বেতনের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করেন ফারুক

প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৪, ২০২২, ০৩:৪৩ দুপুর
আপডেট: জানুয়ারী ১৪, ২০২২, ০৩:৪৩ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

দিনাজপুর প্রতিনিধি: যুবক ফারুক হোসেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একজন ট্রাকচালক। তার আয়ের চার ভাগের এক ভাগ গরিব ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য ব্যয় করেন। শুক্র ও শনিবার বাইসাইকেল নিয়ে ছুটে যান গ্রামের গরিব ছাত্রছাত্রীদের কাছে। খাতা-কলম, পেনসিল তুলে দেন তাদের হাতে। এভাবে গত ১৯ বছরে অন্তত সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীকে সহায়তা করেছেন তিনি। বাড়িতে দিয়েছেন বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পদকও।
ফারুক হোসেনের বাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর মালিপুকুর গ্রামে। তার বাবা মাহবুব হোসেন ২০০৬ সালে মারা যান। জরাজীর্ণ একটি ঘরে তার পরিবারের বসবাস। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া ফারুক ২০০২ সালে দিনাজপুর বিএডিসিতে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করেন। অফিসে প্রথম মাসে বেতন তুলতে গিয়ে দেখেন সহকর্মী শ্রমিকরা সবাই টিপসই দিয়ে টাকা তুলছেন। বিষয়টি তার কাছে ভালো লাগেনি। স্বাক্ষর দিয়ে যাতে সবাই টাকা তুলতে পারেন, এ জন্য তাদের অক্ষর শেখানো শুরু করেন ফারুক।
বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে এবং নাশতার পয়সা বাচিয়ে প্রথমে তিনি ২০০ টাকার খাতা-কলম কিনে শ্রমিকদের হাতে তুলে দেন। ধীরে ধীরে সবাইকে স্বাক্ষর করা শেখান তিনি। এ কাজে খুশি হয়ে নরেশ চন্দ্র নামের একজন গাড়িচালক ফারুককে গাড়ি চালানো শেখান।
২০০৭ সালে রাজশাহীর বিএডিসির উপ-পরিচালকের দপ্তরে অনিয়মিত গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ট্রাকচালকের সহকারী পদে স্থায়ী নিয়োগ পান ওই বছরের ১৬ জুলাই। বদলি হন রংপুর বিএডিসি কার্যালয়ে। পরে চালক হিসেবে পদন্নোতি পেয়ে দিনাজপুর বিএডিসিতে যোগদান করেন।
বর্তমানে তার বেতন ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। এর ২৫ শতাংশ তিনি খরচ করেন সমাজসেবায়। বিশেষ করে গরিব ছেলেমেয়েদের শিক্ষার কাজে। বাকি টাকা দিয়ে চলে মা ছনোয়ারা বেগম, স্ত্রী সাবেরা আক্তার ও শিশুপুত্র সাব্বির হোসেন ও সাহাব হোসেনের ভরণপোষণ।
ফারুক হোসেন বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াব। কিন্তু চেরাডাঙ্গী উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পরে অভাবের কারণে পড়াশোনা আর এগোয়নি। নিজে এগোতে না পারলেও শিক্ষা উপকরণের অভাবে এলাকার যেসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’
খাতা-কলম আর জামাকাপড়ের অভাবে কাশিমপুর মাহানপাড়া গ্রামের স্কুলছাত্র নুর ইসলামের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় ২০০৮ সালের জুলাই মাসে। খবর পেয়ে ফারুক তার বাড়িতে যান এবং নুর ইসলামের মায়ের হাতে তিন হাজার টাকা তুলে দেন। নুর ইসলাম এখন দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে অনার্স পাস করে মাস্টার্স করছেন।
২০০৯ সালে তিনি বেতনের ২৫ ভাগ ও জমানো টাকায় ২০ জন শিক্ষার্থীকে খাতা-কলম ও পোশাক কিনে দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন।
টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল চেরাডাঙ্গী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র জাহিদ হোসেনের, অষ্টম শ্রেণির আমেনা, সপ্তম শ্রেণির আবদুস ছাত্তারের। কাশিমপুর গ্রামের মিল্লাত হোসেন, ইমন হোসেন, সাকিলা খাতুনও পড়ে দারিদ্র্যের চাপে। টাকার অভাবে আলাদা করে অংক ও ইংরেজি পড়া সম্ভব হচ্ছিল না চেরাডাঙ্গী উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মনজুরুল ইসলামের। এসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ান ফারুক।
কাশিমপুর মালিপুকুর গ্রামের সীমা আক্তার যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী, তখন বাবা ছামিরুল ইসলাম নিরুদ্দেশ হন। মাস তিনেক পর সীমার বিয়ে ঠিক করেন মা। ফারুক ছুটে গিয়ে সীমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিলে তার বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়। সীমা এখন কলেজে পড়ছে। সীমা আক্তার বলেন, ‘ফারুক আঙ্কেল আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমি ডাক্তার হতে চাই।’
সিকদারগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মর্জিনা খাতুন ও সুলতানা খাতুনের প্রতিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন ফারুক। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গেলে অনেক শিক্ষার্থী তার স্কুলব্যাগটি দেখিয়ে বলে, ‘ফারুক আঙ্কেল কিনে দিয়েছেন।’
সিকদারগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর ভেতরেও যে অপার সম্ভাবনা আছে, তা ফারুক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। গ্রামকে মাদকমুক্ত রাখা, পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো, সড়কে নিরাপদে চলতে সচেতনতা সৃষ্টির মতো কাজও করছেন ফারুক।’
কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘ফারুক মাসে অন্তত দুবার খাতা-কলম, পেনসিল ও শিশু শিক্ষার বই বাইসাইকেলে নিয়ে স্কুলে স্কুলে গিয়ে বিতরণ করেন। কোনো শিক্ষার্থী স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন। এ কারণে কাশিমপুর গ্রামের শতভাগ শিশু এখন স্কুলে আসে।’
ফারুকের বাইসাইকেলের সামনে পেছনে ঝোলানো কাগজে লেখা সচেতনতামূলক কয়েকটি স্লোগান আছে। এগুলো হলো- ‘খেলাধুলায় বাড়ে বল, মাদক ছেড়ে স্কুলে চল’ ‘রাস্তায় চলতে মনোযোগ রাখবো, নিরাপদে বাড়ি ফিরবো’ ‘যে মুখে ডাকি মা, সে মুখে মাদক না’ ‘বাল্যবিবাহ দিবো না, বিপদ ডেকে আনবো না’।
আউলিয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক, সদস্য মাহাবুব আলমের চোখে ফারুক একজন সমাজসেবক। ১৩ মার্চ আসলে সেই স্বীকৃতিই পেয়েছেন ফারুক। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন তার হাতে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজকর্মী পদক ২০১৮ তুলে দেন।
স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় করোনাকালে ফারুক হোসেন খাতা কলমের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা দিয়ে এলাকায় মাস্ক ও হ্যান্ডসেনিটাইজার ও সাবান বিতরণ করেছেন। মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এবারও বিদ্যালয়গুলোতে বই উৎসবে খাতা কলম বিতরণ করেছেন। শীতার্ত মানুষের মাঝে বিতরণ করেছেন শীতবস্ত্র।
২০১০ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার বোয়ালধর গ্রামের সলিমুল্লাহর মেয়ে সাবেরা আক্তারকে বিয়ে করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে দুজনে মিলে একটি বয়স্ক কেন্দ্রে গড়ে তুলেন। বাড়ির উঠানে তার স্ত্রী গ্রামের বয়স্ক নারীদের পড়াশোনা শেখানো শুরু করেন। ফারুক তার স্ত্রীকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকেন।
গ্রামের আকলিমা বলেন, ‘বয়স্ক কেন্দ্রে এসে এখন আমি নাম-ঠিকানা লিখতে পারেন। বললেন, ‘গ্রামত এমন কাহো নাই যে নাম সহি করতে পারে না। ফারুকের বাড়িত আসিয়া ওর বউয়েরঠেনা সবাই পড়ালেখা শিখিছে।’
সাবেরা আক্তার বলেন, ‘তার (ফারুকের) আগ্রহের কারণেই আবার পড়াশোনা শুরু করি। ২০১১ সালে দিনাজপুর কেবিএম কলেজে কৃষি ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হই। কৃষি ডিপ্লোমা পাস করে এখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কৃষিশিক্ষায় স্নাতক (বিএজিএড) করছি। ভালো কাপড়, ভালো খাবার দিতে না পারলেও স্বামী ফারুকের কারণে আমি সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারি।’
ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রতিমাসে রুটিন করে ৩৫০ টি করে খাতা ও কলম বিতরণ করি। পাশাপাশি বাল্য বিয়ে রোধ, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম, রমজান মাসে সেহেরির সময় গ্রামবাসীকে জাগিয়ে দেওয়া, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা শোনা এবং সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা, পরিচিতজনদের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট সমস্যাগুলো সমাধান দিয়ে থাকি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরস্কারের আশায় নয় আমার এলাকার কেউ যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই চিন্তা থেকে কাজটি করছি। ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় না আসা পর্যন্ত এই উদ্যোগ চলবে।’

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়