শখের আঁকিয়ে শবনমের বাড়ি যেন পাখির অভয়ারণ্য

প্রকাশিত: আগস্ট ০৫, ২০২২, ১২:২৪ দুপুর
আপডেট: আগস্ট ০৫, ২০২২, ১২:২৪ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

নাসিমা সুলতানা ছুটু : শখের আঁকিয়ে শবনম-ই সুবহা এপি। গৃহিণী থেকে আঁকিয়ে হয়ে ওঠা শবনমের গল্পটা আর দশজনের মত নয়। দুই যুগেরও বেশি সময় পর করোনার লকডাউনের সময়টাকে কাজে লাগাতে শবনম হাতে তুলে নেন রঙ-তুলি। নেহায়েত শখের বশে ছবি আঁকতে শুরু করেন। তার আঁকা কিছু ছবি এরই মধ্যে বিক্রিও হয়েছে।

ছবি আঁকার পাশাপাশি তার আর একটি শখ পাখি পালন। তবে আর সবার মত খাঁচায় পুরে শবনম পাখি পালন করেন না। তার পোষা পাখিগুলো সব সময় ছেড়ে দেওয়া থাকে । প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তার বাড়ির ব্যালকনি ও রেলিংগুলো যেন হয়ে ওঠে পাখিদের অভয়ারণ্য।

ঢাকার উত্তরায় বসবাসকারী শবনম-ই সুবহা এপির জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়ায়। বগুড়া শহরের চক সূত্রাপুর এলাকায় শৈশব-কৈশোর ও তরুণ বয়সের কিছুটা সময় কেটেছে শবনমের। বাবা-মা দু’জনই চাকরিজীবী ছিলেন। বাবা চাকরির জন্য অন্য শহরে থাকতেন। মা করতেন শিক্ষকতা।

বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তিন বোনের মাঝে শবনম দ্বিতীয়। শবনম বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন । পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাশ করেন। 

ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির শখ থাকলেও কখনও কোথাও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকা শেখা হয়নি শবনমের। শবনম বলেন, “একদম ছোটবেলা থেকে আঁকা আঁকি করি। ছোট বেলায় তিনবোনই ছবি আঁকা, সেলাই, বিভিন্ন রকম ক্লিপ বানানো, ক্রাফটিংসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ নিয়ে বড় হয়েছি। আমার মা খুব ভালো সেলাই করতেন।

এখনকার মত আমাদের ছোটবেলায় ছবি আঁকা শেখার তো এত প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাই কোথাও ছবি আঁকা শেখা হয়ে ওঠেনি। তবে শিশু একাডেমির প্রতিটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম হয়েছি। খুব ছোট বেলায় ‘ক’ গ্র“পে আর একটু বড় হলে যখন ‘খ’ গ্র“পে প্রথম হতাম।  

দশম শ্রেণি পর্যন্ত আঁকাআকি করেছি । এরপর প্রায় ৩০ বছর পর ২০২০ সালে লকডাউনের সময় আবার হাতে রং তুলি তুলে নেই। সে সময় ছেলে-মেয়ের স্কুল, কোচিং সব বন্ধ ছিল। তাই ওদের নিয়ে বাইরে ছোটাছুটি ছিল না। হাতে অফুরন্ত সময়। কী করব? বাইরে যাওয়া নেই। তাই ছোটবেলার ছবি আঁকার শখটি আবার মাথায় আসে। রঙ তুলি ও কিছু কাগজ কিনে আনি। লেগে পড়ি ছবি আঁকতে। তারপর সেসব ছবি যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করি, ছবি দেখে সবাই বেশ প্রশংসা করে। কেউ কেউ কেনার প্রস্তাব দেন। একটার পর একটা এঁকে গেছি।

সেগুলো জমা পড়ে থাকেনি সবই বিক্রি হয়েছে। যখন ছবি বিক্রি হতে থাকে তখন মানসিক শক্তি বেড়ে যায় যা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ফেসবুকে বিভিন্ন সৃজনশীল গ্র“প থেকে অনেক সৃজনশীল বন্ধুও পেয়েছি। যারা আমার এ পর্যন্ত আসার বড় সহায়ক।”

শবনম জানান, তিনি সবধরনের ছবিই আঁকেন। তবে সবথেকে পছন্দ করেন বিভিন্ন ফুল, ফল ও প্রকৃতির ছবি আঁকতে। এছাড়া রিয়েলিষ্টিক ছবিও আঁকেন। শবনম নিজে ছবি তুলে সেটা দেখে আঁকতেই বেশী পছন্দ করেন । সম্প্রতি শিল্প বাংলা আয়োজিত ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ছবির প্রদর্শনীতে তার আঁকা ছবি থেকে তিনটি ছবি নির্বাচিত হয়েছে। বর্তমানে একটা কালার গ্র“পের সাথে জড়িত শবনম সেখানে মোঃ আশরাফুল আলম রানা নামে একজন অভিজ্ঞ আঁকিয়ে তাকে উৎসাহিত করেন । শবনম জানান, তার বিক্রিত ছবির অর্থ দিয়ে বন্ধু ও স্বজনদের বিভিন্ন গিফ্ট দিয়েছেন। শবনমের ইচ্ছে আছে তার আঁকা ছবিগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে তার জন্ম শহর বগুড়ায় একটি প্রদর্শনী করার। 

শবনম ছবি আঁকার পাশাপাশি ১৪-১৫ বছর ধরে অভিনব পন্থায় পাখি পুষছেন। বাড়ির উন্মুক্ত স্থানগুলোতে পাখিদের জন্য খাবার রাখেন। এরপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি সে খাবার খেতে উড়ে আসে। প্রতিদিন ১৫-১৬টি টিয়ে পাখি সকাল ও সন্ধ্যায় তার ব্যালকনি ও রেলিঙে এসে বসে। টিয়াদের জন্য কলা ও চাল রাখেন। এছাড়া দোয়েল, চড়ুই ও শালিকসহ কিছু নাম না জানা পাখিও উড়ে আসে।

শবনম বলেন, ‘পাখি খাঁচায় পুরে পালন করা আমার ভালো লাগে না। পাখিদের জন্য খোলা আকাশ সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান। তবে তাদের খেতে দেওয়া আমি পছন্দ করি। এজন্য আমার বাড়ির ঝুল বারান্দা ও তার রেলিঙগুলো পাখিদের খাবারের জন্য ব্যবস্থা করে রেখেছি। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যা ওদের কলরবে আমার বাড়ি ভরে ওঠে। মনে হয় এজন্য পাখিদেরই এক অভয়ারন্য’। 

স্বামী স্বাধীন ও  ছেলে আরিক ফাহমিদ এবং মেয়ে আনতা আরিবাকে নিয়ে শবনমের পরিবার। স্বামী স্বাধীন নাবিল গ্র“পের চিপ অপারেটিং অফিসার। ছেলে-মেয়ে দু’জনই লেখাপড়া করছে।  শবনম বলেন, ‘আমার ছবি আঁকা ও পাখি পোষার পেছনে সহযোগিতা করেন। ওদের অনুপ্রেরণায় আমার নতুন পরিচয় আঁকিয়ে’। 

 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়