এটাই আলোচিত তিস্তা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:২৭ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মিজানুর রহমান, কাউনিয়া (রংপুর) : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বেশকিছু ইস্যু নিষ্পত্তি হলেও তিস্তা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে এখনও কোনো সুরাহা হয়নি। দুই দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বহুবার আলোচনায় পানি বণ্টন চুক্তি সমাধান না হওয়ায় তিস্তার ভারতীয় অংশে পানি থই থই করছে আর বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানির প্রবাহ নেই। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই এক সময়ের খর¯্রােতা তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে ধু ধু তপ্ত বালুচর। আর পানিশূন্য তিস্তার প্রভাব পড়েছে কৃষিক্ষেত্রে। পানির স্তুর নিচে নেমে যাওয়ায় বোরো ও রবিশস্য আবাদে সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। অপরদিকে নদীতে পানি না থাকায় চাহিদামত মাছ ধরতে না পারায় জেলেদের দুশ্চিন্তারও শেষ নেই। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই তিস্তা পানিশূন্য হয়ে পড়ায় হতাশ নদী পাড়ের মানুষ। পানির অভাবে প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্র্যের ওপর যে প্রভাব পড়েছে তা থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠেছে সর্বমহলে।
জানা যায়, ভারতের সিকিম রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী ১৭৮৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী ছিল। এই নদীর যৌবনা অবয়বের কারণে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ছিল শীতল, শান্ত ও মায়াময়। জলবায়ু ছিল অতীব সহনীয়। কিন্তু পানি বণ্টনের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একগুঁয়েমি, অনৈতিক ঢিলেমি ও হটকারিতায় ১৯৯৮ সালে ভারত গাজলডোবায় ঁবঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় বাংলাদেশের নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া তিস্তা শুষ্ক মওসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে তিস্তা তীরবর্তী ও আশপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিন মঙ্গলবার কাউনিয়ার পাঞ্চরভাঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা সড়ক সেতু দাঁড়িয়ে রয়েছে ধু ধু বালুচরের ওপর। পাকা সেতু থাকলেও নদীতে পানি না থাকায় অনেকে হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছেন। নদীতে থেমে গেছে মাঝি মাল্লাদের দৌড়ঝাঁপ। শুকনো বালুচরে পড়ে আছে মাছ ধরা নৌকাগুলো। তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে বালুচর। এক সময় তিস্তা নদীতে মাছ আহরণ করে শুঁটকি ও মাছ বিক্রি করে জীবনযাপন করতেন এ অঞ্চলের জেলেরা। তারাও আজ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশা শুরু করেছেন। আর মাঝিমাল্লারা কর্মহীন হয়ে বেকার জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে তিস্তায় জেগে ওঠা চরে ও নদী তীরবর্তী গ্রামে সেচের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। কেউ কেউ দূর থেকে পানি এনে, কেউবা ডিজেল চালিত সেচযন্ত্রের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছেন ফসল।
এদিকে গত বর্ষায় ৫ দফার বন্যায় বিপন্ন জনপদে বোরো আবাদ করে ঘুরে দাঁড়াবার যখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কৃষক, তখন তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ শূন্যের কোঠায়।
সাবেক উপসহকারী কৃষি অফিসার সুবল চন্দ্র বলেন, পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া কোন ফসল উৎপাদন হয় না। শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে তিস্তা। আর পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চলতি বোরো ও রবিশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা     রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি প্রবাহ থাকে না। এ বছর ফাল্গুনেই যেভাবে তিস্তায় পানির স্তুর নিচে নেমে যাচ্ছে, তাতে শুধু নদী তীরবর্তী গ্রাম শুধু নয়, এর প্রভাব পড়ছে গোটা অঞ্চলে। তিনি বলেন, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চাষাবাদে সেচ কাজে প্রভাব পড়ছে। ফলে কৃষকেরা বিপাকে পড়ছে। তিস্তা সেচ প্রকল্প ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজার রহমান জানান, এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিস্তার পানি প্রবাহ ২৫০০ কিউসেক নিচে নেমে যাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই সেচ প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা কষ্টসাধ্য।