দলে শৃঙ্খলা রক্ষায় হার্ডলাইনে বিএনপি

প্রকাশিত: জানুয়ারী ০৩, ২০২২, ০৮:৩৯ রাত
আপডেট: জানুয়ারী ০৩, ২০২২, ০৮:৩৯ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

# উপদেষ্টাপরিষদ থেকে তৈমুরকে প্রত্যাহার 
# কর্মসূচি বাস্তবায়নে অবহেলায় কঠোর ব্যবস্থা

রাজকুমার নন্দী : চলমান আন্দোলন সফলে দলে শৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। হাইকমান্ড মনে করছে, আন্দোলন সফল হতে হলে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সব পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। বিশৃঙ্খলভাবে কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুশৃঙ্খল বিএনপি। তাই কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে দলে শৃঙ্খলা রক্ষায় গত এক সপ্তাহের মধ্যে দুই হেভিওয়েট নেতাকে পদ থেকে অব্যাহতি ও প্রত্যাহার করেছে বিএনপি। তারা হলেন-খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য তৈমুর আলম খন্দকার। এছাড়া বিভিন্ন সময় দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত বছর কুমিল্লার মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও সাবেক সাংসদ শফি আহমেদ চৌধুরীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর আগে দলের প্রভাবশালী দুই ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদকে শোকজ করা হয়। এছাড়া ২০১৯ সালে সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আবুল কালামকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। 

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার এবং বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে দলের চলমান আন্দোলনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতাদের কর্মকান্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে হাইকমান্ড। কর্মসূচি পালনে কোনো গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে দল। কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের দলের এমন কঠোর মনোভাবের বিষয়টি ইতোমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

উপদেষ্টাপরিষদ থেকে তৈমুরকে প্রত্যাহার : দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ায় অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ তার থেকেই যাচ্ছে। সোমবার (০৩ ডিসেম্বর) বিকেলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, তৈমুর আলম খন্দকারকে বিষয়টি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এক লাইনের ওই চিঠিতে বলা হয় ‘মাননীয় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যের পদ থেকে আপনাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’ তবে তৈমুরের কাছে পাঠানো চিঠিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো কারণ দেখানো হয়নি। তৈমুর আলম নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বেও ছিলেন। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর দল পরিচালনা অব্যাহত রাখতে গত ২৬ ডিসেম্বর জেলায় তার জায়গায় নতুন ‘ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক’ নিয়োগ দেয় বিএনপি। নির্বাচনকালীন সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য মনিরুল ইসলাম রবিকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সংসদসহ স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনেই অংশ না নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করছে না বিএনপি। এমন অবস্থায় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভাইস চেয়ারম্যানের পদমর্যাদাসম্পন্ন চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টা যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তাহলে সারাদেশের নেতা-কর্মীদের কাছে ভুল মেসেজ যায়। সংগঠনে শৃঙ্খলা ফেরাতে তখন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় থাকে না। 

পদচ্যুত হয়ে তৈমুর বললেন, আলহামদুলিল্লাহ : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাপরিষদের পদ থেকে পদচ্যুত হওয়ার বিষয়ে তৈমুর আলম খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে দল থেকে এখনও আমাকে কিছু জানায়নি। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে, আলহামদুলিল্লাহ। আমি মনে করি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটা সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আমাকে জনগণের জন্য মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন আমি রিকশাওয়ালা-ঠেলাগাড়িওয়ালাদের তৈমুর। রিকশাওয়ালা-ঠেলাগাড়িওয়ালাদের কাছে ফিরে যাব। আমি জনমানুষের তৈমুর গণমানুষের কাছে ফিরে যাব। তিনি আরও বলেন, আমি হকার, হোটেল শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের সংগঠন করি। এ সংগঠনগুলো সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি আমি পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নেব। তৈমুর বলেন, ২০১১ সালে দল আমাকে নমিনেশন দিয়েছিল। সেবার দল সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমি নির্বাচন থেকে পাঁচ ঘণ্টা আগে সরে গেছি। আমি আজ পর্যন্ত আমার দলকে প্রশ্ন করিনি- কেন আমাকে সরিয়ে দেওয়া হলো, কেন প্রত্যাহার করা হলো?

নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অব্যাহতি : নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পাশাপাশি খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলে ‘এক নেতার এক পদ’ বাস্তবায়নে গত ৯ ডিসেম্বর মঞ্জুকে বাদ দিয়ে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এরপর দলের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সংবাদ সম্মেলন করায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত ২৬ ডিসেম্বর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকেও নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অব্যাহতি দেয় বিএনপি। এদিকে দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ মঞ্জুকে অব্যাহতির প্রতিবাদে খুলনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় ৬শ’ নেতা-কর্মী ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। সিদ্ধান্ত বদলানো না হলে আরও বহু নেতা-কর্মী পদত্যাগ করবেন বলে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও সংগঠনে শৃঙ্খলা রক্ষায় সিদ্ধান্তে অটল হাইকমান্ড। 

এছাড়া দলীয় কর্মসূচিতে সন্তোষজনক অংশগ্রহণ না করার অভিযোগে গত অক্টোবরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সাক্কুর বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ- বিএনপির টিকিটে কুসিক মেয়র নির্বাচিত হয়েও তিনি দলের কোনো কর্মকান্ডে অংশ নেন না। চরম দুঃসময়েও দল তাকে কাছে পায়নি। এমনকি খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা সংক্রান্ত আন্দোলনেও তিনি একেবারেই নীরব। 

এর আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দলের প্রভাবশালী দুই ভাইস-চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদকে শোকজ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দলের নাম ব্যবহারের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্ত করে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগ আনা হয়। তবে শোকজের জবাবে হাইকমান্ড সন্তুষ্ট হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে শেষপর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি দল। অবশ্য তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে হাইকমান্ড। 

এদিকে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সিলেট-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় গত বছরের জুনে শফি আহমেদ চৌধুরীকে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শফি আহমেদ ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে সিলেট-৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। 

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল দল। তবে কেউ শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ড করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান দলের গঠনতন্ত্রেই আছে। কেউ গঠনতন্ত্রবিরোধী কাজ করলে দল অতীতে ব্যবস্থা নিয়েছে, বর্তমানে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে। 


 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়