জরায়ুর সমস্যা ও তার প্রতিকার

Online Desk Hadisur Online Desk Hadisur
প্রকাশিত: ০৪:৪৪ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০২১

করতোয়া অনলাইন সংস্করণ ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ‘Daily Karatoa'য় প্রতি বুধবার প্রচার হচ্ছে স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘আমাদের স্বাস্থ্য’। গত সপ্তাহে জরায়ুর সমস্যা ও তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও । অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডাঃ লোকমান হোসেন। দৈনিক করতোয়ার সাপ্তাহিক আয়োজন ‘স্বাস্থ্য কথা'য় ওই আলোচনার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।
 নিয়ে আলোচনা করেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিশেষঞ্জ ডাঃ অক্ষয় কুমার রায়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডাঃ লোকমান হোসেন। দৈনিক করতোয়ার সাপ্তাহিক আয়োজন ‘স্বাস্থ্য কথা'য় ওই আলোচনার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

দেখুন ভিডিও 

ডাঃ মোঃ লোকমান হোসেন: নারীদের প্রজননতন্ত্র কী কী নিয়ে গঠিত?
ডাঃ সুলতান রাজিয়া: নারীদের জরায়ু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্গান। মানব সৃষ্টি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর সৃষ্টির সাথে জড়িত যে অঙ্গ সমূহের সমষ্টিই প্রজননতন্ত্র। প্রজননতন্ত্রের মাধ্যমেই মানব সৃষ্টি হয় এবং একটি মহিলা সক্ষম কী না সেটি বোঝা যায় তার প্রজননতন্ত্র সম্পূর্ণ আছে কী না? এই প্রজননতন্ত্র দুইভাগে বিভক্ত। আভ্যন্তরীন ও বহিঃ। আভ্যন্তরীন প্রজননতন্ত্রের দুটি অন্যতম অঙ্গ জরায়ু এবং ডিম্বাশয়। এই জরায়ু থেকে নারীদের ঋতুস্রাব হয় এবং বাচ্চাদানী বলা হয়। বাচ্চা মাতৃগর্ভে বাচ্চাদানীতে আমাদের হিসেব অনুযায়ী ৯ মাস ৭দিন এবং চন্দ্রমাসের হিসেব অনুযায়ী ১০ মাস ১০ দিন থাকে তারপর ভুমিষ্ট হয় এবং মানব শিশু হিসেবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই যে মানব শিশুর জন্ম এবং মানব শিশু যে মাতৃগর্ভে ১০ মাস থাকলো এটিকেই বলা হয় জরায়ু।

ডাঃ মোঃ লোকমান হোসেন: আমাদের দেশের মহিলারা সাধরণতঃ জরায়ুর কী কী ধরণের সমস্যায় পড়েন?
ডাঃ সুলতান রাজিয়া: জরায়ুর খুব কমন একটি সমস্যা ইনফেকশন। এছাড়াও সাধারণ কিছু সমস্যা রয়েছে জরায়ুর মধ্যে পলিক তৈরি হতে পারে। জরায়ু ডায়োটা প্রশস্ত হতে পারে। যেটাকে বলে হাইপার হাইপার প্রাশিয়া বা হাইপার ট্রফি। এছাড়া জরায়ুতে টিউমার হতে পারে। এই টিউমার মানে ফোলা। সেই টিউমার আবার দুই ধরণের। একটি সাধারণ টিউমার যেটি ক্যান্সার নয়। আরেকটি ক্যান্সার জাতীয় টিউমার। ইন্ডোমেডিয়া ক্যান্সার বা সার্ভিয়েক্যাল ক্যান্সার। অর্থাৎ জরায়ুর বডির ক্যান্সার ও জরায়ুর মুখে ক্যান্সার। তবে ক্যান্সারের প্রবণতা কম হয়। বেশি হয় জরায়ুর ইনফেকশন ও টিউমার। তবে সাধারণ টিউমার যেটি হয় সেটি নিয়ে অনেকে আতঙ্ক হতে পারেন, হয়তো তার ক্যান্সার দিকে যাচ্ছে। 


ডাঃ মোঃ লোকমান হোসেন : টিন এজারসহ অনেক মেয়েরই মাসিকের সময় এবং মাসিকের পরে পেটে প্রচন্ড ব্যাথা হয়, এটি কেন?
ডাঃ সুলতান রাজিয়া: বয়োসন্ধিকালে মাসিকের সময় প্রথম এক-দেড় বছর কোন ব্যাথা থাকে না তারপর দেখা যায় ব্যাথা শুরু হয়। এটি আবার বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যায়। কুড়ি বছরের পর আর থাকে না। ১৩-১৪ বছরে শুরু হলো আবার কুড়ি বছরের পর বা ২৫ এর পর চলে গেল। এই সময়ের মধ্যে মাসিকের সময় যে ব্যাথা হয় তাকে বলে প্রাইমারী ডিসমেনোরিয়া। এই প্রাইমারী ডিসমেনোরিয়া জরায়ুর কোন সমস্যা নয়। এটি হচ্ছে হরমোন এবং ওই মেয়েটির মানসিক অবস্থার সাথে সম্পর্কিত। হরমোন ওই মেয়েটির মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অনেকে এই সময় নার্ভাস থাকে, অনেকের শরীরে কিছু হরমোনের ইমব্যালান্স হয়। বলা হয় একটি ডিসমেনোরিক মায়ের বাচ্চা ডিসমেনোরিক হবে। এজন্য প্রাইমারী ডিসমেনোরিয়া কোন ডিজিজের কারণে হয় না। এটি হরমোন রিলেটেড বা সাইকোলোজিক্যাল ফ্যাক্টর রিলেটেড। এজন্য এসময় কিছু পেইনকিলার বা কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে কমানো যায়। ২৫ বছরের পর মাসিকের সময় যে ডিসমেনোরিয়া হয়, সেটির কিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন টিউমার, ইনফেকশন বা জরায়ুর জন্মগত কিছু ডিফেক্ট থাকে। তাহলে ২৫ বছরের আগে মাসিকের সময় যে ব্যাথা হয় তার কারণ এবং ২৫’র পরের কারণের মধ্যে পার্থক্য আছে। 


