রাজনীতিতে সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে

জিয়াউর রহমান

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২২, ০৯:১০ রাত
আপডেট: নভেম্বর ৩০, ২০২২, ০৯:১০ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আয়তনে ছোট, তবে জনসংখ্যার হিসেবে বড়; বিষয় বৈচিত্র্যে মনোমুগ্ধকর- সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বয়স বিবেচনায় একেবারে কম নয়। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বিবেচনায় দেশের হিসাব বিস্তৃত ও গভীর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, কর্মকান্ড পরিচালনায় যদি বাংলাদেশকে বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে বলতে দ্বিধা নেই দেশ হিসেবে এ দেশটিকে এখনও একটা স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি।

দেশে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর সহনশীলবোধ নিয়ে গড়ে ওঠার সাংস্কৃতিক বোধ না থাকাতে দেশটির জন্মের পর থেকে সংঘাত আর সংঘাত চলতে থাকাতে ক্ষমতা ও ক্ষমতা বহির্ভূত প্রধান দলগুলোর মধ্যে যে সন্দেহ অবিশ্বাস প্রবল আকার নিয়ে গড়ে ওঠে, তা নিরসনের কোনো আলামত দৃশ্যমান না হওয়ায় বরং সংঘাত ভয়ংকর রূপ নিয়ে এমনভাবে সমগ্র জাতিকে অক্টোপাসের মতো গ্রাস করেছে যে মানুষ এখন নিজেকে রাজনীতি বিমুখ জাতি হিসেবে গুটিয়ে নিচ্ছে, ক্রমশ এক ধরনের নির্লিপ্ত অবস্থান তৈরি হচ্ছে।

রাজনীতি মানুষের জন্য যেন সেবা নয়। দেশপ্রেমের কথা সমাজনীতি-রাজনীতির ভাষায় বলা হলেও দেশ স্বাধীনের পর থেকে মাঠ-ঘাট এর রাজনীতির লীলা-খেলা দেখতে দেখতে মানুষের এখন আস্থাহীনতা, বিশ্বাসহীনতাই প্রবল হয়েছে এবং বুঝে নিয়েছে, ‘যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ’।

আমাদের রাজনীতিতে এখন ঘূণ ধরেছে বলা যায়। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সম্পৃক্ততা এখন আর নতুন কিছু নয়। জনগণের অধিকার আদায়ে যেখানে রাজনীতি মুখ্য ভূমিকা রাখে-সেখানে দেখা যায় রাজনীতিই এখন জনগণের অধিকার খর্ব করছে। প্রায় সবাই এখন রাজনীতির নামে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। জনগণের অধিকার আদায়ে রাজনীতির ভূমিকাই অনস্বীকার্য। আমাদের দেশ স্বাধীনতা পেয়েছিল রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির মাধ্যমে।

তাই যে দেশটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে স্বাধীনতা পেয়েছে, সে দেশের রাজনীতি কোনো অবস্থাতেই দুর্বৃত্তদের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। আর রাজনীতি যদি জনগণের স্বার্থে না আসে, তবে সেসব দলও একসময় কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। শুধু গুটিকয়েক ভালো মানুষের কাজের গুণে এখনও কিছুটা আলোকিত রয়েছে সমাজ। শঙ্কার বিষয় এ ভালো মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমতে থাকলে একসময় সমাজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে পড়বে।

বর্তমানে দুর্বৃত্তরা রাজনীতির পতাকাতলে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের অংশগ্রহণে রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়ছে। রাজনীতির প্রতি মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের প্রতি সৃষ্টি হচ্ছে চরম অনাস্থা, যা জনগণের অধিকার রক্ষা বা রাষ্ট্রের তথা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না বা নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে না। আবার টাকার বিনিময়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন বা নেতৃত্বের বেচাকেনা। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতি বা যুব রাজনীতির সংগঠনগুলোতে এসব অপকর্ম ইতোমধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে। আর নির্বাচন এলে তো মনোনয়ন বিক্রির মতো ঘৃণ্যতম অভিযোগও অহরহ। আমরা দেখতে পাই- সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, ব্যবসায়ী, অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে, যা লাখ বা কোটি টাকায় কিনতে হচ্ছে তাদের।

