কেমন আছেন উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ

প্রকাশিত: জানুয়ারী ৩১, ২০২৩, ১০:১২ রাত
আপডেট: জানুয়ারী ৩১, ২০২৩, ১০:১২ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

শেষের কবিতার শোভন লাল এর কথা অনেকেই হয়তবা জানেন। লাবণ্যের বাবা অবনীশ দত্তের একান্ত প্রিয় পাত্র। সেই শোভন লাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে ধার করে, দু’চার লাইনের প্রেমের কবিতা নিয়ে এসে লাবণ্যের পদতলে উৎসর্গ করতেন। এই ভেবে যে, যদি কখনো লাবণ্যের চোখে পড়ে , যদি কখনো মনে প্রণয়ের বীণা বাজে।

সেই অপেক্ষায় শোভন লাল প্রায়শই এই কাজটি করতেন। আমার খুবই পরিচিত একজন মানুষ ( নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, কারণ তিনি এটাকে তার দায়িত্ব মনে করেন সুতরাং এই বিষয়ে পত্রিকায় তার নাম আসুক সেটা তিনি চান না) স্বেচ্ছাব্রতী সংগঠনে উন্নয়ন কর্মি হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন।

চাকরির সুবাদে যেটুকু মাইনে পান, তা দিয়ে তাঁর সংসার ভালভাবে চলে যায়। এ বাইরে যেটুকু করেন, তার পুরোটা জুড়েই রয়েছে সমতলের আদিবাসী। ২০১৩ সাল থেকে তিনি শোভন লালের মতো বিভিন্ন জায়গা (পরিচিতমহল, বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশি, সহকর্মী)  থেকে ফান্ড রেইজ (অর্থ/উপকরণ) করেন এবং সেগুলো সুবিধাবঞ্চিত সমতলের আদিবাসীদের (সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহান, মুন্ডা, দলিত, হরিজন ইত্যাদি) মাঝে বিলিয়ে দেন।

এসব মানুষেরা উপহার পেয়ে তাদের ঠোঁটের কোণে লুকানো যে স্মৃত হাসিটা দেন। তিনি মনে করেন এটি তার জীবনের সব থেকে মূল্যবান পাথেয়। পৃথিবীতে অসংখ্য রকমের ভাল লাগা ও মন্দ লাগা রয়েছে। তার মধ্যে অসাধারণ একটা ভাল লাগার অনুভূতি হচ্ছে কাউকে সাহায্য করা, কারো উপকারে আসা, কারো মনে ভরসা ও আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারা। বিপদগ্রস্ত কিংবা বঞ্চিত একজন মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারলে, মনের মধ্যে কী যে আনন্দ লাগে! কী যে তৃপ্তি, কী যে ভাল লাগা কাজ করে! যে এই কাজটি করেন তিনি ছাড়া এই অনুভূতি কেউ বুঝবেন না।

কোভিড-১৯ কালীন সময়েও তিনি ঠিক একইভাবে কাজ করেছেন। করোনাকালীন সময়ে গোটা বিশ^ যখন আতঙ্কে, লকডাউন, শার্ট ডাউনে ঘরবন্দী দিনমজুর কর্মজীবী লাখো মানুষ। ঠিক সেই সময়ে এই পিছিয়েপড়া মানুষগুলোর কী হাল! কী দশা হয়েছিল তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তায় জানেন! যাদের একদিন কাজে না গেলে চুলা জ্বলে না। না খেয়ে থাকতে হয়। ঠিক সেই সময় ঘরবন্দী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষগুলো কিভাবে মাসের পর মাস পার করেছেন!  সেটি অনুমান করতে গেলেও গায়ে কাঁটা দেয়, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়!

কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে আমরা শুধু প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, রিকসা/ভ্যান চালক, মটর ও গার্মেন্টস শ্রমিক এর খবর দেখি ও খবর রাখি। কিন্তু ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার খবর কেউ রাখি না। কারণ আমরা উন্নয়নের গাল-গল্প শুনিয়েই সব অন্যায়কে জায়েজ করে ফেলছি। এটিও একধরণের অপরাধ। রাষ্ট্র (সরকার) যখন নিজেই অপরাধ করে তখন তার বিচার কে করবে? অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার পুরনো সংস্কৃতি, অপরাধ ও দুঃশাসনকে আরো বেশি উঁসকে দেয়। কিন্তু সেদিকে আমাদের খেয়াল নেই। আমরা সবাই নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত।

কারণ কথায় আছে, নিজে বাঁচলে বাপের নাম। বাকি সব গোল্লায় যাক। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস, এটি একটি মিথ্যা। কারণ রাজনীতির মধ্যে পলিটিক্স ঢুকে গেছে অনেক আগেই। এই পলিটিক্স থেকে জানিনা আমরা কবে বেরিয়ে আসতে পারবো। আর এজন্য জনগণকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। পীট প্রায় দেয়ালে ঠেকে গেছে! এখুনি সময় জেগে ওঠার! সকল জুলুম, নির্যাতন, অন্যায় অবিচারের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলার।

কারো চোখ রাঙানিকে তোয়াক্কা না করে নিজেকে বেপরোয়া করা। কারণ কখনো কখনো বেপরোয়া হতে হয়। পাহাড়ের আদিবাসীদের থেকে সমতলের ইৃ-গোষ্ঠী বেশি বঞ্চিত, অবহেলিত ও দারিদ্র্যপীড়িত। উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে যে অবহেলিত ও ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্ব্কি সম্প্রদায় রয়েছে, তাদের কথা আমি ওইভাবে ভাবি না। কারণ আমাদের মননে মূল ধারার বাইরে যারা তারা নেই। আমার এই বন্ধুটির মতো দেশের নানা প্রান্তে এরকম অসংখ্য প্রচারবিমুখ বন্ধু রয়েছেন যারা নিরবে, নিবৃতে সুবিধাবঞ্চিত এসব আদিবাসীদের পাশে এসে দাঁড়ান।

তাদের মনের কথার কথাগুলো! ভাল লাগা ও মন্দ লাগাগুলো ভাগাভাগি করে নিতে ভালবাসেন। সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তাদেরকে সহযোগিতা করেন। এটি শুধু সহযোগিতা না এটিকে বলা হয় ভরসা জোগানো। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ভালবাসাটা হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে জ্যান্ত জিনিস। ঠিক সেরকম সহযোগিতার থেকেও কারো মনে ভরসা জোগানোটা আরো বেশি জ্যান্ত ও উপাদেয়। দেশে ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার সংগঠন আছে অনেক, যেগুলো বেশিরভাগেই কাজের নয়।

এরা নিজেদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। সাধারণের স্বার্থরক্ষায় এই সংগঠনগুলো অতটা সোচ্চার না। তবে তাদের প্রোঅ্যাকটিভ হতে হবে। অধিকার/দাবি যাই বলি না কেন, এগুলো কখনো এমনি এমনি আদায় হয় না। এর জন্য লড়াই সংগ্রামের প্রয়োজন। ঐক্যের প্রয়োজন হয়। একটি দেশের উন্নয়নের ইনডিকেটর যতই ওপরের দিকে উঠুক না কেন, ক্ষুদ্রজাতিসত্ত্বার মানুষগুলোর গায়ে যদি সেই উন্নয়নের ধারা না লাগে, তারা যদি বঞ্চিত থাকে।

তাহলে সেই উন্নয়নকে কখনো টেকসই বা স্বয়ংসম্পূর্ণ উন্নয়ন বলে না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় বিকলাঙ্গ উন্নয়ন। একটি দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কখনোই এরকম উন্নয়নের অংশীদার হতে চাই না। ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরে আনতে সরকার যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন সেই স্বপ্ন বা প্রত্যাশা আমাদের সবার।

 
লেখক : উন্নয়ন কর্মী ও প্রাবন্ধিক                                                                                                                   [email protected]                                                                                                           

01750-534028

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়