সফল সিরামিক্স উদ্যোক্তা রেহানা

প্রকাশিত: জানুয়ারী ০৭, ২০২২, ০৮:৫২ রাত
আপডেট: জানুয়ারী ০৭, ২০২২, ০৮:৫২ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

নিজের আলোয় ডেস্ক: শৈশব থেকেই আঁকা-আঁকির প্রতি ছিল তার প্রবল ঝোঁক। সেই ভাললাগা থেকেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন মৃৎশিল্প বিভাগ থেকে। তখন অঙ্কন তার প্রতিদিনের রুটিনে পরিণত হয়। মিশে যায় জীবনের ক্যানভাসের সঙ্গে আঁকা-আঁকি। আর মৃৎশিল্প বিভাগে পড়ার কারণে সব-সময় প্রধানত মাটি দিয়ে তার কাজ করা। তার ওপর চলে তুলির সযতন পরশ। চলে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও।
শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই রেহানা আক্তার মৃৎশিল্পের নানা পণ্য তৈরি শুরু করেন। প্রতিটি পণ্যের পেছনে ছিল আবেগ, ছিল ভালোবাসা, ছিল নতুন কিছু করার ইচ্ছা। সে কারণেই হয়তো তার পণ্য ক্রেতাদের কাছে পছন্দনীয় হতো, সব পণ্যই বিক্রি হয়ে যেত।
এই বিক্রি হয়ে যাওয়া তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করত। এদিকে, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে ‘মিডিয়া বেস্ট অ্যাওয়ার্ড’ তাকে সামনে এগিয়ে যেতে দেয় প্রেরণা, বাড়িয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস।
ফলে, স্নাতকোত্তর পড়া বাদ রেখেই শুরু করেন ব্যবসা। শুরু হয় শিল্পী মনকে শিল্প উদ্যোক্তা হবার প্রচেষ্টা। এ প্রচেষ্টায় প্রথমত পরিবারের কাছে ব্যবসার জন্য টাকা চেয়ে না পেলেও থেমে যাননি। বাসার গ্যারেজে একটি টেবিল ও হাতে চালানো পটার হুইল দিয়ে নিজেই শুরু করেন। ২০০২ সালে এভাবেই শুরু হয় ‘ক্লে ইমেজ’ নামের প্রতিষ্ঠানটির।
বাসার গ্যারেজের পর চলে যান ছাদের টেরাসে। পরবর্তীকালে মিরপুরে সেকশন ১১-তে তিনতলা পারিবারিক বাড়িতে বিস্ক ফায়ারিং টেকনিক ব্যবহার করে চুল্লি তৈরি করেন। শুরু হয় বাণিজ্যিক উৎপাদন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রেহানাকে।
তিনি জানালেন, তিনি অনেক ভাগ্যবান। কেননা ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকেই কয়েকটি বড় কাজ পান। এরপর ১৯ বছরের পথচলায় হাঁটি হাঁটি পা পা করে দেশের প্রান্ত পেরিয়ে তার সিরামিক্স পণ্য চলে গেছে ৩৫টি দেশে।
তবে, কিছু সমস্যারও সম্মুখীন হয়েছিলেন রেহেনা। ছিল না ব্যাংক লোনের সুবিধা। তাই ছিল না পর্যাপ্ত পুঁজি। ছিল গ্যাসের স্বল্পতা। কাজের ক্ষেত্রে কাউকে দেখে শেখার বা সামনে এগিয়ে যাবার মতো পথপ্রদর্শকও সেভাবে কেউ ছিলেন না। ফলে, তাকে অনেক ফ্যাক্টরি ঘুরতে হয়েছে। কীভাবে মেশিন বানাতে হয়, তা শিখতে হয়েছে। তাকে নিজে নিজে কারিগরি কাজও শিখতে হয়েছে।
মিরপুরে সেকশন ১১, ব্লক সি-তে তিনতলা বাড়িতে এখন তার বেশ বড় কর্মযজ্ঞ। ৭০ জনের বেশি কর্মী কাজ করে যাচ্ছে সেখানে।  তৈরি হচ্ছে টি-সেট, ডিনার-সেট, মগ, মোমবাতি দানি, ওয়াল টাইলস; যা কিনা হাতে অলঙ্কার করা।  
তার সিরামিক্স পণ্য ফ্যাক্টরিতে তৈরি সিরামিক্স পণ্য থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। কেননা প্রতিটি পণ্যের অলঙ্করণ বা ছবি শিল্পীদের হাতে করা। এই শিল্পীদের প্রশিক্ষণ রেহানা আক্তার নিজেই দিয়ে থাকেন।
এ বিষয়ে রেহানা আক্তার বলেন, প্রথম থেকেই আমরা ইচ্ছা ছিল হাতে তৈরি কিছু করব এবং অনেকগুলো হাত কাজ করবে। বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। এ দেশের মানুষদেরকে কাজে লাগাব, তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব।
রেহেনা আক্তার ইতোমধ্যেই এসএমই খাতের উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সবার নজর কেড়েছেন। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি থেকে পেয়েছেন ‘উইমেন এন্ট্রপেনর প্রগ্রেসিভ অ্যাওয়ার্ড’। ২০২০ সালে অর্জন করেছেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ‘জাতীয় এসএমই পুরস্কার’। ৫ ডিসেম্বর, ২০২১ থেকে ঢাকার আগারগাঁও এ শুরু হওয়া নবম জাতীয় এসএমই এক্সপোতে ব্র্যাক ব্যাংকের উদ্যোক্তা হিসেবে অংশ নিচ্ছেন তিনি।
এই উদ্যোমী নারী উদ্যোক্তার সন্ধান পায় ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই টিম। তার ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রয়োজনে ব্র্যাক ব্যাংক কোনো জামানত ছাড়াই দ্রুততম সময়ে লোন প্রদান করে। এখন বড় পরিসরে ফ্যাক্টরি স্থাপনের চিন্তা করছেন রেহেনা
রেহানা আক্তার জানালেন তার ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা; তিনি বললেন, আমার ছোট কারখানাকে বড় কারখানায় রূপান্তর করব। সেখানে অনেক মানুষ কাজ করবে। তারা মেশিনের মতো পারদর্শিতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে কাজ করবে। তবে, প্রতিটি কাজে থাকবে শিল্পীর সৃজনশীলতার ছোঁয়া, হাতের কোমল পরশ।
তিনি আরও জানালেন, একজন এসএমই উদ্যোক্তা হিসেবে যতটুকু সফলতা অর্জন করেছি তার পেছনে সবচেয়ে বেশি যাদের অবদান আছে ও যাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই, তাঁরা হলেন আমাদের দেশের আস্থাভাজন ক্রেতারা। তাঁদের কাজ থেকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাই। সব-সময় আমার পথচলার সাথী হয়ে আছেন তাঁরা।
রেহেনা আশা করেন, মৃৎশিল্প থেকে যারা পাস করছেন তারা যেন একটা প্ল্যাটফর্ম পান, যাতে তার মতো তারাও নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে পারেন। পূরণ করতে পারেন তাদের স্বপ্ন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়