জনস্বার্থ ইস্যুতে সিরিজ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে বিএনপি

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ১০:১৬ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

# ‘দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি’

রাজকুমার নন্দী : জনস্বার্থ ইস্যুতে মাঠে নেমেছে বিএনপি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সিরিজ কর্মসূচি পালন করছে দলটি। গত শনিবার থেকে রাজধানীতে সপ্তাহব্যাপী এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। দল এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ১০ লক্ষ লিফলেট ছাপানো হয়েছে। শিগগিরই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এই লিফলেট বিতরণ করা হবে। ইতোমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় দফতর থেকে সারাদেশের জেলা কার্যালয়ে এই লিফলেট পাঠানো শুরু হয়েছে। 

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, করোনা মহামারি, ঘূর্ণিঝড় আর বন্যার প্রভাবে এমনিতেই মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। এমন অবস্থায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন দেশে লকডাউন থাকায় অসংখ্য মানুষের আয়-রোজগার বলতে গেলে একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে যায় শ্রমজীবী নিম্নআয়ের মানুষ। বেসরকারি হিসেবে প্রায় চার কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেছেন। সম্প্রতি দেশের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি ব্যবসা-বাণিজ্য। এই অবস্থায় দেশে দেখা দিয়েছে দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি। প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। চাল, ডাল, তেল, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, তরকারিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি জনজীবনের গতিকে প্রায় অচল ও আড়ষ্ট করে তুলেছে। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ ও ক্ষোভ। 

দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এমতাবস্থায় আর বসে থাকার সময় নেই। দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য এই মুহূর্তেই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামা উচিত। বিএনপি যেহেতু জনবান্ধব রাজনৈতিক দল, তাই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে সরকারি সিন্ডিকেটই দায়ী বলে মনে করছে বিএনপি।

সিরিজ কর্মসূচি : নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে ঢাকায় সিরিজ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে শনিবার (২৩ অক্টোবর) এবং উত্তর বিএনপির উদ্যোগে রোববার (২৪ অক্টোবর) মানববন্ধনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সোমবার (২৫ অক্টোবর) জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) স্বেচ্ছাসেবক দল, ২৮ অক্টোবর শ্রমিক দল, ৩০ অক্টোবর যুবদল এবং ৩১ অক্টোবর ছাত্রদলের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। 

এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে লিফলেট ছাপানো হয়েছে। লিফলেটে বলা হয়েছে- আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে আগুন লেগেছে। জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠলেও সরকার সম্পূর্ণ নির্বিকার। বরং গণবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নেই তারা ব্যস্ত। নিত্যপণ্যের চরম ঊর্ধ্বগতিতে হতদরিদ্র থেকে শুরু করে মধ্যম আয়ের মানুষ আজ পিষ্ট হচ্ছে। ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে চালের বাজার যেন পাগলা ঘোড়া। সবচেয়ে কম দামের চালও এখন ৫২ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। আর সরু চাল ৭০ টাকার ওপরে। সরকারি সংস্থা টিসিবির মতে, ২০২০ সালের তুলনায় চালের দাম এক বছরে বেড়েছে গড়ে ৩১ শতাংশ। চালের দাম এখন এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। এছাড়া লিফলেটে গত এক বছর কিংবা এক থেকে চার মাসের ব্যবধানে সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, এলপিজি গ্যাস, মসুর ডাল, আটা, ডিম, গরুর মাংস, চিনি, সার, পানি, বিদ্যুৎ, সুতা ও রংয়ের মূল্য বৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। 

এতে বলা হয়েছে, সয়াবিন তেলের মূল্য প্রায় প্রতি মাসেই বৃদ্ধি করছে এই সরকার। গত চার মাসে গড়ে বাড়ানো হয়েছে ৫৬.২৫ শতাংশ। সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর প্রতি লিটারে ৭ টাকা বাড়িয়ে ১৫৩ টাকার সয়াবিন এখন একলাফে ১৬০ টাকা। পেঁয়াজের মূল্যের ঝাঁজে মানুষের এখন কান্নার দশা। দেশে এক মাসের ব্যবধানে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬০ শতাংশ আর দেশি পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৩ শতাংশ। এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে দিশাহারা জনগণের জীবন। এলপিজি গ্যাসের দাম তিন মাস আগে ছিল ৮৫৯ টাকা। দুই মাসে দুইবার দাম বাড়ানো হয়েছে। সবশেষ গত ১০ অক্টোবর দাম বাড়ানোয় ১২ কেজির সিলিন্ডার এখন বিক্রি হচ্ছে ১২৫৯ টাকা। এছাড়াও মসুর ডাল, ডিম, গরুর মাংস, চিনি, আটার দাম বেড়েছে। বেশিরভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। পাঁচটির বেশি সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে। সরকার নিজেকে ‘কৃষিবান্ধব’ হিসেবে দাবি করলেও আসলে তারা কৃষকের রক্ত চুষে নিচ্ছে। এমতাবস্থায় নিত্যপণ্যের সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি-লুটপাট, বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও একদলীয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনপি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে। 

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই লুটপাটে ব্যস্ত। সে কারণে নিত্যপণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। কিন্তু সরকারের সেদিকে খেয়াল নেই। জনস্বার্থ তাদের কাছে উপেক্ষিত। সঙ্গতকারণেই মানুষের পক্ষে জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। শনিবার থেকে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দলের পক্ষ থেকে সারাদেশে লিফলেটও বিতরণ করা হবে। 

এদিকে শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির মানববন্ধনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সরকার চাল-তেল-চিনি-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অথচ তাদের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তারা নিজেরা লুটপাট-দুর্নীতি করছে, পয়সা বানাচ্ছে। আমাদের স্পষ্ট দাবি, চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে। 

জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ২নং সহ-সভাপতি আনু মোহাম্মদ শামীম আজাদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সরকারের মদদে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। তারই প্রতিবাদে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।