টোকাই ও জুতারগাম

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:৩৩ পিএম, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

তারেক হাসান: প্রতিদিনের মত সেদিনও মিরপুর -১ এ ফুট ওভারব্রীজ পার হচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো কয়েকজন শিশু মারামারি করছে। তাদের বয়স সবারই ৬ থেকে ১০এর মধ্যে। একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখতে পেলাম ৪-৫জন একজনকে মারছে। আমি তাদের থামাতে চেষ্টা করলাম। না কিছুতেই তাদের থামাতে পারছিনা। অনেক পথচারী  হেটে যাচ্ছে সে পথে, কেউ কিছুই বলছেনা। কারণ তারা জানে এরা টোকাই, যাদের অনেকেরই জন্ম পরিচয় নেই। যে বাচ্চাটিকে  মারছে, তার হাতে কি যেনো পলিথিনে মোড়ানো। যে বাচ্চাগুলো মারছে, তার হাতের ঐ জিনিসটির জন্য। মার খাচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর সেই পলিথিনে মুখ লাগাচ্ছে, কিন্তু পলিথিন ছাড়ছে না। ভাবলাম কিছু একটা করতে হবে, তাই জোরে একটা ধমক দিলাম। বাচ্চাগুলো থেমে গেলো, তখন সবার উদ্দেশ্যে বললাম তোদের দুপুরে খাওয়াবো বলে এখানে এসেছিলাম, তোরা যদি মারামারি করিস তাহলে চলে যাবো। তখন বাচ্চাগুলো একেবারে থেমে গেলো। তাদের সাথে নিয়ে নিচে নেমে এলাম। শরীরের কাপড়গুলো অতিরিক্ত নোংরা থাকায় ফুটপাত থেকে সবার জন্য একটা করে গেঞ্জি-প্যান্ট কিনে দিলাম। তারা এখন সবাই শান্ত। একজন বললো ভাইয়া খাওয়াবেন না? আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম। তারপর তাদের একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে তাদের পছন্দমত খাবার খাওয়ালাম। এবার অনেক খুশি তারা। তাদের  হোটেল থেকে বের হয়ে একটা নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গেলাম। যে বাচ্চাগুলো মারছিলো তাদের জিজ্ঞেস করলাম তোরা একে মারছিলি কেন?
একজন বললো- ৫টাকা করে দিয়ে সবাই মিলে গামের কৌটা কিনেছি, আর সে একাই খাচ্ছিলো আমাদের দেয়নি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা খেলে কি হয়?
উত্তরে বললো-পিনিক হয়
আবার জিজ্ঞেস করলাম-কেন খাস
উত্তরে বললো ভালো লাগে -ঘুম হয়,
তখন একজন বললো আমরাতো টোকাই যেখানে রাত হয় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ি। মশায় কামড়ায়, শীত লাগে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজি। আর এটা খেয়ে যখন নেশা হয় ঘুমিয়ে পড়ি, আর কিছুই বুঝতে পারিনা। আমি অবাক হলাম, কিন্তু তাদের কথায় যতেষ্ট পরিমাণ যুক্তি আছে। আমরা যেখানে পাঁকা বাড়িতে থেকেও মশারি টানিয়ে, ফ্যান দিয়ে ঘুমাতে পারিনা, তারা রাস্তায় কেমনে ঘুমায়। তাদের তো দোষ নেই, কারণ তাদের জন্মই পথেকে নিবে তাদের দায়িত্ব?
তবুও আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম পড়াশোনা করিস না কেন? উত্তরে বললো-খাবারই খেতে পারিনা, পড়াশোনা করবো কি করে?
কথা অবশ্য ঠিক -আমি তাদের বললাম তোরা পড়াশোনা করবি? আমি তোদের জন্য প্রতিদিন এখানে আসবো -বই কিনে দিবো আমি তোদের পড়াবো। তাদের মুখে একটু হাসির ঝিলিক দেখতে পেলাম।
আমি তাদের শর্ত দিলাম আজ থেকে আর জুতারগাম খাওয়া যাবেনা।
কিন্তু একজন বললো ভাইয়া ছেড়ে দিবো, কয়েকদিন সময় লাগবে। আমি বললাম ঠিক আছে।আমি তাদেরকে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে আসলাম, কোন সমস্যা হলে আমাকে ফোন দিতে। বাচ্চাগুলো আমার পিছে পিছে আসছে, তখন বললাম আজ আমার সাথে একটা শ্লোগান দিতে হবে -তারা বললো আচ্ছা দিবো ভাইয়া।
আমার সাথে তারা শ্লোগান দিতে লাগলো
"পথশিশু আমরা ভাই
সবার মত বাঁচতে চাই"
জুতার গাম খাবোনা
জীবন নষ্ট করবোনা,,,,,,,