ডা. জাফরুল্লাহকে এড়িয়ে চলতে চায় বিএনপি

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ০৮:৫৪ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

# নেতাকর্মীদের মৌখিক নির্দেশনা
# নাগরিক সমাজের বক্তব্য এটা ভুল সিদ্ধান্ত

রাজকুমার নন্দী : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির রাজনীতির পরামর্শক ও সমালোচক হিসেবে পরিচিত। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপির করণীয় নিয়ে নানা সময় দলটিকে বিভিন্ন পরামর্শও দিয়ে থাকেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির রাজনীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে একের পর এক সমালোচনা ও মন্তব্যের কারণে তাকে এড়িয়ে চলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এ প্রসঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীদের মৌখিকভাবে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিএনপির কোনো নেতাই মুখ খুলছেন না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্প্রতি বিএনপির আন্দোলন, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন তাতে দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ ও বিব্রত। বিএনপির হাইকমান্ডও নাখোশ। গত জুনে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ছাত্রদলের তোপের মুখে পড়েন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ওই অনুষ্ঠানে বিএনপিপন্থী এই পেশাজীবীকে এক প্রকার হুমকিই দেন ছাত্রদলের একজন সহ-সভাপতি। দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে দেয়া ডা. জাফরুল্লাহ’র বক্তব্য কার্যত ফ্যাসিবাদকে উৎসাহিত করছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এড়িয়ে চললে বিএনপিরই ক্ষতি হবে। কারণ, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী ২০১৯ সালে এক অনুষ্ঠানে বিএনপিকে বর্তমান বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে ফেরাতে তারেক রহমানকে কমপক্ষে দু’বছর রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে এই সময় লন্ডনে বসে দুই বছর মাস্টার্স বা এমফিলে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেন তিনি। একই বছর অন্য এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিএনপির নেতারা লন্ডনের ওহি’র দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারেক রহমানকে বলব, লন্ডনে বসে ‘ওহি’ পাঠাবেন না। স্কাইপের মাধ্যমে দল পরিচালনা করবেন না। এভাবে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। ২০২০ সালে এক অনুষ্ঠানে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘যদি বিএনপি সত্যি চায় ক্ষমতার পটপরিবর্তন হোক, তাহলে বিএনপির দায়িত্ব অনেক বেশি এখানে। তারেকের স্তুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারবে না কোনোদিন। আপনারা যদি সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায় আসতে চান, জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে চান, মাঠে আসতে হলে আমার মতে, জাইমা রহমানকে (তারেক রহমানের মেয়ে) সঙ্গে নিয়ে নামতে পারেন। তারেককে নিয়ে নয়। জাইমা আসলে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যাবে, যে আন্দোলনের জোয়ার শুরু হবে তাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি তার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছে বলে টের পাবেন।’ গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় জাফরুল্লাহ বলেন, ‘বিএনপির গঠনতন্ত্র মেনে তারেক রহমানকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। গঠনতন্ত্রে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বলে কোনো পদ নেই।’ 

এদিকে ডা. জাফরুল্লাহ’র এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ৬ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ডা. জাফরুল্লাহ সাহেবের বয়স হয়ে গেছে। তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও জ্ঞানী-গুণী লোক। কিন্তু বয়স হয়ে গেলে মানুষ কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলতেই পারেন।’ তিনি ডা. জাফরুল্লাহকে উল্টা-পাল্টা বক্তব্য না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমানে তারেক রহমান দলের সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। পুরো দল তারেক রহমানের নির্দেশনায় কাজ করছে।

এরপর বিএনপি মহাসচিবকে ইঙ্গিত করে গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বেচারা বাড়ির চাকর-বাকরের মতো আছে। ভাবছে চাকরি চলে যাবে। তার বক্তব্যে আমার হাসি পেয়েছে। আমার বক্তব্যে তিনি মনোক্ষুন্ন হয়েছেন। এসব রাজনৈতিক কর্মীদের চাকর-বাকরের গুণাবলীও নেই। তাদের না কব্জিতে জোর আছে, না মাথা ঘুরাবার অধিকার আছে।’

বিএনপির শীর্ষ কয়েকজন নেতা আলাপকালে জানান, ডা. জাফরুল্লাহ বিএনপিকে নিয়ে বার বার কথা বলায় তারা কিছুটা বিব্রত। ফলে তাকে এড়িয়ে চলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপিমনা বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ডা. জাফরুল্লাহকে কোনো প্রোগ্রামে অতিথি করা যাবে না। এমনকি তিনি কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকলে সেখানেও যাওয়া যাবে না। যার একটি প্রমাণ ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট শরিক জাগপার এক মানববন্ধনে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুইজন নেতার অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রধান অতিথি থাকায় বিএনপির ওই দুই নেতা সঙ্গত কারণেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি বলে জানা গেছে।

বিএনপিমনা একটি সামাজিক সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা জানান, আগামীতে কোনো অনুষ্ঠানে ডা. জাফরুল্লাহকে অতিথি না করতে কিছুদিন আগে বিএনপি থেকে তাকে মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরের দায়িত্বে থাকা সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তো বিএনপি করেন না। তিনি বিভিন্ন সময় বিএনপি ও দলের নেতৃত্ব নিয়ে যেসব বক্তব্য রাখেন তাতে বর্তমান ফ্যাসিবাদকে আরও উৎসাহিত করা হয়। একইসঙ্গে বিএনপিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও করা হয়। যা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাজ নয়। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি হচ্ছে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মূল শক্তি।

এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত এই মুখপাত্র বলেন, আমরা তো তাকে কখনো কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাই না। এমনকি অঙ্গসংগঠনের ব্যানারেও তাকে আমন্ত্রণ করা হয় না। অনেক আগে দুই-একবার এসেছেন তিনি।

জানতে চাইলে ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, শুনেছি যে- বিএনপি তাদের নেতাকর্মীদের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এড়িয়ে চলা বা বয়কট করার মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বিএনপিরই ক্ষতি হবে। কারণ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এই সরকারকে বিদায় করতে হলে সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশের এখন অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি। তার মতো ব্যক্তিদের বয়কট করে বিএনপি একাই আন্দোলন করলে তা কতটুকু সফল হবে- সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান।

তিনি আরও বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলেন। অথচ বিএনপি নেতৃবৃন্দ তার কথাগুলোকে বুঝার চেষ্টা করেন না।