যার ফলে ক্ষমতায় গিয়ে ওই ব্যক্তি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক হয়ে পড়েন। আদর্শহীন ও অর্থলোভী অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাপে ও প্রভাবে আদর্শের রাজনীতি করা প্রকৃত রাজনীতিবিদরা এখন অনেকটাই  কোণঠাসা ও অসহায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই এখন ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে বিনিয়োগ করেন রাজনীতিতে যেখানে লোকসানের ঝুঁকি ন্যূনতম নেই। অনেকেই জীবনে কোনদিন রাজনীতি না করেও জনগণের সাথে না মিশেও নির্বাচনের ঠিক আগে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘ম্যানেজ’ করে এমপি মনোনয়ন কিনে নেন। এদের অনেকেই এমপি হন এমনকি মন্ত্রীও হন। গত প্রায় দুই যুগ ধরেই এমন দৃশ্য নিয়মিত চোখে পড়ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এতে ক্ষতির পাল্লা জনগণের দিকে ভারী হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে জনগণের ক্ষতি মানে তো রাষ্ট্রেরই ক্ষতি।

একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব সৃষ্টির নানা উদ্যোগ ছিল। এখন দলগুলোতে সেই উদ্যোগ একেবারেই নেই। এর প্রধান কারণ হচ্ছে-দলগুলোতে পুরনো যারা নেতৃত্বে আছেন তারা ক্ষমতা হারাতে চান না। নিজেদের তারা দলের জন্য অপরিহার্য করে রাখেন। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে এরাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলেও নিজেদের অপরিহার্য ভাবেন। দলকে নিজের ব্যবসা কেন্দ্র বানিয়ে রাখেন।

নিজের নেতৃত্বের সুযোগকে ব্যবসায়িক ডিলারশিপের মতো রাজনৈতিক ডিলারশিপ ভাবছেন। এর জন্য ক্ষতি হচ্ছে মূলত দলেরই। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে হতে হবে আদর্শিক। দলগুলো তার নীতি-আদর্শ থেকে চ্যুত হয়ে পড়লে ঘটবে বিপত্তি।  প্রতিটি দলের স্বতন্ত্র মেজাজ, নীতি, আদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আর এ থেকেই জনগণ যে সংগঠনের সাথে নিজের মত ও পথের সামঞ্জস্য পাবে, তাকেই গ্রহণ করবে। এটাকে গণতান্ত্রিক পছন্দ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

সরকার ও রাজনীতির বেহাল দশার কারণে সমাজের অবক্ষয় বেড়েই চলেছে। আমরা দেখছি যুবক ছেলে তার বুড়ো বাবাকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, শিক্ষক বা গুরুজনকে পুকুরে নিয়ে পানিতে চুবানো,ডাস্টবিনে পাওয়া যাচ্ছে নবজাতকের লাশ। চুরির দায়ে ছোট্ট ছেলে রাজনকে পিলারের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে তা ভিডিও করে ফেসবুকে দেয়া হচ্ছে,এগুলো কি কোন স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা মানুষের কাজ হতে পারে? রাজনীতিতে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় এইসব ঘটনা ঘটেই চলেছে। এর দায় শুধু ঐসব মানুষদের নাকি, অসুস্থ রাজনীতির। দায় নিতে হবেই রাজনীতিবিদদের। ক্রাণ জনগণের সেবা করার মনোভাব নিয়ে যোগ দিয়েছেন রাজনীতিতে।

বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনীতির প্রধান সমস্যা হচ্ছে সৎ, নির্লোভ, আদর্শবান সজ্জন রাজনীতিকের প্রকট অভাব। এই অভাবটি আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে ক্রমেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে সজ্জন ব্যক্তিদের সংখ্যা না বাড়লে তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে যা থেকে উত্তরণ ঘটানো খুবই কঠিন হবে।

