প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই ছাত্রদলের নতুন কমিটি

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ০৯:৩০ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১

# ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হচ্ছে মেয়াদ
# শেষ মুহূর্তে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করায় গুরুত্ব

রাজকুমার নন্দী : আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলেছে আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ‘নির্বাচিত’ বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ। তবে এখনো আংশিক কমিটি দিয়েই চলছে সংগঠনটি। জানা গেছে, এতোদিন তৃণমূল পুনর্গঠন নিয়ে ব্যক্ত থাকা শীর্ষ নেতৃত্ব মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এসে আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে জোরেসোরে কাজ করছেন। মেয়াদের মধ্যেই প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় ফোরামে জমা দেয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তারা। একইসঙ্গে দফতরে জমা থাকা জেলার পদমর্যাদাসম্পন্ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার ৮টি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আহ্বায়ক কমিটিও এই সময়ের মধ্যে ঘোষণা করা হতে পারে। এদিকে দীর্ঘদিনেও আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় পদপ্রত্যাশীদের মাঝে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। সাংগঠনিক পরিচয়বিহীন থাকায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।

অন্যদিকে যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো ছাত্রদলের বর্তমান ‘নির্বাচিত’ আংশিক কমিটির মেয়াদও বাড়ানো হবে নাকি নির্ধারিত সময় শেষে তা ভেঙে দেয়া হবে-এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো আলোচনা নেই। আর ভেঙে দেয়া হলে সেক্ষেত্রে নতুন কমিটি ‘ইলেকশন না সিলেকশনে’ গঠিত হবে- সে বিষয়টিও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি গঠনে ভূমিকা রেখে আসা সাবেক ছাত্রনেতারাও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না। 

তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, আগামী ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই সংগঠনটির নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হতে পারে। আর সেই কমিটি হবে হাইকমান্ড মনোনীত। সেখানে থাকবে না ‘তথাকথিত’ সিন্ডিকেটের প্রভাব। সম্প্রতি গঠিত ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি থেকে তেমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠিত হতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান গত ২ বছর ধরে ছাত্রদলকে নিয়ে সরাসরি কাজ করছেন। কেন্দ্রীয় সুপার ফাইভের পাশাপাশি দশটি সাংগঠনিক টিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর নেতাদের নিয়ে উনি কাজ করেছেন। অর্থাৎ প্রায় ১০০ জন নেতা সম্পর্কে উনি খুব ভালভাবে জানেন-চেনেন। এদেরকে দিয়ে উনি সারাদেশের সাংগঠনিক কাজও করিয়ে নিয়েছেন। তাই এদের মধ্যে কার কতটুকু সততা, রাজনৈতিক যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা আছে- তা তিনি সুস্পষ্টভাবে জানেন। অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে গত ২ বছর উনি ছাত্রদলকেই সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন। সুতরাং আহ্বায়ক কমিটি গঠনে উনার বাইরের কারোর কোনো পরামর্শ লাগবে না। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সে হিসেবে নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে বর্তমান সভাপতি (ফজলুর রহমান খোকন) ছাড়া বাকি সবাই প্রার্থী।

দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিলের তিন মাস পর ওই বছরের ডিসেম্বরে সংগঠনটির ৬০ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর আরও ৪১ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি দলীয় ফোরামে জমা দেয় সংগঠনটি। কিন্তু পরবর্তীতে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

সূত্রমতে, ছাত্রদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর সারাদেশের থানা-পৌর-কলেজ শাখার কমিটি গঠন তথা তৃণমূলে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ১০টি বিভাগীয় সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। 

ছাত্রদলের দফতর সূত্রে জানা গেছে, এসব টিমের তত্ত্বাবধানে সারাদেশের থানা পদমর্যাদার ১৭০০টির মতো ইউনিটের (থানা-পৌর-কলেজ) মধ্যে ইতোমধ্যে ১৫০০টি শাখায় আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। এছাড়া ২৯টি ইউনিট কমিটি বর্তমানে সংগঠনটির দফতরে জমা রয়েছে। আর ৪২টি ইউনিটে কর্মিসভা হলেও টিম লিডাররা এখনো কমিটি জমা দেননি। ১০টি সাংগঠনিক টিমের মধ্যে ইতোমধ্যে রংপুর, বরিশাল ও সিলেট বিভাগীয় টিমের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর ময়মনসিংহ ও রাজশাহী সাংগঠনিক বিভাগীয় টিমের কাজও প্রায় সম্পন্ন। বাকি টিমগুলোর কাজও শেষের পথে। 

তবে ইউনিট কমিটি গঠনে কয়েকটি টিমের বিরুদ্ধে বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সে কারণে কেন্দ্র থেকে বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কয়েকটি টিম প্রধানদেরও পরিবর্তন করা হয়।

অন্যদিকে সারাদেশে জেলা পদমর্যাদার ১৪২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে। আর ২৩টির মতো ইউনিটে আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৬, ’১৭ ও ’১৮ সালে জেলায় আংশিক কমিটি গঠিত হয়েছিল। জেলা কমিটির মেয়াদ ১ বছর হওয়ায় সব কমিটিই এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। এদিকে রাজবাড়ী, মাদারীপুর ও কুষ্টিয়া জেলায় বর্তমানে কোনো কমিটি নেই। এই তিন জেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ চলছে। 

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের অভিযোগ, অধিকাংশ জেলার আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির চরম অনীহা দেখা গেছে। কেন্দ্র থেকে বার বার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও কাজ হয় না। আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা ভেঙে দিয়ে সেখানে নতুন কমিটি গঠন করা হতে পারে-এমন শঙ্কায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে অনীহা তাদের।

জানা গেছে, মেয়াদের শেষ দিকে এসে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করায় মনোনিবেশ করেছেন। এ নিয়ে তারা এখন জোরেসোরে কাজ করছেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটির আকার হবে ২০১ কিংবা ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট। পাশাপাশি দফতরে জমা থাকা জেলার পদমর্যাদাসম্পন্ন ঢাকার ৮টি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি নিয়েও কাজ করছেন। কমিটিগুলো হলো-জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও বাংলা কলেজ। বেশ আগেই ঢাকা বিভাগীয় (ক) টিমের পক্ষ থেকে এসব শাখার প্রস্তাবিত আহ্বায়ক কমিটি কেন্দ্রে জমা দেয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুপার ইউনিটখ্যাত এসব কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।  

জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দীর্ঘ ২০ বছরের জঞ্জাল সরাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। তৃণমূল পুনর্গঠন প্রায় সম্পন্ন হওয়ায় আমরা বর্তমানে কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা এবং ঢাকার বড় ৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি নিয়ে কাজ করছি। আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেগুলো দিতে পারব। 

সংগঠনের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সারাদেশে থানা পদমর্যাদার ১৭০০টি ইউনিটের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০০টি ইউনিটে কমিটি গঠিত হয়েছে। এটা রেকর্ড সংখ্যক কমিটি। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের সার্বিক দিক-নির্দেশনায় এবং টিম, জেলাসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছে। তবে কিছু ইউনিটে সামান্য সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমন্বিত উদ্যোগে সমাধান করা হবে। 

নতুন কমিটি প্রসঙ্গে খোকন-শ্যামল বলেন, কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাকেই আমরা স্বাগত জানাই।