বগুড়ার সরকারী, বেসরকারী ভবন ও রাস্তা প্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য সহায়ক নয়

Online Desk Aminul Online Desk Aminul
প্রকাশিত: ০৭:৩৬ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০২১

হাফিজা বিনা: ছাব্বিশ বছরের তরুণ মনিরুজ্জামান অনেকটাই যেন চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি। তার বয়সি ছেলেরা পড়ালেখা শেষ করে সংসারের হাল ধরে। অথচ মনির পুরোপুরি নির্ভরশীল বাবা মা ও হুইল চেয়ারের ওপর। ভালমন্দের হিসেব না বুঝলেও মনির ঘরের বাইরে গেলে হেসে ওঠে। খুশিতে দু’হাত তুলে অজানা শব্দ করে। তার খুশির এই ব্যাপারগুলো পঞ্চাশোর্ধ মা মমতাজ বেগম বুঝতে পারলেও তাকে নিয়ে আর বের হতে পারেন না। কারণ মনির আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মত না। তিনি একজন ডিজএ্যবল মানুষ। কোন কিছু বোঝেন না, হাঁটতে পারেন না, চলতে পারেন না বিছানা থেকে ওয়াশরুম সব জায়গায় তার ভরসা হুইল চেয়ার ।
মনিরের মা মমতাজ বেগম বলেন, জন্মের দেড় বছরের মধ্যেই ডাক্তার তাদের জানিয়েছিলেন তার ছেলে আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মত না। তারপরেও অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন। বগুড়ায় তখনও এই শিশুদের জন্য তেমন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আস্তে আস্তে মনির বড় হতে থাকে। এরপর তাকে বহন করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।  হুইল চেয়ার নিয়ে  বাসে, ট্রেনে ওঠা যায় না। ডাক্তারের চেম্বার, অনেক হাসপাতালে ঢোকার জন্য কোন বিকল্প  না থাকায় আর কোথাও যায়না মনির। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে হুইল চেয়ার নিয়ে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা না থাকায় তাদের সামাজিকতাও বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন।
বগুড়ার বেশিরভাগ সরকারি, বেসরকারি ও সায়ত্বশাসিত ভবন, মার্কেট, শপিংমল, রেলস্টেশন, বাসস্টান্ড ও রেলস্টেশনে নেই প্রতিবন্ধীদের চলাচলের সুযোগ। প্রতিবন্ধী সহায়ক র‌্যাম্প না থাকায় সেসব ভবনে প্রবেশ ও রাস্তায় চলাফেরা করতে তাদের  অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও বেগ পেতে হয়। অনেকেই অতি প্রয়োজনেও  কারো সাহায্য না নিয়ে পথে বের হতে ও অনুকূল এসব ভবনগুলোতে প্রবেশ করতে পারেন না।
এব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও প্রতিবন্ধীদের চলাচলের পরিবেশও সৃষ্টি করা হয়নি কোথাও। আর কেবলমাত্র যাতায়াতের এই অসুবিধার জন্য অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী আইনী পরামর্শ, বিনোদন, সামাজিকতা ও শিক্ষা, চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ তে বলা হয়েছে- ‘জনসাধারণের জন্য প্রাপ্য সব সুবিধা ও সেবাগুলো অন্যদের মতো প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমসুযোগ ও সমআচরণ প্রাপ্তির অধিকার বুঝায়।’ আইনে আরও বলা হয়েছে, ‘সর্বসাধারণ গমন করে এরূপ বিদ্যমান সকল গণস্থাপনা, এই আইন কার্যকর হবার পর যথাশীঘ্র ও যতদূর সম্ভব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আরোহণ, চলাচল ও ব্যবহার উপযোগী করতে হবে।’
প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ও চলাচলের সুবিধাসহ প্রতিটি মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে রাষ্ট্রের। যদিও সারা দেশের মত বগুড়ায় এসব অধিকারের বেশিরভাগই অধরা। বগুড়ার বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারেন না প্রতিবন্ধীরা। মূল প্রবেশ পথেই বাধার সম্মুখীন হন তারা। কিছু স্থাপনায় মূল প্রবেশপথে ছোট র‌্যাম্প থাকলেও সেগুলো হুইল চেয়ার উঠানো যায় না। বগুড়া পৌরসভা ভবন, সমাজসেবা কার্যালয়, নিউমার্কেট, বগুড়া বাস টার্মিনাল, বগুড়ার সবগুলো কলেজ ক্যাম্পাস, প্রশাসনিকসহ সকল হল ভবন, শিক্ষা অফিস, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, আধুনিক শপিংমল, নিউ মার্কেট, জেলা উপজেলার সকল থানা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ব্যাংক, বীমা, রেলওয়ে স্টেশন, শহরের বেশিরভাগ ক্লিনিক, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনখানেই ভেতরে প্রবেশের ফটক প্রতিবন্ধী উপযোগী নয়। এছাড়াও অফিস, ব্যাংকগুলোর টয়লেট প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। বেশিরভাগ টয়লেটের ক্ষেত্রেই দরজাগুলো চাপা বা দরজার সামনে ২/৩ ইঞ্চি উঁচু চৌকাঠ রয়েছে এবং হুইলচেয়ার ঘোরানোর মত পর্যাপ্ত জায়গা ও হাই কমোডের ব্যবস্থা নেই।
