টুনির ওড়াউড়ি

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:৩৯ পিএম, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

মোস্তফিজুল হক : টুনি নতুন ওড়াউড়ি শিখেছে। তাই ওর খুব আনন্দ। খুশিতে অনেক বেশিই ওড়াউড়ি করছে। দুইতিন ফুট দূরের ডালে অনায়াসে উড়ে গিয়ে বসতে পারে। এসব দেখে টুনির মা বলল,
পানিতে পড়ে যাবি তো? এভাবে নাচানাচি করতে নেই! দেখতে পাচ্ছিস না, নিচে কত পানি। তাছাড়া হুতোম প্যাঁচার মতো গাল ফুলিয়ে কচু গাছের নিচে বসে আছে সোনাব্যাঙ।
জবাবে টুনি বলল,
: মা, তুমিই তো বললে, "একটু উড়ে বেড়া। ডানা মেলে এবার একটু সাহস বাড়া!" কি, বলনি?
: তা বলেছি, তবে এতটা দুঃসাহস দেখানো ঠিক না।
মাকে অভয় দিতে টুনি এক মজার কাহিনি শোনালো,
: মা, তুমি সবকিছুতেই ভয় পাও! আমি সকালে দেখলাম মাছরাঙা খালার ছেলে বুড়ো দাদুর সঙ্গে গল্প করছে।
টুনির মা ভাবল মাছরাঙার ছেলে অন্য কোনো পাখির সাথে বসে কথা বলেছে। তাই ওর মা বলল,
: এটা আর এমন কি? পাখিরা পাশাপাশি বসে আলাপ করতেই পারে!
: মা, এই দাদু পাখি না, মানুষ দাদু।
টুনির মা তো শুনে অবাক। এবার ওর মা বলল,
: কী বলিস? এতো বড়ো দুঃসাহস!
: মা, শুধু কি তাই? ও মাছ ধরে এনে বুড়ো দাদুকে দেখিয়েছে। বলেছে ছড়া লিখে দাও।
: তাই নাকি?
: হ্যাঁ, মা। দাদু মোবাইল ফোন দিয়ে ওর ছবি তুলে রেখেছেন। নাচানাচি ও চেচামেচির ভিডিও করে রেখেছেন!
এমন সময় টুনির দিদিমা এল লালরঙা পুঁইমাচায়। ওর মাকে বলল, : মা আর মেয়ে মিলে কী এতো গল্প করছ, টুনির মা? : আম্মা, আর বলবেন না, আপনার নাতনি বলছে, মাছরাঙার ছেলে নাকি এক বুড়োর সাথে খাতির জমিয়েছে। বুড়ো লোকটা নাকি ওর ছবিও তুলে রেখেছে। আর কি করেছে, জানেন? ভিডিও নাকি করেছে! কী বিপদের কথা? কন তো আম্মাজান!
: বউমা, এতটা ভয়ের কী আছে? সব মানুষই খারাপ না। এখনো কিছু ভালো মনাুষ আছে। আবার কারোর মুখই মুখোশ। ওরা ফাঁদ পেতে শিকার ধরে।
এবার টুনির দাদি টুনিকে ডাকলেন।
: এই টুনি, কোন বাড়ির বুড়ো রে?"
: ঐ যে দেখো, পুব দিকের বাড়িটা। সারাদিন জানালার ধারে বসে থাকে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলে? একদিন ঐ দাদুর বউ বলেছে, "তুমি তো পাগল হয়ে যাবে!"
: কেন? কেন?
: লোকটা নাকি সারাদিন ফুল-পাখি, প্রজাপতি আর ছোট্ট শিশুদের নিয়ে ভাবে। সংসারের প্রতি একেবারেই মনোযোগ নেই। নিজের ছেলেমেয়ের সাথে দুষ্টুমি করে। ঠিক ছোট মানুষের মতো।
: এই টুনির মা, লোকটার গল্প আমিও শুনেছি। গল্পটা আমাদের দশপুরুষ আগে থেকে চলে আসছে। লোকটাকে আমারও দেখার ইচ্ছে করে।
: কিন্তু, এখনও লোকটা বেঁচে আছে দাদিমা?