জনগণের অধিকার আদায়ে রাজনীতির ভূমিকাই অনস্বীকার্য। বলা হয়ে থাকে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। সেই জনগণ যদি রাজনীতির পদপৃষ্ঠে নিঃশেষিত হয়,এতে দেশের রাজনীতিতে ক্ষতির পাল্লায় ভারী। রাষ্ট্রনীতির ভাষায় ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। কিন্তু এখন এর বিপরীতটাই বলা যায়- দেশের চেয়ে দল বড়,দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। রাজনৈতিক দলগুলোকে হতে হবে আদর্শিক। নিজ দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে।

দলের মধ্যে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। সকল সদস্যকে দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানতে হবে। নেত্রীত্বের প্রতি আস্থা রাখা ও দলকে ভালবাসতে হবে। সর্বশেষ দেশের মানুষ ও দেশকে ভালবাসতে হবে। তবেই গণতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে দেশ পরিচালনা ও জনগণের সেবা করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে দলগুলো তার নীতি-আদর্শ থেকে চ্যুত হয়ে পড়লে ঘটবে বিপত্তি,হারিয়ে যাবে কালের অতল গহ্বরে।

আমাদের গ্রামের এক ব্যক্তির নাম শাহ কামাল। তিনি আমাদের গ্রাম ও আশে পাশের মানুষদের জারি গানের মাধ্যমে আনন্দে মাতিয়ে রাখতেন। বিশেষ করে শীতের মধ্যে তার জারি গান শোনার ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যেত। তার অনেক গানের মধ্যে একটির চয়ন ছিল-‘ আজকে মজা মেরে গেল হাবার মা, খলিত (খলই) করে গাই দোহায়(দোহন), আজকে মজা মেরে গেল হাবার মা।’ অর্থটা এমন, গ্রামের এক ছেলে ছিল একটু বুদ্ধি-শুদ্ধি কম নাম তার হাবা। তার মা ছিল সহজ সরল। হাবা তার মাকে বলল, মা আমরা তো অনেক দিন থেকে গরুর দুধ খাইনি।

আজকে মন্ডলের বাড়ীর গরুর দুধ চুপিসারে দোহায়ে আনি। পাতিল অথবা বালতি নিয়ে গেলে লোকে বুঝে ফেলবে। তাই খলই নিয়ে গরুর দুধ দোহায়ে বাড়ী পর্যন্ত এসে দেখে দুধ সবই পড়ে গেছে। আমাদের দেশের বর্তমান রাজনীতির এই একই অবস্থা। 
আমাদের দেশের ১৭ কোটি মানুষেরও দশা সেই হাবার মায়ের মতো। আমরা বিশ্বাস করে পছন্দের দলকে বেছে নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্জন শূন্যের কোঠায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষগুলো অতি সহজ সরল। নিজেরা যথেষ্ট পরিশ্রম করে দিন যাপন করে। রাত্রিতে একটু ঘুমাতে চেষ্টা করে। একটু ভাল থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু এই সহজ সরল মানুষগুলো রাজনৈতিক দলের নিকটে বার বার হেরে যাচ্ছে, তাদের কিছু হটকারিতা সিদ্ধান্তের কাছে।

এক দলের নেতারা কথায় কথায় বলেন ১৭ কোটি মানুষ আমাদের। আবার অন্য দলের নেতাদের একই কথা ১৭ কোটি মানুষ আমাদের। দেশের সব মানুষ যদি আপনাদের হয়ে থাকে, তবে বেশ ভাল। আপনারা কি আজও সেই সকল মানুষদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পেরেছেন? যদি পূরণ করেই থাকেন,তবে কেন সাধারণ জনগণ এখন আপনাদের ডাকে সাড়া দিতে চায় না। কারণ দেশের জনগণ প্রতারিত হয়ে আজ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, দেশের মানুষ সব সংগ্রামে যুক্ত হয়ে অধিকার আদায়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন বিগত দিনগুলিতে। দেশের মানুষ আপনাদের ভাল কাজের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আমার আহ্বান রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলগুলোর কাছে,দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করুন, প্রকৃত ও পরিক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করুন, জনগণের প্রতি একটু সদয় হউন,সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ ও জনগণের সেবায় এগিয়ে আসুন।


লেখক: পরিবেশ কর্মী ও প্রাবন্ধিক

 

[email protected]

01728-426086

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়