গ্রেনেড হামলা : সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আকুতি স্প্লিন্টার নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটানো সম্রাটের 

DhakaNANDI DhakaNANDI
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ পিএম, ২২ আগষ্ট ২০২১

রাজকুমার নন্দী ও লাবিব হোসেন : সম্রাট আকবর সবুজ। টগবগে এক যুবক। সামনে অমিত সম্ভাবনা। কিন্তু তার জীবনের সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে ভয়াল ২১শে আগস্টের সেই গ্রেনেড হামলা। গ্রেনেড হামলা থেকে সেদিন নেত্রীকে বাঁচাতে হানিফ-মায়াদের তৈরিকৃত মানবঢালে অংশ নিয়েছিলেন সম্রাট এবং তার মা-ও। তখনই সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়ে স্প্লিন্টার ঢুকে যায় তার শরীরে। যার বেশি সংখ্যক রয়েছে তার প্রস্রাবের রাস্তায় এবং অন্ডকোষের ভেতরে। সেই দুঃসহ যন্ত্রণা গত ১৭ বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। 

আওয়ামী লীগ পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহতরা সরকার কর্তৃক সুচিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পেলেও কিছুই পাননি সম্রাট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতে তাকে চাকরি দেওয়ার নির্দেশ দিলেও সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণে তার ভাগ্যে জোটেনি সেই চাকরি। ছোট দুই ভাই, দুই বোন ও অসুস্থ মাকে নিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জে থাকা অসহায় সম্রাটের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি সুচিকিৎসা ও চাকরিসহ পুনর্বাসনের। 

ওই গ্রেনেড হামলায় আহত মা ও তার নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে পুরো পরিবার। স্বাভাবিক জীবনের জন্য উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আকুতি নিয়ে কর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না তিনি। সম্রাটের আশা, বিদেশে উন্নত চিকিৎসা পেলে তিনি আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন। আর সুস্থ হয়ে পথশিশুদের সেবা করতে চায় সম্রাট।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে সংঘটিত সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেও ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন নেতা-কর্মী। এ ঘটনায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ সর্বমোট ২৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে ঢাকার প্রথম মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ডাকসাইটে নেতারাও রয়েছেন। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অন্যরাও বেঁচে আছেন অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে। 

তাদেরই একজন সম্রাট আকবর সবুজ। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদরের চর লক্ষ্মীপুরে। মায়ের নাম মাহমুদা মনোয়ারা বেগম। তিনিও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের একজন। বাবা মৃত সুরুজ জামাল মিয়া। মাদারীপুরে নদীর ভাঙনে বাড়িঘরসহ সবকিছু হারিয়ে বর্তমানে কেরানীগঞ্জের চর রুহিতপুরে থাকেন। মা-ছেলের দীর্ঘদিন চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে কেরানীগঞ্জে নিজেদের সামান্য জমিটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শরীরে এখনো গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন তারা। 

হামলায় আহত হওয়ার সময় মনোয়ারা বেগম ছিলেন বাস্তুহারা লীগের কর্মী এবং আঠার বছরের ছেলে সম্রাট স্বেচ্ছসেবক লীগের কর্মী। সেদিন দু’জনেই ছিলেন মঞ্চের সামনের দিকে। গ্রেনেডে ক্ষত পা নিয়ে পথ চলছেন মনোয়ারা। আর ছেলে সম্রাট প্রস্রাবের রাস্তা, অন্ডকোষসহ শরীরে বহন করছেন অসংখ্য স্প্লিন্টার। তাকে চলতে হচ্ছে ক্র্যাচে ভর দিয়ে। 

সম্প্রতি সম্রাট আকবর সবুজের সাথে কথা হয় দৈনিক করতোয়ার। সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সম্রাট বলেন, আমি আর আমার মা ট্রাকের ওপর নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চের সামনে বসেছিলাম। বক্তব্য শেষে নেত্রীর চশমাটা পড়ে যায়। নেত্রী চশমাটা উঠিয়ে ট্রাক থেকে নামবেন- এমন সময় প্রচন্ড আওয়াজ। একটার পর একটা গ্রেনেড এসে পড়ছে। মোহাম্মদ হানিফ-মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়ারা নেত্রীকে মানবঢাল বানিয়ে ঘিরে রাখেন। সেই মুহূর্তে আমার মা-ও গিয়ে নেত্রীকে জড়িয়ে ধরেন। মা তখন বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি, নেত্রী শেখ হাসিনাকে আর হারাতে চাই না। এই বলে মা তখন আমার হাত ধরে টান দেন। মা’র সঙ্গে আমিও নেত্রীকে জড়িয়ে ধরি। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে কী যেন আমার শরীরে এসে লাগল। মোহাম্মদ হানিফ নেত্রীকে গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন। মানুষের লাশ আর লাশ, রক্তের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। 

তিনি আরও বলেন, আমি পড়ে গেলাম, মাথায় ও পিঠে আঘাত পেলাম। আমার মা পড়ে আছেন, আমিও পড়ে আছি। তখন হারিছ নামে পরিচিত এক ভ্যানওয়ালা আমাদের দুইজনকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে গেলেন। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল আমাদের চিকিৎসা দেয়নি। হারিছ চৌধুরী (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব) সেখানে উপস্থিত হয়ে ডাক্তারদের বললেন, ইনজেকশন দিয়ে সবাইকে মেরে ফেল, কোনো সাক্ষী যেন না থাকে। সেখানে আমাকে আর মাকে লাশের সাথে ফেলায়ে রাখা হলো। এখান থেকে মা ও আমাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের ওপর হামলা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সম্রাট বলেন, মা ও আমার চিকিৎসা করাতে গিয়ে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আজ আমাদের থাকার জায়গাও নেই। আমি এখনো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেঁচে আছি। হয়তো জননেত্রী শেখ হাসিনা একদিন না একদিন আমার খোঁজ নেবেন, আমার দিকে সুনজর দেবেন। সে আশাতেই অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও বেঁচে আছি। 

তিনি আরও বলেন, একবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তখন তিনি আমাকে চাকরি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু লোকের অবহেলার কারণে আমার চাকরি আর হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজ দিয়েছি। অনেক মন্ত্রী-এমপির বাসায় গিয়েছি। কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাইনি। মাঝে মাঝে ভাবি, ভিক্ষা করি। কিন্তু লোকে বলবে- আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, আর তুমি ভিক্ষা করছ-এই লজ্জায় ভিক্ষাও করতে পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয়- সেদিন মরে গেলেই হয়তো ভাল হতো। 

জানা যায়, সম্রাট কোনো সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা না পেলেও তার মা প্রথমে তিন লাখ টাকা অনুদান পান এবং পরে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পান। সেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় কোনো রকমে তাদের চিকিৎসা ও ৬ জনের সংসার চলছে।