মিলি ও বর্ষাকালের ছবি

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:৫৪ পিএম, ২৮ আগষ্ট ২০২০

শরিফুল ইসলাম: গত দুদিন ধরেই রাতে বৃষ্টি হয়! সারাদিন চকচকে সূর্যের আলো আর রাত হলেই কানা চোক্ষের পানি টবর টবর পড়ে, আবার কখনো মুষলধারে নামে। যখন বৃষ্টি শুরু হয় তখন সেকি বৃষ্টি, যেনো টিনের চালে মেঘের পরীরা এসে নূপুর পায়ে নৃত্য করছে। সেদিন রাতে বেশ আরামের ঘুম হয়, যাকে বলে এক ঘুমে রাত কাবার। এখন বর্ষাকাল, আষাঢ় মাস শেষ। এ বর্ষায় বৃষ্টিবাদল কম হলেও নদীর পানি কিন্তু দিন দিন বেড়েই চলছে। তবে আষাঢ় মাসে যতটা বৃষ্টি হওয়ার কথা এবার ঠিক ততটা বৃষ্টি হলো না। এমনও আষাঢ় মাস গত হয়েছে, সে বছর আষাঢ় মাসের পনেরো দিনই মেঘে ঢাকা থাকতো। সূর্যের দেখা মিলেনি পনেরো দিনেও কিন্তু এবছর আষাঢ় মাস চলে যাচ্ছে একটানা দুদিনইও বৃষ্টি হলো না। তবে কি জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে?
এখন সকাল দশটা বাজে। মিলি বারান্দায় মাদুর পেতে বসে ছবি আঁকছে। মিলির বয়স নয় বছর, সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। করোনার ভাইরাসের জন্য তার পাঠশালা বন্ধ, তাই মিলি এখন বাড়িতেই পড়াশোনা করছে। পড়াশোনার ফাঁকেফাঁকে মিলি তার ছোটবোন লিলির দেখা শোনাও করে। লিলির বয়স তিন বছর। সে হাঁটতে পারে, হেঁটে হেঁটে বাড়ির এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে চলে যায়। আর নানা রকমের দুষ্টুমি করে। মিলিদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ঝিনাই নদী, এখন বর্ষাকাল হওয়ায় ঝিনাইয়ের পানি ফুলে ফেপে উঠেছে। নদীর পানিতে আবাদি জমি ভেসে যাচ্ছে। মিলিদের বাড়ির নিচেই পানি থইথই করছে। তাই তো লিলির দিকে কড়া নজর রাখতে হয় মিলির, কখন আবার পানিতে নেমে পড়ে! এক বছর আগে মিলির বন্ধবী শিউলির ছোটভাই এইরকম বর্ষার পানিতে ডুবে মারা যায়। সে দিন শিউলি খুব কান্না করছিলো আর বলছিলো 'আমি যদি ভাইকে একটু দেখে রাখতাম তাহলে আর এমনটা হতো না'! বাড়ির নিচে থইথই পানি দেখে শিউলির বলা ঐ কথাটা মিলি মনে পড়ে। মিলি মনে মনে ঠিক করে যে লিলির দিকে তার সর্বক্ষণ নজর রাখতে হবে। লিলি এখন ঘুমাচ্ছে, ফজরের আজানের সময় লিলির ঘুমা ভেঙে যায়। সে আবার সকল নয়টা-দশটার দিকে ঘুমায়, আজও তাই করছে। লিলি নয়টা থেকে ঘুমাচ্ছে বলেই মিলি বারান্দায় মাদুর পেতে বসে ছবি আঁকছে। বাইরে হালকা বৃষ্টি, এ আষাঢ়ে দিনের বেলায় তেমন বৃষ্টি হয়নি, আজ মনে হয় মুষলধারে নামবে।

 কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষুলধারে বৃষ্টি শুরু হলে মিলি খুশি হয়ে মা'কে বলে, মা আমি বৃষ্টিতে ভিজবো! মিলির মা কঠিন স্বরে বললেন না, ভিজতে হবে না, ঠান্ডা লেগে জ্বর আসবে, এখন সময়টা খুব খারাপ। মিলি মায়ের কথা শুনে আবার ছবি আঁকায় মন দেয়। এতোক্ষণ সে বর্ষাকালের গ্রামের দৃশ্য আঁকছিলো, ছবিটা বেশ হয়েছে। বর্ষাকালের টুপুরটুপুর বৃষ্টির মাঝ দিয়ে দাদুভাই বয়সের কেউ গ্রামের কাদামাখা পথ দিয়ে ছাতা মাথায় হেঁটে যাচ্ছে। আর রাস্তার পাশে দিয়ে বয়ে গেছে নদী, মনে হয় খাকুড়িয়ার রাস্তা আর ঝিনাইয়ের দৃশ্যই মিলি ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছে। লিলির ঘুম ভাঙবে এগারোটার দিকে, এতো ক্ষণে আরেকটা ছবি আঁকা হবে বলেই মিলি ছবি আঁকা শুরু করলো। এবারের ছবিটা একটু ভিন্নধর্মী। মিলি আঁকাছে সাপুড়ের ছবি, তিন সাপুড়ে এসে সাপ নিয়ে খেলা করছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে নাচ গান।

 একটা সাপুড়ে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে আরেকটা সাপুড়ে মেয়েদের মতো কাপড় পড়ে নানান অঙ্গভঙ্গি করে নাচছে সে নাকি বেহুলা! আর বাকি একজন গান গেয়ে গেয়ে সাপ নিয়ে খেলা করছে। এই দৃশ্য ছোটবড় সবাই ভিড় করে দেখছে। লিলিদের গ্রামে আষাঢ় মাসের শেষের দিকে এই সাপুড়েদের আগমন ঘটে। তারা গান গেয়ে গেয়ে চাল টাকা এসব উঠায়। কিন্তু এবছর তারা আসছে না! না আসার কারণ হলো করোনা ভাইরাস, এই ভাইরাসে সব কিছু থমকে গেছে। মিলির ছবি আঁকা প্রায় শেষ! মিলির মা রান্নাঘর থেকে ডেকে বলেন , মিলি দেখতো লিলি উঠছে কিনা!  মিলি দৌড়ে গিয়ে দেখলো লিলি ঘুম থেকে উঠে কান্না করছে। মিলি লিলিকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগলো আর হাসানোর চেষ্টা করলো। লিলিও এক সময় হাসলো। মিলির অসম্পূর্ণ ছবিটি আরেক দিন আঁকাতে হবে সে এখন তার ছোটবোন লিলিকে নিয়ে ব্যস্ত।