নাগরিক সেবা দেয়ার জন্য পরিচালিত বগুড়ার পৌর কার্য়ালয়ে  ঢোকার জন্য নেই কোন র‌্যাম্পের ব্যবস্থা। এছাড়াও প্রতিবন্ধীদের নিয়েই যাদের কাজ সেই সমাজসেবা অফিসেও প্রতিবন্ধীদের কারো সাহায্য না নিয়ে প্রবেশ করার উপায় নেই। এব্যাপারে বগুড়া জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু মোহাম্মদ কাওসার বলেন, আমরা বর্তমানে ভাড়া বাসায় কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তবে আমাদের নতুন তৈরি হচ্ছে।  সেখানে র‌্যাম্প, লিফট্সহ প্রতিবন্ধীদের সহজ চলাচল ও যোগাযোগের সকল ব্যবস্থা  আছে। তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী প্রতিটি ভবন  প্রতিবন্ধী সহায়ক করার নির্দেশ  অনুযায়ী করতে হবে।
ডাব্লিউডিডিএফ’র নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, এসএসসি পাসের পর হঠাৎ করে তার দুনিয়াটা পাল্টে যায়। হুইল চেয়ারে বসে তার দুনিয়াটাও ছোট হয়ে যায়।  শুধুমাত্র বাড়ি ও উন্মুক্ত মাঠ ছাড়া সব জায়গায় তার চলাচলের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।  বাবা নিজের উদ্যোগে যশোরে তার কলেজে র‌্যাম্প করে দেন।  অসহায়ত্বটা সবচেয়ে বেশি অণুভব করেন যখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর শুধুমাত্র হুইল চেয়ারে চলাফেরার অসুবিধার জন্য তাকে ফিরিয়ে দেয়া। প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে মেধাবী এই শিক্ষার্থীকে কলেজে প্রবেশগম্যতার জন্য সাইন্স নিতে দেয়া হয়নি। এরপর তার চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। খোদ প্রতিবন্ধীদের নিয়ে যারা কাজ করেন তারা তাকে মেধা থাকলেও কাজ করার সুযোগ দেননি প্রবেশগম্যতার অজুহাতে।  প্রতিবন্ধীদের অবাধ চলাচলের জন্য ২০২০ সালে  ন্যাশনাল বিল্ডিং রুলস করা হলেও এখন পর্যন্ত তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বগুড়ার সরকারি দুটি হাসপাতালে প্রতিবন্ধীদের জন্য র‌্যাম্প থাকলেও তা চেনার জন্য কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কোন মার্কেটে র‌্যাম্পের ব্যবস্থা নেই। নতুন বিল্ডিং গুলোতেও নেই। অনেকেই কোড মানার জন্য র‌্যাম্প বানিয়েছে, তবে তা ব্যবহার করা যায় না। তিনি আরও বলেন, আমরা এসব বিষয় বিভিন্ন সময় সভা সেমিনারে বলেছি। সেখানে সরকার ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ লোক থাকেন। তবে সরকারের মনিটরিং এর বিকল্প নেই।
বগুড়া গণপূর্ত বিভাগের  সদ্য বিদায়ী নির্বাহী  প্রকৌশলী মোঃ বাকী উল্লাহ জানান, আমাদের নতুন করে যেসব ভবন নির্মাণ হচ্ছে সেগুলোর নিচতলা প্রতিবন্ধী বান্ধব করা হয়েছে। এছাড়া পুরাতন বহুতল ভবনগলোতে লিফটের ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।  
বাংলাদেশ সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কর্মসূচির আওতায়  পরিচালিত  প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর  সংখ্যা ২১ লাখ ৬৭ হাজার  ৭৩৬ জন। এরমধ্যে বগুড়া জেলায় জরিপের মাধ্যমে শনাক্তকৃত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা  ৫২ হাজারেরও বেশি। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠির মানুষের  গণ পরিবহনে প্রবেশের সহজ উপায় নেই। ফুটপাতগুলোও প্রতিবন্ধীদের চলাচলের অনুপযোগী। অথচ প্রতিবন্ধীদের শারীরিক অক্ষমতার কথা না ভেবেই শহরের অবকাঠামো গড়ে উঠছে। স্থাপনা,ভবন এবং ফুটপাতে ঢালু পথ বা র‌্যাম্প, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল ব্লক, লিফটে ফ্লোর অ্যানাউন্সমেন্ট, ব্রেইল বাটন, শ্রবণ এবং বাক প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু ছবি ব্যবহার করা যায়। এতে তাদের চলাচল সহজ ও সহায়ক হয়।