: থাকবেই তো, মানুষরা অনেকদিন বেঁচে থাকে যে! প্রায় আমাদের চৌদ্দপুরুষের সমান।
: দাদিমা, গল্পটা একটু বল না, শুনি।
: লোকটা যখন ক্লাস টুতে পড়তো, তখন থেকেই এরকম। ঐ লোকের নাম অপু। সেই অপু একবার এক টুনটুনির ডিম গুঁইসাপের হাত থেকে বাঁচায়। তারপর ডিম ফুটে ছানা হলে টুনিমাকে একটা প্লেটে দূর থেকে সর্ষে দানা দিত। ছানারা বড় হয়ে তার কাঁধে এসে বসতো। তখন সেই গাঁয়ে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়, 'অপুর বন্ধু টুনটুনি'। এই টুনি, তবে তোকে আরেকটা গল্প শোনাই। মনোযোগ দিয়ে শোন। : বলো, দাদিমা।
দাদিমা বলেন, একদিন দুপুর বেলা এক ঝিঙে মাচায় বসে আছি। দেখলাম, একটা লোক মাচার পাশে আমগাছ তলায় বসে আছে। একটু পরপর লোকটা মাচার কাছেই গম ছিটিয়ে দিচ্ছে। আমি অতবড় গমের দানা কখনোই খাই না। তাই চুপ করে দেখছিলাম। মনেমনে ভাবছি, লোকটা শালিকগুলোর উদ্দেশ্যে এভাবে গম ছিটাচ্ছে কেন? ওমা শালিকগুলো গম খেতে খেতে ফাঁদে আটকে গেল! তারপর লোকটা ওগুলোকে ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে ফেললো! এতো লোভী মানুষ হয়? শুনেছি অনেক মানুষ নাকি ইশকুল গেইটে এসে লোভ দেখিয়ে বাচ্চাদের ধরে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। ওরাও নাকি একইভাবে লোভ দেখায়, কথার প্যাঁচে ফেলে। ওরা নাকি টিফিনের ফাঁকে যে শিশুরা ইশকুল গেইটের বাইরে আসে, তাদের সাথে এমনটা করে। ওতপেতে থেকে আগেই বাচ্চাদের নাম জেনে নেয়। তারপর বলে, আমি তোমার মামা বা চাচা- নয়তো একটা বিশ্বাস করবার মতো পরিচয় দেয়। তারপর বলে, তোমার আম্মু বা আব্বু অসুস্থ। আজ নিতে আসবেন না। আমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। অথবা তোমাদের বাসায় গিয়েছিলাম। চলে যাচ্ছি তো, তাই তোমার সাথে দেখা করতে এলাম। এরপর একটা কিছু খেতে দেয়, নয়তো হাতে সুগন্ধি কিছু দেয়। এরপর শিশুরা এসব খাবার খেয়ে নয়তো ঘ্রাণ শুঁকেই অজ্ঞান হয়ে যায়। যারা ভুল করে ওদের বিশ্বাস করে, তারাই এমন বোকামি করে। বুদ্ধিমান বাচ্চারা এরকম কিছু শুনলেই দৌড়ে গিয়ে ইশকুলের স্যারদের জানায়।
এবার টুনির মা বললো, এই টুনি তোর দাদিমা’র কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছিস? শোন, ভালো মানুষ গায়ে পড়ে কারোর সাথে ভাব জমাতে আসে না। তবে কেউ বিপদে পড়লে ওরা তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েই সাহায্যের হাত বাড়ায়। যেমনটা দাদু করেছিলেন। তিনি গুঁইসাপের গ্রাস থেকে ডিমগুলো বাঁচিয়ে বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। আমাদের চারপাশে এরকম অনেক পশুপাখি ও মানুষ আছে, যারা ফাঁদে ফেলে। যেমন- ঝুমঝুমি সাপ লেজ নাচিয়ে শব্দ করে বোকা বানিয়ে পাখিদের ধরে খায়। কাজেই না জেনে না বুঝে কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক না। আর হ্যাঁ, নিজের ক্ষমতা বুঝেই চলাফেরা করতে হয়। পানিতে পড়ে গেলে কিন্তু সোনাব্যাঙ ঠ্যাঙ কামড়ে ধরতে পারে।