ডাঃ মোঃ লোকমান হোসেন: জরায়ুর টিউমার সম্পর্কে যদি কিছু বলেন? 
ডাঃ সুলতান রাজিয়া:
 টিউমার মানে হচ্ছে ফোলা। অর্থাৎ জরায়ুটা বড় হয়ে যাচ্ছে, জরায়ুর মধ্যে একটি জিনিস দেখা দিচ্ছে। সেটি কী জিনিস? সেটি ইনফেকশন হতে পারে। ইন্ডোমেট্রোসিস বলে একটি কনডিশন আছে যেটা জরায়ুর মধ্যে একটি ফোলা তৈরি করে। জরায়ুর মাংসপেশীর মধ্যে একটি ফোলা আছে সেই ফোলাটা অ্যাডোনোমাইসিস বা ভিতরে টিউমার জাতীয় কন্ডিশন তৈরি করবে। 
যেটি সাধারণ টিউমার যেটিকে ফাইরয়েড বলে মেডিকেলের ভাষায় যেটিকে মায়োমা বলে। এই মায়োমা বা ফাইরয়েড খুব কমন পাওয়া যাচ্ছে। এটি সাধারণতঃ ৩০ বছরের পরে ধরা পড়ে। ত্রিশ বছরের পর অ্যাল্ট্রসোনোগ্রাফি করলে এটি ধরা পড়ে। 
অনেক সময় অন্য কোন কারণে ডাক্তারের কাছে এলে ডাক্তার একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার পর ফাইরয়েড ধরা পড়ল। সেটি বড়ও হতে পারে। এতে রোগীর কোন সমস্যা নেই। আবার অনেক বড় টিউমার হলেও রোগী বুঝতেই পারে না তার টিউমার আছে। রোগী মনে করে তার পেট বড় হচ্ছে, ফুলে যাচ্ছে অথবা স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে। সে এটিকে স্বাস্থ্য ভালোর কারণে পেট মোটা হচ্ছে বলে ভেবে নেয়। কিন্তু এ রকম ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগী ডাক্তারের কাছে আসে না। কিন্তু পেট ভারী মনে হচ্ছে বা পেটে চাকার মত মনে হচ্ছে এ রকম ক্ষেত্রে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে আসা উচিৎ। এরপর রোগীর অনেক ব্লিডিং হয়। মাসিক যে ঋতুস্রাব তার একটি প্যাটার্ন আছে। এই প্যাটার্নটি স্বাাভাবিক। ২৮ দিন পর পর হবে। দুই থেকে সাতদিন থাকবে এবং তার সাথে ব্যাথাটা সহনীয় ও পরিমাণটা স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকবে। দলা দলা রক্ত যাবে না। কিন্তু ঋতুস্রাব যখন বেশি হয়, কাপড় দিয়ে কন্ট্রোল করা যায় না তাকে অনেক কাপড় বা প্যাড নিতে হচ্ছে, দলা যাচ্ছে এবং তা এলোমেলোভাবে অর্থাৎ সাতদিনের বেশি থাকছে। মাসিক ছাড়াও হচ্ছে এ রকম অনিয়মিত হচ্ছ এবং অতিরিক্ত ব্যাথা থাকছে। এই সমস্যাগুলো কমন সিনড্রোম। এই সমস্যাকে প্রোগ্রেসিভ ম্যানোরোজিয়া। এটি আস্তে আস্তে বেড়ে যায়। এবং প্রস্রাবের সমস্যা হতে পারে। প্রস্রাবের সময় চাপ দিয়ে ইউট্রাসটা বড় হয়ে যায়। এই ধরণের সমস্যাগুলো বেশির ভাগ হয়।


ডাঃ মোঃ লোকমান হোসেন: জরায়ুতে টিউমার হলে গর্ভধারণ বা বাচ্চা কনসিভ করতে সমস্যা হয়, এটি কেন হয়?
ডাঃ সুলতান রাজিয়া:
 ফাইরয়েড টিউমারটা যদি এমন জায়গায় থাকে, যে রাস্তাটা বাচ্চা ধারণের জন্য প্রয়োজন। যেমন জরায়ুর ভিতরে একটি ক্যানাল আছে, তারপর টিউব আছে। টিউবের গোড়া আছে। এই রাস্তাটি ক্লিয়ার থাকতে হবে। যে বীর্যটা নির্গত হয়, সেই বীর্য জরায়ুর মধ্যে দিয়ে টিউবে চলে যায়। টিউবের মধ্য দিয়ে ডিম্বানুটা ডিম্বাশয়ে যায়। পরে টিউবের মধ্যে ডিম্বানু ডিম্বাশয়ে গিয়ে নিষিক্ত হয়। এই রাস্তাটাটাকে ডিস্টার্ব করে ফাইরয়েড বা টিউমার। টিউমারটা যদি জরায়ুর মুখে থাকে বা টিউবে গোড়ায় বা জরায়ুর পাশে থাকে তখন ডিম্বাশয়ে ডিম্বানু গিয়ে নিষিক্ত হতে বাধাগ্রস্থ হয়। বাধা দেওয়ার কারণে নিষিক্ত হতে পারে না।