উদ্বোধনের আর মাত্র
০০
দিন
০০
ঘণ্টা
০০
মিনিট
০০
সেকেন্ড

নাজমুন নাহার শত বাধা পেরিয়ে ১৫০ দেশে উড়িয়েছেন লাল-সবুজ পতাকা

প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৮, ২০২২, ০৬:৪০ বিকাল
আপডেট: জানুয়ারী ২৮, ২০২২, ০৬:৪০ বিকাল
আমাদেরকে ফলো করুন

নিজের আলোয় ডেস্ক: নাজমুন নাহার সর্বাধিক রাষ্ট্র ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি পতাকাবাহী। গত বছরের ৬ অক্টোবর বিশ্বের ১৫০তম দেশ হিসেবে ‘সাওটোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপ’ ভ্রমণের মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক সৃষ্টি করেন।
নাজমুন দীর্ঘ ২১ বছরে বিশ্বের পথে পথে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন। দীর্ঘ কষ্টের বিনিময়ে ১৫০ দেশে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো তার একটি বিশাল অর্জন। নাজমুন বলেন, এই অর্জন শুধু আমার নয়, পুরো দেশের বলে আমি মনে করি। দেশের পতাকা নিয়ে ভ্রমণে সব সময় চেয়েছি আমার কাজের মধ্যে যেন দেশাত্মবোধ থাকে। সব সময় ভাবতাম মুক্তিযুদ্ধ করিনি, স্বাধীনতার সময় জন্ম হয়নি। তবে কাজের মাধ্যমে যেন দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারি। তা ছাড়া দেশের পতাকা পৃথিবীজুড়ে বহন করা আমার জন্য উচ্ছ্বাস ছিল।
নাজমুন ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়া স্বভাবের। বইয়ের মধ্যে পৃথিবীকে আবিষ্কার করেছেন। তার দাদা ইসলামিক স্কলারশিপ ছিলেন। তিনি ১৯২৬-১৯৩১ সালের মধ্যে আরবের অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছেন। তার ভ্রমণের গল্পগুলো তাকে অনুপ্রাণিত করে। আরেকটা উৎসাহ ছিল তার বাবা। তিনিও পৃথিবীর অনেক জায়গার গল্প শুনাতেন। সেই গল্পগুলো নাজমুনের মনের ভেতর গেঁথে যেত। তাছাড়া ম্যাপ নিয়ে অনেক কৌতূহল কাজ করত। ছোটবেলায় ম্যাপ পুরোপুরি মুখস্থ করে ফেলেন। ম্যাপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা, কোন দেশের পাশে কোন দেশ ও কয়টা দেশ আছে- এগুলো তার মধ্যে অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করে।
তার স্বপ্ন প্রথমে ২০০০ সালে পূরণ হয়। সেই শুরু তারপর সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে একেক করে ১৫০ দেশ ভ্রমণ করেছেন। দীর্ঘ ২১ বছরের লম্বা জার্নি। প্রথমে ২০০০ সালে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে ভারত ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশের গার্ল স্কাউট ছিলেন ও এটা তার জন্য একটা অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রাম ছিল। এভাবে এশিয়ার কয়েকটা দেশ ভ্রমণ করেন। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে ২০০৬ সালে যখন সুইডেনে পড়াশোনা করতে যান তখন পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করেন। কাজের মাধ্যমে কিছু টাকা রেখে দেন এবং সেই টাকা দিয়ে ভ্রমণ করতেন। সবাই পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে গাড়িবাড়ি করেন। কিন্তু নাজমুন তার উপার্জনের টাকা দিয়ে ভ্রমণ করতেন। খুব কম খরচে কীভাবে ভ্রমণ করা যায় সেটা গবেষণা করে বের করতেন। জোন ভাগ করে ভ্রমণ করতেন যাতে ১০ বা ১৫ ল্যান্ডলক্ড দেশগুলো একসঙ্গে ঘুরতে পারেন। একটা দেশে বিমানে যাওয়ার পর ১০-১৫ দেশ সড়ক পথে ভ্রমণ করেছেন। কম খরচে ভ্রমণ করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন পথ, ম্যাপ, শহর, দেশের উপর প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের ইয়ুথ হোস্টেলে থেকেছেন। যেখানে প্রতিদিনের জন্য ১০ বা ১৫ ডলার দিয়েই থাকা যেত। তাছাড়া কোচসার্ফিং নামে একটা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে খুব সহজে অল্প খরচে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করা যায়। এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সময় ভ্রমণকারীদের একজন আরেকজনকে সাহায্য করে থাকে। এরকম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আফ্রিকার কয়েকটা দেশে ঘুরেছেন। এভাবে খুব