স্বেচ্ছাসেবক দলে ‘সিন্ডিকেটমুক্ত’ নতুন কমিটির তোড়জোড়

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ৩০ আগষ্ট ২০২১

রাজকুমার নন্দী : গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভবিষ্যৎ আন্দোলনকে সামনে রেখে মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের মেয়াদোত্তীর্ণ আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে শিগগির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে এমন আলোচনা এখন সর্বত্র। আর কমিটি আহ্বায়ক কিংবা আংশিক যেকোনো ফরমেটেই হতে পারে। জানা গেছে, নতুন কমিটিতে প্রাধান্য পাবেন ছাত্রদলের সাবেক নেতারা। তবে কমিটি গঠনে এবার থাকবে না ‘তথাকথিত’ সিন্ডিকেটের প্রভাব। সম্প্রতি গঠিত ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি থেকে তেমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা ক্লিন ইমেজের যোগ্য ও ত্যাগী নেতা যাদের কর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে তারাই এগিয়ে থাকবেন। 

আরও জানা গেছে, কিছুদিন ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কার্যক্রমে গতি আনতে ত্যাগী ও যোগ্যদের হাতেই নেতৃত্বভার তুলে দিতে চান তিনি। ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষে জোরালোভাবে শুরু হবে এই কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পরদিন ২ সেপ্টেম্বর তৃণমূল পুনর্গঠনে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক দলের ১২টি সাংগঠনিক টিমের প্রধানদের সাথে বৈঠকে বসছে বিএনপির হাইকমান্ড। সেই বৈঠকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে অক্টোবর মাসের প্রথমদিকে ঘোষণা করা হতে পারে স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি। 

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি ও আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর গত বছরের ২৮ জুলাই বাবু করোনায় মৃত্যুবরণ করলে সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। অবশ্য নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে ব্যর্থ হয় স্বেচ্ছাসেবক দল। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত বছরের মার্চ ও আগস্টে দুই দফায় ৩৪১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ খসড়া কমিটি দলীয় ফোরামে জমা দেয় সংগঠনটি। পরবর্তীতে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দফায় স্বেচ্ছাসেবক দলের ১৮৬ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন করে বিএনপি। তবে কমিটি গঠনে যোগ্য-ত্যাগীদের বাদ দেয়ার অভিযোগ ওঠে। 

পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, কমিটিতে আন্দোলন-সংগ্রাম ও দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির বাইরে থাকা এমন অন্তত ৮০-৮৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা আসলে সংগঠনের শীর্ষ এক নেতার বন্ধু-বান্ধব। তাদের আরও অভিযোগ, নিষ্ক্রিয়দের দিয়ে কমিটি গঠন করায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সংগঠনে। সে কারণে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মসূচিতে কমিটির সর্বোচ্চ পঞ্চাশ জনের বেশি নেতাকে পাওয়া যায় না। এমনকি স্বেচ্ছসেবক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতেও ছিল না তেমন উপস্থিতি। ২৯ জন সহ-সভাপতির মধ্যে মাত্র ৫-৭ জন উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে তৃণমূলে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দলের ১২টি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। স্বেচ্ছাসেবক দল সূত্রে জানা গেছে, এসব টিমের তত্ত্বাবধানে সারাদেশের ৯৪০টি ইউনিটের (উপজেলা-থানা-পৌর) মধ্যে ইতোমধ্যে ৪২০টির বেশি শাখায় আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। এছাড়া সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দফতরে ৫০টির মতো কমিটি জমা রয়েছে। আর দেড়শ’টির মতো ইউনিটে কর্মিসভা হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এখনও কমিটি জমা দেননি। 

স্বেচ্ছাসেবক দলের সারাদেশে ৮১টি সাংগঠনিক জেলার প্রায় সবক’টিতেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ১২/১৩টিতে রয়েছে আহ্বায়ক কমিটি। একমাত্র কক্সবাজারে আংশিক কমিটি রয়েছে, তবে সেটার কার্যক্রম অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে এসব কমিটি গঠিত হওয়ায় বেশিরভাগই এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। 

স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা জানান, মোস্তাফিজুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হওয়ার পর থেকেই কমিটি গঠনের কার্যক্রমে গতি আসে। তার আন্তরিকতা-সদিচ্ছা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে বিগত ৫/৬ মাসের মধ্যেই ৩০টির মতো জেলার আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। একইসঙ্গে টিম প্রধানরা ইউনিট কমিটি দফতরে জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলোও দ্রুত আলোর মুখ দেখছে। মোস্তাফিজুরের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করতে যাতে দ্রুতই সারাদেশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় সেটাই স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির লক্ষ্য।

জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেউ কেউ বর্তমান আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার পক্ষে। তাদের যুক্তি, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও অনেকে বিশেষ করে ছাত্রদলের সাবেক নেতারা এখনো পদ-পদবি পাননি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে পদায়নের মধ্য দিয়ে তাদের অনেকের কাজের মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক পরিচয় নিশ্চিত হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথকে সুন্দর করবে। তবে কারও কারও মতে, কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি প্রায় দুই বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করলে আরও সময়ক্ষেপণ হবে। তার চেয়ে নতুন কমিটি হলে সেটা সংগঠনের জন্য ইতিবাচক হবে। এতে করে সংগঠনে ‘প্রাণ’ আসবে। নেতাকর্মীদের মধ্যেও চাঙ্গাভাব তৈরি হবে। 

তবে স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদপ্রত্যাশী নেতা-কর্মীদের আশা, তাদের সাংগঠনিক পরিচয় নিশ্চিতে বর্তমান আংশিক কমিটি অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও পূর্ণাঙ্গ করা হবে। এরপর তা বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।

জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আমরা স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় ফোরামে জমা দিয়েছি। ইতোমধ্যে দুই দফায় ১৮৬ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষিত হয়েছে। সেটাকে পূর্ণাঙ্গ করার চেষ্টা করছি। দীর্ঘদিন ধরে যারা রাজপথে আছেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাথে সম্পৃক্ত আছেন, কর্মসূচিতে আছেন- তাদের পদায়ন হওয়া, রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

নতুন কমিটির আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ড চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাকেই স্বাগত জানাই।

নতুন কমিটিতে আলোচনায় যারা : স্বেচ্ছাসেবক দলের সম্ভাব্য নতুন কমিটির শীর্ষপদে অনেকের নাম আলোচনায় রয়েছে। আহ্বায়ক/সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনের বর্তমান কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহ-সভাপতি গোলাম সারোয়ার, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুইয়া জুয়েল, সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। 

অন্যদিকে সদস্য সচিব/সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব, সাবেক সভাপতি রাজীব আহসান, স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী, যুগ্ম-সম্পাদক সাদরেজ জামান, মহানগর উত্তরের সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, দক্ষিণের সভাপতি এসএম জিলানী। 

এছাড়া সিন্ডিকেটের বাইরে ক্লিন ইমেজের ওপর ভর করে শীর্ষপদের আলোচনায় আছেন ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ।