আবরার হত্যা মামলার রায়

RezaDhaka RezaDhaka
প্রকাশিত: ০৮:৪৯ পিএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১

২৬ মাস আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বী (২২) হত্যা মামলায় ২০ আসামির মৃত্যুদন্ড ও ৪ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছে। বুধবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১এর বিচারক আবু জাফর মো: কামরুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন বিচারক। হত্যাকান্ডের দুই বছর দুই মাস পর এই ঘোষণা করা হলো। আসামিদের মধ্যে ২২ জনকে এদিন দুপুরে আদালতে আনা হয়। বাকি তিনজন পলাতক। আবরার হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে যারা পিটিয়ে অমানবিকভাবে হত্যা করেছে, তাদের কঠিনতম শাস্তি হবে। আসামিরা সবাই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতাকর্মি। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর বুয়েটের শেরে বাংলা হলের গেষ্টরুমে কতিপয় নেতাকর্মি সভা করে তাদের সতীর্থ আবরারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। পরদিন রাতে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ছেলে হত্যার ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে ৭ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ নভেম্বর ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

একজন প্রকৌশলী তৈরি বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য অনেক বড় বিষয়। একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন ছাত্রকে এভাবে যারা হত্যা করতে পারে তারা স্বাভাবিক মানুষ নয়। অথচ বাস্তবতার কি নির্মম পরিহাস এক সময় ছাত্র রাজনীতি করত মেধাবী ছাত্ররা। বুয়েট থেকে দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদ ইতিপূর্বে দেশের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এখনো আছেন। অথচ সেই সব জায়গায় এখন মূল্যবোধ শূন্য দুর্বৃত্তরা জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিটা শিক্ষাঙ্গনে এখন এই দুর্বৃত্তরা সক্রিয়। এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই কাজে লাগছে না। অন্তহীন অভিযোগ নিয়ে চলছে এরা। এসব দুর্বৃত্তের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিল আবরার। বুয়েট ছাত্র আবরারের হত্যাকান্ড দেশে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডগুলোর অন্যতম। বুয়েট দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। দেশের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরাই এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকেন। তাই ধরে নেয়া যায়, আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া শিক্ষার্থীদের সবাই মেধাবী।

এ মেধাবী ছাত্ররাই তাদের এক সতীর্থকে যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তা এক কথায় মর্মান্তিক। হত্যাকান্ড ঘটানোর সময় এ শিক্ষার্থীরা একটুও ভাবেনি যে তাদের এ অপকর্মের ফলে শুধু তাদের ক্যারিয়ারই নষ্ট হতে পারে না, তাদের জীবনও হতে পারে বিপন্ন। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, শাসক দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মি হওয়ার সুবাদে তারা দায়মুক্ত থাকতে পারবেন। তাদের এ বেপরোয়াপনা ও ঔদ্ধত্য ও দেশের ছাত্ররাজনীতির একটি নষ্ট দিকই উন্মোচন করেছে। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন আবরার ফাহাদ। এর জের ধরে পরদিন ৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে তার কক্ষ হতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন নেতা-কর্মি। এরপর আবরারকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মামলার বাদী আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এ রায়ে তিনি সন্তুষ্ট। তবে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের এ রায়ই তো শেষ নয়। এরপর হাইকোর্ট, আপিল বিভাগেও যেতে পারে আসামিপক্ষ। তিনি চান, এ রায় বহাল থাকুক। রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।

দু:খজনক হলো, দেশে দুই বড় রাজনৈতিক দল তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মিদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিতে হবে অবশ্যই। আবরারকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, কোনো মতেই কিন্তু আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো তা কোনো অংশে কম নয়। আইনের শাসনের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় গৌণ হয়ে গেছে। দেশে শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে আবরার হত্যার রায় নজির স্থাপন করবে।