ড্রয়িং আপুর সাদা ক্যানভাসে এবার প্রিয় পত্রিকা করতোয়া

প্রকাশিত: আগস্ট ০২, ২০২২, ০৫:২৮ বিকাল
আপডেট: আগস্ট ০২, ২০২২, ০৮:৫৮ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

নাসিমা সুলতানা ছুটু : সাদা ক্যানভাসে রঙতুলির ছোঁয়ায় মুহূর্তেই ফুটে তুলছেন কখনও কোন কিংবদন্তির অবয়ব তো কখনও প্রিয় তারকা বা খেলোয়ারের প্রতিচ্ছবি। রঙতুলির ওই আঁচড় থেকে বাদ পড়েনি উত্তরবঙ্গের সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় পত্রিকা করতোয়া।

কোন একাডেমিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু মনের আনন্দে দক্ষ হাতে অনলাইন ও অফলাইনে যিনি এই কাজটি করছেন তিনি হলেন ড্রয়িং আপু। কাগুজে নাম সুমাইয়া হাসান চৌধুরী। পরিবার ও বন্ধু মহল অনন্যা নামে ডাকলেও অনলাইনে আসল নামগুলো চাপা পড়ে এখন তিনি শুধুই ড্রয়িং আপু নামে পরিচিত। 

সুমাইয়ার তৈরী দৈনিক করতোয়া | Daily Karatoa made by Sumaiya

সেই ভিডিও দেখুন এখানে : 

নওগাঁর মেয়ে সুমাইয়ার জন্ম রাজশাহীতে হলেও বর্তমানে পাবনা শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন। বাবা নাজমুল হাসান চৌধুরী পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক। মূলতঃ বাবার চাকরি সূত্রে বিভিন্ন জেলায় জেলায় তাকে ঘুরতে হচ্ছে। সুমাইয়ার মা শবনম মোস্তারী চৌধুরী একজন গৃহিনী। 

সুমাইয়া জানান, ছোট বেলায় অন্য শিশুদের মত তারও ছবি আঁকার প্রতি প্রচন্ড ঝোঁক ছিল। তবে কখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোথাও ছবি আঁকা শেখা হয়নি। স্কুলে পড়তে চিত্রাংকন বিষয়টিতে বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য যখন সবাই বেশ বাধ্য হয়েই ড্রইং শিখতো। তখন তার মনে হতো, ছবি আঁকাটা তো একটি মজার বিষয়। এখানে রঙ-তুলি নিয়ে খেলা করা হয়।

কারো কাছে শিখে সেটা রপ্ত করা যাবে না। যা ভেতর থেকে আসে। তাই এই খেলাটি কেন অন্যের কাছে শিখতে হবে? যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় একবার পরীক্ষায় শুধুমাত্র চিত্রাংকন বিষয়ে জিপিএ-৫ না থাকায় ওইবার ওই শ্রেনীতে জিপিএ-৫ পাওয়া হয়নি।

সুমাইয়া বলেন, ‘রেজাল্টের পর মা জোড় করেই বাড়ির কাছেই একজন ড্রইং শিক্ষকের কাছে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্ত কয়েকদিন যাওয়ার পর আর ভালো লাগেনি। মনে হতো ওনার চেয়ে সহজ করে আমি আঁকাতে পারি’।

একাডেমিকভাবে কোথাও ছবি আঁকা না শিখলেও সুমাইয়া মনে মনে গুরু ভেবে নিয়েছিলেন তার নানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক আমেরুল মোমেনীন চৌধুরী, আরেক আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চিত্রশিল্পী মামা সৌরভ চৌধুরী এবং বড়ভাই মডেল সিফাত হাসান চৌধুরী।

ছোটবেলা থেকে নানা-মামা ও ভাইকে দেখেই ছবি আঁকার প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। বড় ভাইকে ছবি আঁকাতে দেখতেন। তাদের দেখে বাড়িতে নিতান্ত শখের বশে টুকটাক আঁকা আকিঁ করতেন।  

সুমাইয়া বলেন, ‘তাদের কেউ হাত ধরে শিখাতে চাইলেও শিখতে চাইতাম না, খুব জেদি ছিলাম নিজে নিজেই আঁকার চেষ্টা করতাম’। সুমাইয়া জানান, তার মূলত ক্রাফটিং করা হতো। যেমন, কাগজ কিংবা ফেলনা জিনিস দিয়ে কিছু বানানো অথবা কারো জন্মদিন বা অনুষ্ঠানের ডেকোরেশনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বাইরে থেকে না কিনে বাড়িতেই বানানো আবার বাইরে থেকে উপহার না কিনে হাতে বানানো কোনো উপহার দেওয়া। বলা যায় সকল মিডিয়ামেই কাজ করা হয়েছে নিতান্ত শখের বশে।

