রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন 

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:০৪ পিএম, ১৬ জুলাই ২০২১

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মর্যাদার সঙ্গে ও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে সহায়তার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। বুধবার তিনদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত নবম মস্কো সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহবান জানান। রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, প্রায় চার বছর আগে মিয়ানমারে ১১ লাখের বেশি নাগরিককে বাস্তুচ্যুত করা হলে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়। তারা বাংলাদেশ ও গোটা অঞ্চলের জন্য মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। তবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড করা এ বক্তব্য সম্মেলনে সম্প্রচার করা হয়। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে গত মঙ্গলবার এ সম্মেলন শুরু হয়। এতে ১০৭টি দেশ এবং বৃহৎ ছয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থা অংশ নিচ্ছে। রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়ার পর তিন বছরে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, রোহিঙ্গা সংকটের যৌক্তিক সমাধানের ব্যাপারে এর আগে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কেবল আশার বাণী শোনানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না-এমন বিষয় বারবার আলোচনায় এসেছে। পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করা হবে। এ ধরনের আশ্বাসও বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। ইতোমধ্যে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর দ্বি-পক্ষীয় উদ্যোগও থমকে গেছে বলেও জানা যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের তথ্য মতে, বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এখন মিয়ানমারে সামরিক সরকারের অবস্থান বোঝার জন্য অপেক্ষায় থাকার কথা বলেছেন। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি আমলে নেওয়া সমীচীন।

 মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতার পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন করে হতাশা দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারে উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের একজন রোহিঙ্গা নেতা বলেছেন, অং সান সুচির সরকারের সময়ে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটা আলোচনা চলছিল। এখন মিয়ানমারের সেনা সরকার এ ক্ষেত্রে কী অবস্থান নেবে - এ নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। ভৌগলিকভাবে ক্ষুদ্র আয়তনের কিন্তু অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হলেও এ বিষয়ে বিশ্ব পরাশক্তি ও দাতাগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশই এককভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয়দাতা দেশ। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তিশালী শিবিরগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে কক্সবাজার জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর কোনো দিনই পূরণ হবে না। বনভূমি তো উজাড় হয়েছেই, সামাজিক যে ক্ষতি হয়েছে, তাও অপূরণীয়। এমতাবস্থায় শরণার্থী শিবিরগুলোর জীবনমান উন্নয়নে এবং নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে উপকূলীয় দ্বীপ ভাসানচরে অন্ততপক্ষে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। ভাসানচরে নির্মাণ করা হয়েছে ১২০টি গুচ্ছগ্রাম। তাতে শেড হাউজের সংখ্যা ১ হাজার ৪৪০। সরকার তো রেশন দিচ্ছেই। যা হোক, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা জরুরি। বিশ্ব সম্প্রদায় সেভাবে এগিয়ে আসেনি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ঢালাও প্রশংসা ছাড়া সংকটের সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায় এখনো শক্তভাবে এগিয়ে আসেনি। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক শুধু নয়, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। মানবিকতার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বছরের পর বছর ধরে ভুগবে তা কাম্য হওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সোচ্চার হতে হবে। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে।