি বিরোধী দলের জন্যও ভাল হবে। কারণ, সংবিধানের মধ্যে থেকেই এই সরকার গঠন সম্ভব। তবে সেই সরকারের প্রধান হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাখা যাবে না। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো বিএনপিও একটা সময় গিয়ে জাতীয় সরকারের বিষয়টি মেনে নেবে। যখন দেখবে যে, এই আদলেই সেটা অর্জন হচ্ছে যেটা তারা চাচ্ছে। নামে কিছু আসে-যায় না।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার স্থায়ীভাবে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। এরপর থেকে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়ে পরবর্তী সরকার গঠিত হতে থাকে। তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বিএনপি। দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনে নামে দলটি। অবশ্য পরবর্তীতে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তারা। তবে নির্বাচনের পর থেকেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ফের সোচ্চার হয়েছে বিএনপি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত সোমবার (১০ জানুয়ারি) দৈনিক করতোয়াকে বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা আন্দোলন করছি। আমরা মনে করি, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ছাড়া কখনই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, যেটা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। যদি সময় আসে এবং প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা দেব- যেটা আমরা আগেও দিয়েছিলাম। 

বিএনপি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও জোটের কয়েকটি দল জাতীয় সরকার চাচ্ছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এটা উনাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। প্রত্যেক দলের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে’। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি ও নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতীয় সরকার প্রয়োজন বলে মনে করেন ২০ দলীয় জোট শরিক এলডিপির সভাপতি ড. অলি আহমদ। একই জোটে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ও এলডিপির দাবির ভিন্নতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অলি আহমদ বলেন, প্রতিটি দলের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা-মতামত আছে। অন্য দলের সাথে এর ভিন্নতা থাকতে পারে। এটাকে ‘জোটের মধ্যে অনৈক্য’ বলা যাবে না। 

এদিকে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিএনপির মতো নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় ২০ দলীয় জোটের শরিক দল এনপিপি। দলটির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হলে বর্তমান সরকারকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে কখনই অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আন্দোলন করছে বলে জানান তিনি। 

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দৈনিক করতোয়া বলেন, অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হওয়া উচিত- সেই সরকারের কতকগুলো টার্গেট থাকতে হবে, যেটাকে বলা হয় কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট কনসেপ্ট। নাগরিক ঐক্য ভবিষ্যতে দলগতভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা তুলে ধরবে বলে জানান তিনি।