জীবনের শেষ গল্প

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ১০:২৬ পিএম, ০৮ জানুয়ারি ২০২১

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম: শিখা, অনামিকা, সিনহা ও সিয়াম দাদুর মুখে প্রায়ই গল্প শোনে কিন্তু দাদী বাসায় থাকলে তেমন গল্প শোনা হয় না। কারণ দাদী প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকে বেশি রাত পর্যন্ত গল্প করলে দাদীর ঘুমের সমস্যা হয়। সেইসাথে ফজরের নামায আদায় করতে সমস্যা হয়। আজ দুপুরে দাদী ফুফিদের বাসায় বেড়াতে গিয়েছে। আজকে দাদুর মুখে সারারাত মজা করে গল্প শুনবো। খাওয়া দাওয়া শেষ করে শিখা, অনামিকা, সিনহা ও সিয়াম দাদুর রুমে চলে আসে। সিয়াম দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলে দাদুভাই আজকে কিন্তু সারারাত শোনাতে হবে। আচ্ছা ঠিক আছে দাদুভাই তাই হবে। তবে কী গল্প শুনবে বলো? শিখা- দাদুভাই তুমিতো জীবনে অনেক গল্প বলেছো। কিন্তু নিজের জীবনের গল্প তো কোনদিন বলনি! আজকে তোমার জীবনের গল্প শুনবো।

আচ্ছা ঠিক আছে দাদুভাই শোনো- আমার জীবনের গল্প আমার বাবা ছিলো অনেক সম্পদশালী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। আমাদের কোনো অভাব ছিলো না। আমরা রাজার হালে বসবাস করতাম। আমি হলাম সবার বড়ো ছেলে। আগে তো তেমন স্কুল কলেজ ছিলো না। তাই তেমন পড়াশোনাও করতে পারিনি। আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। বাবার ভাই মানে আমার আঙ্কেল উনারাও আমাকে বুঝিয়ে বলতে শুরু করলো এখন তোমার মা নেই তোমার বোনদেরও বিয়ে হয়ে গেছে এখন তোমাদের কে রান্না করে খাওয়াবে। তুমি সবার বড়ো ছেলে তাই তোমাকেই আগে বিয়ে করতে হবে। কি আর করা একপর্যায়ে বাবার পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করতে হলো। শিখা- তারপর কী হলো দাদুভাই? কি আর হবে শুরু হলো সংসার জীবন। পুরো সংসারের দায়িত্ব পরলো আমার কাঁধে। আমাকেই বাজার করতে হয়। খেত খামার আমাকেই সামলাতে হয়। ছোট ভাই দু'টো পড়াশোনা করে আর আমাকেই সংসারের সকল কাজ করতে হয়।

এমন করে চলতে চলতে হঠাৎ করে মায়ের মতো করে বাবাও না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বাবার শোকে শুরু হলো অশান্তি।  নিজেকে বড়ো একা একা লাগে। কারণ বাবা ছিলো আমার জীবনের ছায়ার মতো। কাজে কর্মে সবসময়ই আমি বাবাকে অনুসরণ করতাম। কিন্তু এখন বাবার শোকে কোনো কাজেই ভালো লাগে না। সিয়াম- আচ্ছা দাদুভাই না ফেরার দেশে মানে কী? দাদু- যে দেশে গেলে মানুষ কোনদিন আর ফিরে আসে না সে দেশের নাম কবর দেশ। সবাইকেই একদিন মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যেতে হবে। হয়তো বা এটাই আমার জীবনের শেষ গল্প। ও আচ্ছা এবার বুঝতে পাচ্ছি দাদুভাই তারপর কী হলো? আমি ছিলাম সিদ্ধান্তে অটল। আমি ছোটভাইদের বোঝাতে লাগলাম প্রয়োজনে তোমরাও আমার সাথে সংসারের দায়িত্ব পালন করো। মেজভাই বললো না প্রয়োজনে আমি আপনার সাথে সংসারে কাজ করি আর ছোটভাই পড়াশোনা করতে থাকুক। আচ্ছা তাই হোক।
কিছুদিন পরে এলো নির্বাচন। সবাই আমাকে বলল জয়নাল আবেদীন ভাই আপনি মেম্বারি ইলেকশন করেন। আমরা আপনার সাথে থাকবো। কিন্তু আমার মন চাইছিল না। আরে নিজের খেয়ে কে যাবে অন্যের ঝামেলা নিতে। আচ্ছা তোমরা যাও আমি ভেবে দেখি কী করা যায়। রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম কী করবো। নির্বাচন করবো নাকি না করবো? মেম্বার হলে আবার মানুষের সেবা করতে হবে। আর আমি মেম্বার ছাড়াই তো এলাকায় কোনকিছু হলে তো আমাকেই দেখতে হয়। যাইহোক পরেরদিন সকালবেলা সবাইকে বললাম আমি এবার মেম্বারি ইলেকশন করবো। সবাই শুনে খুশি হলো। ভোট আমি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়। সবাই ফুলের মালা আমার গলায় পরিয়ে দিলো। আমি সকলের সামনে শপথ নিলাম আমি মানুষের সেবা করতে চাই। আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন। কারণ আমার টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। আমি গরীব দুঃখী ও অসহায় লোকদের হক কেন খাবো। আমি আজ থেকে সকলের সেবা করে যাবো ইনশাআল্লাহ। দাদুর মুখে গল্প শুনতে শুনতে অনামিকা ও সিয়াম ঘুমিয়ে পরেছে এদিকে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেছে। আজ আর না দাদুভাই অন্য একদিন আরও গল্প শোনাবো। শিখা- অনামিকা, সিনহা ও সিয়ামকে নিয়ে ওদের রুমে এসে ঘুমিয়ে পরে।
পরেরদিন সকালবেলা অনামিকার আম্মু দাদুকে ডাকতে শুরু করে আব্বু ঘুম থেকে ওঠো নাস্তা রেডি। কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ নেই একপর্যায়ে জানালা দিয়ে দেখে দাদুভাই আমাদের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে। শুরু হয়ে গেলো কান্নার রোল। শিখা দাদুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করলো দাদুভাই তুমি আমাদের এভাবে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলে। আমাকে বলে গেলে না কেন?  গতকাল রাতে তোমাকে অনেক বিরক্ত করেছি তুমি তোমার জীবনের গল্প শুনিয়েছো। এখন থেকে আমরা আর কার কাছে গল্প শুনবো দাদুভাই। তুমি তোমার জীবনের শেষ গল্প এভাবে শোনালে দাদুভাই।