তিনি বলেন, আমার সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম পেন্সিল রঙ। কারণ আমাদের জীবনের প্রথম শিল্প সরঞ্জামই হলো এটি। বড় হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন সরঞ্জাম সংগ্রহ করার আগ্রহ বাড়তে থাকে সাথে নতুন মাধ্যমের সাথে পরিচয় হওয়ার ও ইচ্ছা বাড়তে থাকে কিন্তু এতে মাত্রা যোগ হয় করোনা কালীন সময়। তখন সবে মাত্র হাতে মোবাইল ফোন পেয়েছি,সাথে ফেসবুক।

আত্বীয় স্বজন কিংবা বন্ধুদের খুশি করার জন্যই পোর্ট্রেট আঁকতাম। করোনার সময় সুমাইয়া একবার তার এক আত্মীয়কে ক্রিকেটার এ বি ডিভেলিয়ারসের একটি পোর্ট্রেট করে দেন। ওই আত্মীয় পোট্রেটটির ভিডিও করে তার ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে দেওয়ার জন্য তার অনুমতি চান। 

সুমাইয়া বলেন, ‘সত্যি বলতে অনলাইন জগতের কোনো ধারণাই আমার ছিলনা আর এগুলো আসলে কি সে সম্পর্কেও জানতাম না। তাই আমি তাকে বলি যে আমি তাকে ভিডিও করে দিবো কিন্তু যেন কেউ না জানতে পারে যে ছবি গুলো আমি আঁকিয়েছি। এভাবে প্রথমে (আর্ট গ্যালারি) নামে একটি পেজ খোলা হয়।

শুধু মাত্র অবসর সময় আঁকাআঁকি করা হতো। আর ভাবিওনি যে কেউ আমার ভিডিও দেখবে। কিন্তু খুব সময়ে বেশ ভালো সাড়া পেয়েছিলাম। পরে সে পেজের নাম রাখা হয় (ড্রয়িং আপু)। বাড়তে থাকে পরিচিতি। দেখা যায় নাম ধরে না ডেকে ড্রইং আপু বলেই সবাই ডাকছে। তাই মনে হয়েছিল একটু অন্যরকম কিছু আঁকানো দরকার।

ব্যক্তিগতভাবে আমি যেহেতু পোর্ট্রেট আঁকতে পছন্দ করি, পোর্ট্রেট এর ক্ষেত্রে অনুকরণটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটি কাজে লাগিয়ে ব্যতিক্রম কিছু আঁকাতে চেয়েছিলাম যা মানুষ সাথে সাথে দেখে আন্দাজ করতে পারবে না যে আসল না নকল। এভাবেই পোর্ট্রেট আঁকা শুরু’।

সুমাইয়া এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক পোট্রেট এঁকেছেন। বিখ্যাত পোর্ট্রেটগুলোর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সূচিত্রা সেন, হলিউড অভিনেতা ক্রিস হেমসওয়ার্থ, ক্রিস ইভান্স, স্কালের্ট জোহানসন, বলিউড অভিনেতা ঋত্বিক রোশন, ফুটবলার মেসি, ক্রিকেটার এবি ডিভেলিয়ারস, দৈনিক করতোয়া পত্রিকা এবং ওই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক তাসলিমা হকের। 

এ পর্যন্ত যত পোর্ট্রটে এঁকেছেন সুমাইয়া এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় তার প্রয়োজন হয়েছে দৈনিক করতোয়া পত্রিকার পোর্ট্রটেটি আঁকতে। তার ২৭ ঘন্টা সময় লেগেছিল পোর্ট্রটেটি আঁকতে।

এ প্রসঙ্গে সুমাইয়া বলেন, যেহেতু খবরের কাগজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ। পত্রিকা পড়ে আমরা দেশ-বিদেশের কোথায় কী ঘটছে, কীভাবে চলছে পৃথিবী সবকিছুই জানতে পারি। পত্রিকার প্রতিটি জায়গায় শিল্প লুকিয়ে আছে যা অনুকরণ করতে পারলে আমি যেমন নতুন কিছু শিখতে পারবো তেমন একটা বেশ মজাদার বিষয় ও তৈরি হবে।

আমি যেহেতু নওগাঁর মেয়ে, আর দৈনিক করতোয়া শুধু বগুড়া নয় এই অঞ্চলের সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় পত্রিকা। নওগাঁর আর বগুড়ার সংস্কৃতি অনেক মিল তাই প্রথমবার একটি বড় কাজ এলাকার জন্য করতে চেয়েছিলাম। বলতে গেলে আমার করা সবচেয়ে বড় কাজ যা প্রতিটা অংশ পেন্সিলে করা। কাজটি শেষ করতে লেগেছিলো মোটামুটি ২৭ ঘন্টা। 

লেখাপড়া ও ছবি আঁকার পাশাপাশি সুমাইয়ার অবসর কাটে তার পোষা বিড়াল (পোগো) কে নিয়ে। এছাড়া ক্রাফটিং করে। যেহেতু বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা তাই ড্রয়িং আপুর স্বপ্ন ভবিষ্যতে প্রৌকশলী হবার। ওই স্বপ্নের পাশাপাশি চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও তার ইচ্ছে রয়েছে। 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়