বগুড়ার টুপির কারিগরদেরও স্বপ্ন ভেঙে দিযেছে করোনা

Online Desk Online Desk
প্রকাশিত: ১০:৩৪ পিএম, ১৭ মে ২০২০

নাসিমা সুলতানা ছুটু ঃ দিনমজুর স্বামীর আয়ে সংসার চলে না স্বর্ণা খাতুনের। স্বামী যা আয় করেন, তা দিয়ে টেনে-টুনে দু'বেলার খাবার জোটাতেই হিমশিম খেতে হয়। আরও এক বেলার খাবারসহ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ তো রয়েছেই। ধুনট উপজেলার পেঁচিবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা স্বর্ণা খাতুন তাই সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য টুপি তৈরি করেন। টুপি থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা আসে।

তবে রমজানে বেশি চাহিদা থাকে বলে শব-ই বরাতের পর থেকে পরবর্তী এক মাসে দ্বিগুণ বেশি উৎপাদন করেন বলে আয়ও বেড়ে ১২ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা হয়। কিন্তু এবার করোনার প্রভাবে সেই আয় বন্ধ রয়েছে স্বর্ণা খাতুনের মত করোনার প্রভাবে আর্থিক সংকটে পড়েছেন বগুড়ায় টুপি তৈরিতে নিয়োজিত জেলার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার অনেক গৃহবধূ ও তাদের স্কুল-কলেজ পড়–য়া যুবতী ও কিশোরী কন্যাসহ ২ লাখ নারী। প্রতি বছর রমজান মৌসুমে টুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে বলে এর উৎপাদনও বেড়ে যায়। কিন্তু এবার করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারীর কারণে উৎপাদিত টুুপির চাহিদা না থাকায় বিপুল সংখ্যক নারী ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

টুপি তৈরিতে নিয়োজিত নারীরা জনিয়েছেন, পাইকারী ব্যবসায়ীরা টুপি না কেনায় ঈদের আগে তারা অন্তত ১০ হাজার টাকা থেকে পনের হাজার টাকা আয় থেকে বঞ্চিত। এতে শুধু ঈদের কেনা-কাটা করা যেমন অসম্ভব হয়ে পড়েছে তেমনি আগামীতে স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ বহন করাও কষ্টসাধ্য হবে। এভাবেই তাদের সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে করোনা। তারা অবিলম্বে সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

টুপির পাইকারি ক্রেতারা জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরের সিংহভাগ মার্কেটগুলোতে আগের মত স্বাভাবিক কেনা-কাটা হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানী বন্ধ রয়েছে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা নারীদের উৎপাদিত টুপি কেনা বন্ধ রেখেছেন। 
প্রায় চার দশক আগে বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছি গ্রামে কয়েকজন গৃহবধু কুরুশকাঁটা দিয়ে টুপি তৈরি শুরু করেন। প্রথম দিকে এই টুপিগুলো বাড়ির পুরুষ সদস্যরা ব্যবহার করলেও পরবর্তীতে গেল শতাব্দীর নব্বই দশকের শুরুতে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয়। এতে গৃহবধুরা বাড়তি আয়ের জন্য টুপি তৈরি শিখে তার উৎপাদন বাড়িয়ে দেন। এক পর্যায়ে ধুনট উপজেলার সীমানা ছাড়িয়ে তা পাশের শেরপুর উপজেলার গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। গৃহবধুদের পাশাপাশি তাদের স্কুল-কলেজ পড়–য়া যুবতী ও কিশোরী মেয়েরাও টুপি তৈরিতে মনোযোগী হন। বাড়ি বাড়ি সব বয়সী নারী টুপি তৈরিতে যুক্ত হওয়ায় ওই দুই উপজেলার গ্রামগুলো টুপি পল্লী হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। 

বগুড়ায় নারীদের উৎপাদিত টুপি পাইকারি বিক্রেতাদের সংগঠন বাংলাদেশ জালি টুপি এসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর উপজেলায় গৃহবধূ এবং তাদের স্কুল-কলেজ পড়–য়া মেয়েসহ প্রায় ২ লাখ নারী টুপি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সারা বছর উৎপাদিত টুুপি রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিক্রি হয়। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে চাহিদা বেড়ে যায় বলেই রমজানে অন্তত ১ কোটি পিস টুপি উৎপাদন হয়। মান ভেদে এসব টুপি ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

শেরপুর উপজেলার শালফা এলাকার আয়েশা সিদ্দিক নামে এক কলেজ ছাত্রী জানান, কলেজ বন্ধ থাকলেই তিনি বাড়ি এসে টুপি তৈরি করে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। যা দিয়ে তার পড়ালেখার খরচ চলে। তিনি বলেন, ‘এবার করোনার কারণে ১৯ মার্চ থেকে কলেজ বন্ধ হওয়ার পর বাড়ি এসে টুপি তৈরি শুরু করি। শব-ই-বরাতের পর তা আরও বাড়িয়ে দিই। ভেবেছিলাম এবার উৎপাদন বেশি হচ্ছে টাকাও বেশি পাব। কিন্তু করোনার কারণে পাইকারি ক্রেতারা গ্রামে আসছেন না এবং টুপি কেনাও বন্ধ রেখেছেন। তাই ঈদের কেনা-কাটা যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তেমনি আগামীতে পড়ালেখার খরচ যোগানও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন সরকার যদি সাহায্য না করে তাহলে আমরা আমাদের মায়েরা কিভাবে চলবে।’

বগুড়ায় টুপি পাইকারি বিক্রেতাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ জালি টুপি এসোসিয়েশন’-এর সভাপতি জুয়েল আখন্দ জানান, করোনার কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই ঘরে থাকায় এবার জেলার ধুনট ও শেরপুরের গ্রামের ঘরে ঘরে টুপির উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু করোনা সৃষ্ট মহামারির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় জেলার সিংহভাগ মার্কেট ও বিপনী বিতান বন্ধ থাকায় টুপির চাহিদা নেই। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানী বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া এবার বিক্রি এতটাই কমেছে যে আগের বছরের মজুদই শেষ হচ্ছে না। তাই নতুন করে কেনা সম্ভব হচ্ছে না।