খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায়ই চ্যালেঞ্জ বিএনপির

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ০৯:০০ পিএম, ৩১ আগষ্ট ২০২১

# ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বুধবার

রাজকুমার নন্দী : দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে তারা। কারণ, দলটির দুই শীর্ষ নেতার একজন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে রাজনীতিতে অনুপস্থিত। তাছাড়া শারীরিকভাবেও অসুস্থ তিনি। আর অন্যজন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে। আর দলটির সারাদেশের নেতা-কর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত। চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান তারেক রহমান। সে হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর ধরে সপরিবারে লন্ডনে অবস্থান করছেন তিনি। এরই মধ্যে কয়েকটি মামলায় তার সাজা হয়েছে। অন্যদিকে নেতাদের দাবি, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক কারামুক্ত হলেও কার্যত তিনি গৃহবন্দি। 

তবে বিএনপির দাবি, সরকারি মামলা-হামলা ও নানা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। সংগঠন পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তারা। এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবে বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দলটি গঠন করেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা এবং দলের ঐক্য ধরে রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ২০২৩ সালে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় করাই বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, তারা সঠিক পথেই রয়েছে। একদিকে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে সংগঠনকে শক্তিশালী করে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করছে, অন্যদিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করে জনসম্পৃক্ত আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। তবে শেষপর্যন্ত সবাইকে এক ছাতার নিচে আনা সম্ভব না হলে অভিন্ন ইস্যুতে স্ব স্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে যুৎপদ আন্দোলনের ওপর গুরুত্ব দেবে বিএনপি। 

দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। তবে নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে তাদের। এরপর ঘুরে দাঁড়াতে দল পুনর্গঠনের কাজে মনোযোগ দেয় বিএনপির হাইকমান্ড। তবে দলের সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। 

বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু গত বছর থেকে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ায় সেই উদ্যোগে ভাটা পড়ে। করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি; মহানগর উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম ছাত্রদল এবং মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদলের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একইভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে পুনর্গঠন করা হবে। এর মধ্যে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের নতুন কমিটি যেকোনো সময়ে ঘোষণা করা হতে পারে। 

বিএনপির নেতারা বলছেন, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। আর সেজন্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের পাশাপাশি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনও দরকার। তাই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি রূপরেখা দেবে বিএনপি। এ লক্ষ্যে কাজ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এর অংশ হিসেবে দলের পক্ষ থেকে একটি ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করা হয়েছে। সেই মোতাবেক দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে যথাসময়ে সেই রূপরেখা প্রকাশ করবে বিএনপি। এরপর সেই রূপরেখার স্বপক্ষে জনমত গড়ে তুলবেন তারা। 

জানা গেছে, দাবি না মানলে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামবে বিএনপি। এরপর ধারাবাহিক কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকবে তারা। তারপর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনকে ঘিরে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা রয়েছে হাইকমান্ডের। 

এদিকে আন্দোলনের পাশাপাশি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিএনপি। সে লক্ষ্যে কিছু কর্মপরিকল্পনাও ঠিক করেছেন তারা। এর অংশ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য আবেদনকারী প্রার্থীদের এখন থেকেই মাঠে চায় হাইকমান্ড। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় দফতর থেকে সম্প্রতি তাদেরকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, করোনায় জনগণের পাশে দাঁড়াতে। কর্মীদের নিয়ে মাঠে থেকে কাজ করতে। এছাড়া ২০২৩ সালের নির্বাচন নিরপেক্ষ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনও আদায়ের চেষ্টা করছে বিএনপি। তাই কূটনৈতিক তদবিরের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন দায়িত্বশীলরা। বিশেষ করে পাশর্^বর্তী দেশ ভারত এবং পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে যোগাযোগ জোরালো করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। 

জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, গত ১২ বছরে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ, নির্যাতন-নিপীড়ন এবং জনগণের কথা বলতে গিয়ে আজকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারগারে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে। দলের ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১ লাখের বেশি মামলা। তবে সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বিএনপি টিকে আছে। এখানেই আমাদের স্বার্থকতা। 

দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সরকার নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। এটা আমাদের রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আমার আহ্বান থাকবে, নেতাকর্মীরা ঐক্য ধরে রাখবে। যেকোনো নির্দেশনা সামনের সারিতে থেকে পালন করবে। 

এদিকে ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) এক বাণীতে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশের জনগণকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি : দলের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুইদিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিএনপি। বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টায় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন, বেলা ১১টায় শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, দুপুর ১২টায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় ড্যাবের সহযোগিতায় হেলথ ক্যাম্প এবং করোনা রোগীদের জন্য ওষুধ ও করোনা সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হবে। 

এছাড়া বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। 

দলের সব জেলা, মহানগর ও থানা ইউনিটেও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে। 

এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইতোমধ্যে পোস্টার প্রকাশ করেছে বিএনপি। এছাড়া বুধবার বিভিন্ন সংবাদপত্রে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে।