ই-কমার্সের মাধ্যমে হুইলচেয়ারে বন্দী নারীর জীবনও সফলতায় ভরে উঠছে

Online Desk Aminul Online Desk Aminul
প্রকাশিত: ০৬:৫১ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০২১

নিজের আলোয় ডেস্ক: ঘুমভাঙা থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মহুয়া বন্দি হুইলচেয়ারে। পুরো নাম জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া। দাঁড়াতেও পারেন না একা। দৈনন্দিন কাজগুলো করে দেন মা সাহেরা খানম। তার জীবনটাই এখন বন্দী হুইল চেয়ারে। তবে হুইলচেয়ারে বসেই বুনছেন নিজের স্বপ্ন। মহুয়া জামায় সুঁই-সুতা দিয়ে নকশা করেন। কারিগরদের কাজ বুঝিয়ে দেন। মাত্র দুই মাসেই ঘরে বসে অনলাইনে দেশীয় পণ্য দিয়ে তৈরি করা থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাক বানিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন। বর্তমানে ৩০ জন কারিগর দিয়ে তৈরি করাচ্ছেন পণ্য।
পাবনার মেয়ে মহুয়ার বাবা মারা গেছেন ২০১৯ সালে। বাবা, দুই ভাই আর মায়ের সহায়তায় মহুয়া হুইলচেয়ারে বসেই ইংরেজিতে মাস্টার্স করছেন। অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমেই তার তৈরি পণ্য লন্ডন, ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত করানোর স্বপ্ন দেখছেন।
কাকলী রাসেল তালুকদার। দুই বছর বয়সের সন্তানের কথা চিন্তা করে চাকরি ছেড়ে দেন। তবে যে কোনো প্রয়োজনে স্বামীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেওয়ার বিষয়টিও ঠিক মানতে পারছিলেন না। সাত বছর ধরে জামদানি শাড়ি নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এক বছর ধরে জামদানি নিয়েই অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন কাকলী। সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকার জামদানিও বিক্রি করেছেন ঘরে বসেই। করোনাভাইরাসের বিস্তারের মধ্যেও ঈদে ছয় লাখ টাকার জামদানি বিক্রি করেছেন। আর বছর হিসাবে তা ১৪ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ভাইয়ের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন এই উদ্যোক্তা। একবিংশ শতাব্দীর নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে নারীরা সমাজে মর্যাদার স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে সর্বদা সচেষ্ট। তবে এজন্য নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে, হতে হবে আত্মনির্ভরশীল। আর স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের অনেক নারী আজ তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সৃজনশীল কর্মের সর্বোত্তম প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
অনেক নারীই এখন নিজে কিছু করার প্রেরণা থেকে কখনো এককভাবে, কখনো দলবদ্ধ হয়ে ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে অনলাইন ব্যবসা করছেন, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুগোপযোগী এবং বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে।
এমনই এক অনলাইন প্ল্যাটফরম ‘উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)’-এর সঙ্গে যুক্ত মহুয়া, জান্নাতুল মুক্তা ও কাকলী রাসেল। এটি এখন দেশের নারী উদ্যোক্তাদের সর্ববৃহৎ অনলাইন ই-কমার্স প্ল্যাটফরম। ২০১৭ সালের অক্টোবরে যাত্রা শুরু করা এ ফোরাম দেশের ৬৪ জেলার ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের অন্যতম ভরসার প্ল্যাটফরম। অনলাইন প্ল্যাটফরমটিতে দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছেন এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। এছাড়া প্ল্যাটফরমটিতে দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
অনলাইনে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পণ্য বিক্রির কৌশল শেখানোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্ল্যাটফরমটিতে ৮০ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা। ‘উই’তে সদস্য হিসেবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্রেতাও আছেন।
করোনাভাইরাস বিস্তারের পর গত কয়েক মাসে ব্যবসা করে ‘লাখপতি’ হওয়া উদ্যোক্তাদের একটি তালিকা করেছে উই। তালিকায় প্রায় ১০০ জন নারী উদ্যোক্তা আছেন। দিন দিন এ তালিকা বড়ো হচ্ছে। লাখপতির খেতাব পাওয়া প্রথম নামটাই কাকলী রাসেল তালুকদারের। কাকলী বর্তমানে উইতে অন্য নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
উইয়ের প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার (নিশা) বলেন, ‘উই দেশীয় পণ্যের একটি প্ল্যাটফরম। বিভিন্ন অঞ্চলের বিখ্যাত জিনিস বা যে পণ্যগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, সেসব পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়েই ব্যবসা করছেন নারী উদ্যোক্তারা। একটা সময় ফেসবুক শুধুই একটা যোগাযোগমাধ্যম ছিল, যেখানে অনেক পুরোনো বন্ধু খুঁজে পাওয়া যেত। দেশের বাইরের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা হতো। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্যোক্তাদের জন্য। ফেসবুকের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা পণ্য কেনাবেচা করতে পারছেন, যাকে আমরা এফ-কমার্স নামে জানি। এটি দেশীয় পণ্যের একমাত্র জায়গা, যেখানে আমরা হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তাকে একত্র করতে পেরেছি। তারা তাদের পণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে নেটওয়ার্কিং, নানা বিষয়ে কর্মশালা ও ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ পর্যন্ত করতে পারছেন। এই একটিমাত্র প্ল্যাটফরমে থেকে অনেকেই তাদের হতাশা কাটিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও করছেন।’