হত্যা-ধর্ষণ-মাদক মামলার আসামিরা নৌকা পেতে মড়িয়া!

Online Desk Aminul Online Desk Aminul
প্রকাশিত: ০৮:৪৯ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার: ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বগুড়ায় ২য় ধাপের ঘোষিত তফসিলের পর কয়েকটি ইউনিয়নে বিতর্কিতরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পর আরো একাধিক ইউনিয়নে হত্যা, ধর্ষণ ও মাদক মামলার আসামিরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মড়িয়া হয়ে উঠেছেন। ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে নেতা কর্মীদের নিয়ে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। নেতাদের পিছেও ঘুরছেন গভীর রাত পর্যন্ত। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
যদিও বিতর্কিত যারা মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের নামে বরাদ্দকৃত নৌকা মার্কা বাতিল করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে তারপরেও বসে নেই বিতর্কিতরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ভাটরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোর্শেদুল বারীর নামে কলেজ ছাত্রী ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, সরকারি কাজে বাঁধাসহ ৭টি মামলা রয়েছে। তিনি আবারো নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। তবে তাকে মনোনয়ন না দেয়ার জন্য মাঠে নেমে পড়েছেন মোর্শেদুল বারীর ছোট ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মজনুর রহমান মজনু। তিনিও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। তার নামেও মামলা রয়েছে একটি।
গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান আলতাব একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি। আলতাবের একটি ইটভাটা আছে ওই এলাকার জামিরবাড়ীয়া পিছনপাড়ায়। ওই ইটভাটার আশরাফ আলী নামে এক কর্মচারীকে ২০১৩ সালের ১৪ জুন রাতে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও রাতভর নির্যাতন করে মূখের ভিতর বিষ ঢেলে দিয়ে হত্যা করেন। এ হত্যার ঘটনায় পরের দিন আলতাবকে প্রধান আসামি করে ৯ জনের বিরুদ্ধে গাবতলী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের পরিবার। আর এই হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী আলতাবের বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ইটভাটা গুড়িয়ে দেয়। এ মামলায় আলতাবকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয় সে সময়কার গাবতলী মডেল থানার এসআই আনোয়ার হোসেন। পরে মামলার তদন্ত শেষে আলতাবকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। মামলাটি বিচারাধীন আছে এবং আলতাব উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। ওই হত্যার এক বছর আগে আলতাব ওই সোনারায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর হয় ওই ইউনিয়নের সম্মেলন না হওয়ায় এখনও তিনি ওই পদে বহাল আছেন। আর ওই পদে বহাল থেকে এবার ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে দলীয় মনোনয়নের জন্য তদবির ও দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন।
স্থানীয়রা এবং দলীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, আলতাব একজন নিরীহ মানুষকে খুন করেছে এবং দলের মধ্যে নানা বিতর্কের সৃষ্টি করে চলেছে। এসবের কারণে এক বছর আগে দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্চিতও হন আলতাব।
জেলার সদর উপজেলার সাবগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসরাইল হোসেন একটি হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। ওই ইউনিয়নের উদ্দিরগোলা বাজারে ২০১৯ সালের ১৫ নভেম্বর প্রকাশ্যে দিনের বেলায় আব্দুর রহিম সরকার নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে কুপিয়ে খুন করা হয়। এ হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাই আব্দুল বাসেদ সরকার বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে ১৭ জনের নামে বগুড়া সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্যতম আসামি করা হয় সাবগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসরাইল হোসেনকে। এ মামলায়ও ইসরাইল হোসেনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। ইসরাইল হোসেন জামিন নিয়ে এলাকায় জনসংযোগ করছেন। তিনিও দলীয় মনোনয়নের জন্য তদবির করছেন।
জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এফাজ উদ্দিন একটি খুনের মামলার অন্যতম আসামি। জানা গেছে, ওই ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ফজলুল করিম শেখ ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল খুন হন। এ খুনের ঘটনায় নিহতের পরিবার থেকে যাদেরকে আসামি করা হয় সেখানে এফাজ উদ্দিনের নাম ছিলো না। এ খুনের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি এফাজ উদ্দিনের সম্পৃক্ততা পান। সিআইডির পরিদর্শক শামসুল আলম মামলার তদন্ত শেষে এফাজ উদ্দিনকে অভিযুক্ত করে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তিনি ইউপি নির্বাচন করতে দলীয় মনোনয়ন চাচ্ছেন।
একই ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক আল ওয়াকি শিলু একটি মাদক মামলার আসামি। তাকে ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ মামলায় ২৩ মে ২০১৯ সালে রায় হয়। রায়ে আল ওয়াকি শিলুর এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে তিনি মামলার রায়ের বিষয়ে আপিল করেছেন। তিনিও দলীয় মনোনয়নে চেয়ারম্যান হতে চান।
জেলার ধুনট উপজেলার এলাঙ্গী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদ্য বহিষ্কৃত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ তারেক হেলাল মাদক মামলার আসামি। ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা হয়। তিনিও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন। একই উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মুর্তজা একটি মাদক মামলার আসামি। ২০০৭ সালে তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা হয়। তিনিও দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড় ঝাপ শুরু করেছেন।
এদিকে জেলা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোন নেতা এসব বিষয়ে মুখ খুলছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতা বলেছেন, উপজেলা ও জেলা থেকে নাম পাঠানো হলেও এবার কেন্দ্র থেকে যাচাই বাছাই করে মনোনয়ন দেয়া হবে।
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতি টি জামান নিকেতা বলেন, ইউনিয়ন ও উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকা জেলা আওয়ামী লীগে থেকে পাঠানোর আগে জেলা কমিটির সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে বিতর্কিতরা সুযোগ পাবে না। কিন্তু বগুড়ায় তা করা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীরা ৬ জন নেতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এরা হচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ, উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সেক্রেটারি। গোপনে প্রার্থীদের তালিকা না করে সবার মতামত নিয়ে নামের তালিকা করলে দলও ভালো প্রার্থী পাবে। ফলে কাউকে বিব্রত হতে হবে না।


আরও পড়ুন