কম খরচে অল্প করে করে দীর্ঘ ২১ বছরে বিশ্বের এতগুলো দেশ ভ্রমণ করেছেন। পৃথিবীর পথে পথে তার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভারত ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে শুরু। সেখানে ঝরনার পানি দিয়ে গোসল করা, তাবুতে থাকা, পেছনে ব্যাগ নিয়ে ২০ কিলোমিটার হাঁটা, ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, ব্যায়াম করা, সবার সঙ্গে রান্না করে খাওয়া ও সব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা- এসব থেকে তার জীবনের একটা শিক্ষা হয়। তারপর গার্লস গাইডের মাধ্যমে এশিয়ার আরো কয়েকটা দেশ ভ্রমণ করেন। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভ্রমণের প্রসঙ্গ টেনে নাজমুন বলেন, এখানে মানুষ খুব কম ভ্রমণ করেন। সম্প্রতি আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডি, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, নামিবিয়া, এঙ্গোলা, সাওটোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপ- এই ৬ দেশ আমি তিন মাসে ভ্রমণ করেছি। দেশগুলো ভ্রমণের সময় অনেক দূর্ঘটনা ও বাঁধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। বুরুন্ডি খুবই ভালো লেগেছে। দীর্ঘ ভ্রমণের সময় বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। কিরগিস্তানের আলা আরচা পর্বত আরোহণ করে নামার সময় পা পিছলে পড়ে গিয়ে ছোট্ট একটি বুনো গাছের সঙ্গে ঝুলে ছিলাম। গাছে ঝুলে থাকা অবস্থায় আমাকে দু’জন ছেলে বাঁচিয়েছিলো। তারপর ১৪ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় রেইনবো মাউনটেইনে অভিযাত্রার সময় শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। তারপরও সেখানে উঠতে সক্ষম হয়েছি ও বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি’। নাজমুন বলেন, ‘১৫০ দেশে ভ্রমণে ১৫০ রকমের মানুষজন, খাবার, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে অভিজ্ঞতা হয়েছে। আফ্রিকাতে মরু ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যরাতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে আটকা পড়েছি। সাহারা মরুভূমিতে মরুঝড়ের মধ্যে পড়েছি, রক্তাক্ত হয়েছি। কখনো আদিবাসীদের সঙ্গে মাটির ঘরে ঘুমিয়েছি। কখনো রাতের অন্ধকারে বর্ডার ক্রস করতে না পেরে অপরিচিত পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয়েছে’।
নাজমুন নাহার জানান, ভ্রমণের সময় তিনি নিজেকে নারী হিসেবে ভাবেননি, শুধু একজন মানুষ হিসেবে দেখেছেন। ছেলে মেয়ের মধ্যে যে তফাৎ আছে তা কখনো তাকে ভাবায়নি।  কারণ তার বাবা ছোটবেলা থেকে তাকে একজন মানুষ হিসেবে বড় করেছেন। তাই নারী হিসেবে তেমন বড় কোনো বাঁধার সম্মুখিন হননি। বরং বাঁধা অতিক্রম করার জন্য তাকে মানুষ সবসময় সাহায্য করেছেন। তবে পৃথিবীর পথে পথে অনেক সাবধানে পথ চলতে হয়েছে। ভ্রমণে প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি তার আরও একটা মিশন ছিল। বাংলাদেশের পতাকার সাথে বিশ্ব শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া। পুরো পৃথিবী একটা হুমকির মধ্যে আছে। যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, বাল্যবিবাহ রোধ করা ও পৃথিবীর পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে । পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে ও প্লাস্টিক বর্জন করতে হবে।
নাজমুন নাহার: ভ্রমণটা হচ্ছে একটা শিক্ষা। যা অর্জনের জন্য অবশ্যই পরিশ্রমী হতে হবে। পরিশ্রম করে অর্জন করতে হবে। ছোট স্বপ্নগুলো একসময় বড় স্বপ্নে পরিণত হয়। সেই বড় স্বপ্ন পূরনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। ভয়-ভীতি, শঙ্কা, বাঁধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে গেলেই সাফল্যের পথ দেখা যাবে। পুরো বিশ্ব ভ্রমণে নাজমুনের আরো ৪৭টি দেশ বাকি আছে। বাকি দেশগুলোও পর্যায়ক্রমে তার ভ্রমণের ইচ্ছে আছে। সেটাই তার স্বপ্ন, এর জন্য ম্যাপ, পড়াশোনা ও কাজ করে যাচ্ছেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়